হুদহুদ, সোলায়মান এবং সূর্য উপাসক রানির ধর্মান্তরিত হওয়ার গল্প

সোলায়মান এবং শেবার রাণীর ঘটনাটি কোরআন সহ অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সোলায়মান এবং শেবার রাণীর ঘটনাটি কোরআন সহ অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থেও উল্লেখ করা হয়েছে।
    • Author, ওয়াকার মুস্তাফা
    • Role, সাংবাদিক ও গবেষক

এটি যিশুর জন্মের প্রায় ৯৫০ বছর আগের কথা। মধ্যপ্রাচ্যের যে মুসলিম দেশটিকে আমরা আজ 'ইয়েমেন' বলি, তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সে সময় এক ধনী জাতির বসবাস ছিল।

যাকে 'শাবা' বা 'শাবার দেশ' বলা হত, 'শাবা' নামের সেই ধনী জাতির নামানুসারে ওই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়।

শাবেইয়ানরা সেই অঞ্চলে দেড়শ বছর ধরে বসবাস করেছে। তাদের যুগ যিশুর জন্মের ১১৫ বছর আগে পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো, এরপর হামিরানরা তাদের স্থান দখল করে।

বর্তমানে ইয়েমেনের রাজধানী সানা। কিন্তু এই লেখায় যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, সেই সময়ে প্রাচীন শহর মারিব ছিল রাজধানী।

এই শহরের একটি প্রাসাদে তৎকালীন রানি একটি রত্নখচিত সিংহাসনে বসেছিলেন। তার হাতে ছিল একটি চিঠি। যা মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআনে 'কিতাবুন কারিমুন' বা মহৎ গ্রন্থ নামে অভিহিত হয়েছে, যার বাংলা অর্থ হলো 'সম্মানিত চিঠি' বা ''মর্যাদাপূর্ণ পত্র'।

কোরআনের ২৭তম সূরা 'আন-নামল'-এ বর্ণিত আছে যে রানি তার সভাসদদের (দরবারের মন্ত্রী) বলেছিলেন, 'হে সভাসদগণ, আমি একটি সম্মানজনক চিঠি পেয়েছি।'

"এটি সোলায়মানের পক্ষ থেকে এবং পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে এসেছে।"

এতে লেখা আছে যে, তোমরা আমার বিরুদ্ধে অহংকার বা বিদ্রোহ করো না এবং আত্মসমর্পণ করে, আনুগত্য মেনে আমার কাছে এসো।

কোরআনে সোলায়মানকে শুধুমাত্র একজন মহান রাজা হিসেবে নয় বরং আল্লাহর নবী হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে। যিনি কেবল দুনিয়ার শক্তির অধিকারী ছিলেন না, বরং তিনি পাখি, পশু এবং জিনদের সঙ্গেও কথা বলতে পারতেন। (সূরা আন-নামল ২৭:১৬-১৭)

কোরআন অনুসারে, সোলায়মান ছিলেন বনী ইসরায়েলের নবী এবং রাজা দাউদ উভয়েরই উত্তরাধিকারী। তিনি ৯৬৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৯২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত তার সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন, যা ফিলিস্তিন থেকে জর্ডানের পূর্বে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

হিব্রু বাইবেল অনুসারে, সোলায়মানের ৪০ বছরের শাসনকালে, ইসরায়েলি সাম্রাজ্য অনেক গৌরব এবং সম্পদ অর্জন করেছিল।

বাইবেলে সোলায়মানকে 'ইসরায়েলের মহান রাজা' হিসেবে বর্ণিত করা হয়েছে, যিনি তার প্রজ্ঞার জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

বাইবেলের রাজাবলি প্রথম পর্বের ১০ অধ্যায়ে লেখা আছে, " এক বছরে সোলায়মানের কাছে যতো সোনা আসতো তার ওজন ছিল ৬৬৬ ক্বিনতার।'

'ক্বিনতার' বা 'কিনজার' শব্দের অর্থ হলো সেই পরিমাণ সোনা বা রূপা যা একটি ষাঁড়ের চামড়ার মধ্যে পুরে রাখা যায়"।

সোলায়মান এবং শেবার রাণীর ঘটনাটি কোরআনের সূরা আন-নামলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সোলায়মান এবং শেবার রানির ঘটনাটি কোরআনের সূরা আন-নামলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নবী সোলায়মানের ভ্রমণ এবং পিঁপড়ার গল্প

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কোরআনে সূরা শাবা'র ১২ নং আয়াত অনুসারে, 'এবং আমি বাতাসকে সোলায়মানের অধীন করে দিয়েছিলাম, যার সকালের পথ ছিল এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যার পথ ছিল এক মাসের পথ (অর্থাৎ, নবী সোলায়মান যখন চাইতেন, তখন তিনি সকাল বেলায় এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ ভ্রমণ করতে পারতেন) এবং আমি তার জন্য একটি তামার ঝর্ণা প্রবাহিত করেছিলাম এবং কিছু জিন তার সামনে কাজ করত, এবং তাদের মধ্যে কেউ যদি আমার আদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত, আমি তাকে আগুনের শাস্তি দিতাম।'

কোরআন এবং বনী ইসরায়েলের ঐতিহ্য থেকে জানা যায় যে, অন্যান্য অনেক ক্ষমতার পাশাপাশি, নবী সোলায়মান পাখিসহ জীবন্ত প্রাণীর ভাষা সম্পর্কেও বিশেষ জ্ঞান রাখতেন।

সূরা আন-নামাল, যার নামকরণ করা হয়েছে একটি পিঁপড়ার ঘটনা থেকে।

তাতে বলা হয়েছে: "যখন তিনি পিঁপড়াদের উপত্যকায় পৌঁছালেন, তখন একটি পিঁপড়া বললো: হে পিঁপড়েরা, তোমরা তোমাদের গর্তে প্রবেশ করো, পাছে সোলায়মান ও তার সৈন্যবাহিনী তোমাদের পিষে ফেলে এবং তারা তা টের না পায়।"

(এ কথা শুনে সোলায়মান) মুচকি হেসে বললেন: "হে আমার রব, আমাকে তৌফিক দাও যাতে আমি তোমার অনুগ্রহে কৃতজ্ঞ থাকতে পারি, যা তুমি আমাকে এবং আমার পিতামাতাকে দিয়েছো এবং আমি এমন ভালো কাজ করি যা তোমার পছন্দনীয় সৎকর্ম এবং তোমার রহমতের মাধ্যমে আমাকে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো।"

কোরআন অনুসারে, শেবার দেশ থেকে একটি হুদহুদ (বাজপাখি) সোলায়মানের জন্য শেবার রানির খবর নিয়ে এসেছিল। কিন্তু আদিপুস্তকে এবং ইহুদি ধর্মীয় গ্রন্থ যেমন 'তালমুদ' এ এই পাখির উল্লেখ নেই।

সূরা আন-নামালে হুদহুদের বিষয়ে বলা হয়েছে যে 'একজন নারী তাদের উপরে শাসন করছে, তার কাছে সব ধরনের উপকরণ রয়েছে এবং তার একটি খুব বড় সিংহাসনও রয়েছে। আমি তাকে এবং তার সম্প্রদায়কে আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যের সামনে সিজদা করতে দেখেছি।'

কোরআন অনুযায়ী, এই খবর শুনে হুদহুদের মাধ্যমেই সোলায়মান রানিকে সেই চিঠিটি পাঠান, যেটি নিয়ে তিনি তার দরবারে আলোচনা করছিলেন এবং যার উল্লেখ শুরুতে করা হয়েছে।

সূরা আন-নামাল অনুসারে, রানি বললেন: "হে সভাসদগণ, এই বিষয়ে আপনাদের মতামত দিন। আপনারা আমার সামনে হাজির না হওয়া পর্যন্ত আমি কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিই না।"

দরবারের সভাসদরা যখন বললেন যে আদেশ পেলে তারা যুদ্ধে যেতেও প্রস্তুত, তখন রানি তার একজন দূতকে সোলায়মানের কাছে উপহারসহ পাঠান, এই আশায় যে আনুগত্য ছাড়াও বিষয়টির নিষ্পত্তি করা যাবে।

কোরআনে বলা হয়েছে, "অতঃপর যখন রানির দূত সোলায়মানের কাছে পৌঁছালেন, তখন সোলায়মান (তাদের উপহার দেখে) বললেন: 'তুমি কি আমাকে এই ধন দৌলত উপহার দিতে চাও!'" যাই হোক, আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদের উপহার থেকে অনেক উত্তম। না, বরং তোমরা নিজেরাই তোমাদের উপহারে খুশি হচ্ছো।

এই বলে রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে দেওয়ার সময়, সোলায়মান তাকে হত্যার হুমকি দেন।

১৭০৫ সালে তৈরি সোলায়মান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের প্রাসাদের একটি স্কেচ।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৭০৫ সালে তৈরি সোলায়মান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের প্রাসাদের একটি স্কেচ।

রানির সিংহাসন

সূরা আন-নামালে বলা হয়েছে, "(সোলায়মান জানতেন যে তারা শীঘ্রই আসবে।) তিনি বললেন: হে দরবারের লোকেরা, তোমাদের মধ্যে কে তার সিংহাসন আমার কাছে নিয়ে আসবে, তারা আমার কাছে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের সাথে আসার আগেই?"

জিনদের মধ্যে এক জিন বললেন, আপনার এই সভা শেষ হওয়ার আগেই আপনার সামনে তাকে নিয়ে আসবো। আমার ক্ষমতা আছে এবং আমি বিশ্বস্তও।"

"এক ব্যক্তি (কিছু তাফসীরকার তাকে 'আসিফ বিন বারখিয়া' বলে ডাকেন) যার আল্লাহর আইন সম্পর্কে জ্ঞান ছিল, (এতে উত্তেজিত হয়ে) তিনি বললেন: চোখের পলক ফেলার আগেই আমি তাকে আপনার তোমার কাছে নিয়ে আসব।"

অতঃপর যখন সোলায়মান সিংহাসনটি তার সামনে দেখতে পেলেন, তিনি চিৎকার করে বললেন: এটি আমার প্রভুর অনুগ্রহ।

সোলায়মান সেই সিংহাসনের চেহারা পরিবর্তন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে পরীক্ষা করা যায়, যে শেবার রানি সেটা চিনতে পারেন কিনা।

নবী সোলায়মানের সাথে সরাসরি দেখা করার জন্য রানি শেবার রাজধানী মারিব থেকে প্রায় দেড় হাজার মাইল ভ্রমণ করে জেরুসালেমে গিয়েছিলেন।

১৭২০ সালে তৈরি সোলায়মানের প্রাসাদে শেবার রানির আবির্ভাবের একটি চিত্র।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ১৭২০ সালে তৈরি সোলায়মানের প্রাসাদে শেবার রানির আবির্ভাবের একটি চিত্র।

প্রাসাদ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন শেবার রানি

সূরা আন-নামালের আয়াতে বলা হয়েছে: "অতএব যখন তিনি (শেবার রানি) এসে পৌঁছালেন, তখন জিজ্ঞাসা করা হল: আপনার সিংহাসন কি এইরকম?" তিনি বললেন: ঠিক এইরকম। আমরা ইতিমধ্যেই আপনার এই গুণাবলীর সম্পর্কে জেনেছি এবং আমরা মাথা নত করে আপনার আনুগত্যে আত্মসমর্পণ করেছি।'

তারপর তাকে বলা হলো: এখন আপনি প্রাসাদে প্রবেশ করুন। তারপর যখন তিনি প্রাসাদের মেঝে দেখলেন, তখন তিনি ভাবছিলেন যে এটি গভীর পানি, এবং তিনি তার পায়ের পাতা থেকে কাপড় তুলে ফেললেন।

সোলায়মান বললেন: 'এটি তো কাচের তৈরি প্রাসাদ। (এতে) তিনি (রানি) চিৎকার করে বললেন: আমার প্রভু, আমি নিজের উপর জুলুম করেছি। ((তাই আমি ফিরে আসছি) এবং সোলায়মানের সাথে এখন আমি আমার নিজেকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর কাছে সোপর্দ করছি।'

বাইবেল (রাজাবলি প্রথম খণ্ড ১০:১০ পদ অনুসারে), রানি সোলায়মানের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন এবং তাকে ১২০ ক্বিনতার সোনা, প্রচুর পরিমাণে মশলা এবং মূল্যবান রত্ন উপহার দিয়েছিলেন।

যেভাবে শেবার রানি রাজা সোলায়মানকে মশলা উপহার দিয়েছিলেন, এত পরিমাণ উপহার এর আগে কখনো আসেনি।

ইহুদি র‍্যাবাইদের রেওয়ায়েতে বা ঐতিহ্যেও সোলায়মান এবং শেবার রানির এই গল্পটি কমবেশি একইভাবে বর্ণিত হয়েছে। তবে রানির সিংহাসনে আরোহণের ঘটনাটি কেবল কোরআনেই উল্লেখ করা হয়েছে।

বাইবেলে বলা হয়েছে যে, এরপর সোলায়মান রানিকে ক্ষমতাচ্যুত করেননি, বরং তাকে তার সঙ্গীদেরসহ ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন।

'ওল্ড টেস্টামেন্টে'-এ বলা হয়েছে যে, "শেবার রানি নবী সোলায়মানের কাছে এসে তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলেন এবং সোলায়মান যথাযথভাবে সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন। এছাড়াও, তিনি সুন্দর প্রাসাদ, রাজকীয় খাবার, জাঁকজমকপূর্ণ দরবার, বিশাল স্থান এবং ভৃত্যদের সুশৃঙ্খল সেবা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন"।

"অবশেষে, শেবার রানি সোলায়মান এবং তার আল্লাহর প্রশংসা করলেন, এবং উভয় পক্ষ একে অপরকে দামি উপহার দিলেন, এবং শেবার রানি তার দেশে ফিরে গেলেন।"

নিউ টেস্টামেন্টেও শেবার রানির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ষষ্ঠ শতকের হিজরি লেখক ইবন আসাকির (দামেস্কের ইতিহাস) মতে, রানি শেবা সোলায়মানের সাথে দেখা করার আগে নয় বছর এবং তারপর চার বছর ইয়েমেন শাসন করেছিলেন।

সোলায়মানের প্রাসাদ থেকে শেবার রানির প্রস্থানের একটি কল্পিত স্কেচ (১৬৪৮ সালে তৈরি )

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সোলায়মানের প্রাসাদ থেকে শেবার রানির প্রস্থানের একটি কল্পিত স্কেচ (১৬৪৮ সালে তৈরি )

শেবার রানি কে ছিলেন এবং তিনি কোথা থেকে এসেছেন?

জোসেফাসের ইতিহাসে বলা হয়েছে যে, "তিনি মিশর এবং আবিসিনিয়ার রানি ছিলেন। আবিসিনিয়ার লোকেরা তাকে আবিসিনিয়ার বংশোদ্ভূত বলে মনে করত এবং আবিসিনিয়ার রাজারা বলতেন যে তিনি শেবার বংশধর"।

কিন্তু গবেষকরা জোসেফাসের এর ঐতিহাসিক বর্ণনাকে ভুল বলে মনে করেন। তারা বলেন যে, এই দুটি অঞ্চল ছিল ইয়েমেনের অংশ। সে কারণে বাইবেলের বর্ণনা বেশি ঠিক বলে মনে করা হয়। ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে রানির প্রাসাদের কিছু স্তম্ভ এখনও দেখা যায়।

ইয়েমেনের প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. ইউসুফ আবদুল্লাহ বিংশ শতকে ইয়েমেনের মারিব এলাকায় কিছু ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছিলেন, যা তিনি শেবার রানির রাজত্বের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করেন।

শেবার রানি তুর্কি, ফার্সি এবং ইউরোপীয় চিত্রকলা ও সঙ্গীতকে প্রভাবিত করেছিলেন। ১৯৫৯ সালের হলিউড চলচ্চিত্র 'সলোমন অ্যান্ড শেবা'-তে অভিনেতা ইউল ব্রায়নার সোলায়মান এবং অভিনেত্রী জিনা লুলো ব্রিজিডা রানী শেবার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

প্রথম শতাব্দীর রোমান ইহুদি ইতিহাসবিদ ফ্লাভিয়াস জোসেফাসও এই সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেছেন।

রানির নাম কোরআনে উল্লেখ নেই। প্রাচীন ও আধুনিক বিজ্ঞানের পণ্ডিত আবুল কালাম আজাদের মতে, ওল্ড টেস্টামেন্টে (তাওরাত) রানির নাম উল্লেখ নেই।

কোরআনের মতো, তাওরাতেও তাকে কেবল শেবার রানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর 'বিলকিস' (গ্রীক ভাষায় প্লাকিস) নামটি তখন থেকেই এসেছে যখন তাওরাত গ্রীক ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। এটি ছিল অনুবাদকদের সংযোজন, তবে পরে এটি আরবি, ফার্সি এবং উর্দু ভাষায় প্রচলিত হয়ে ওঠে।

মালিক রামের সংকলিত বই 'খাতসুত-এ আবুল কালাম আজাদ-এর এক চিঠিতে লেখা আছে যে, যখন তাওরাতের গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল, তখন অনুবাদক শেবার রানি সোলায়মানের সামনে উপস্থিত হয়ে তার সাথে যেভাবে কথা বলেছিলেন, তা দেখে অনুবাদক ভেবেছিলেন যে, তার এই আচরণ একজন রানির মতো শোভনীয় নয়, বরং একজন অসম্মানিত ও ভ্রষ্ট নারীর মতো ছিলো।

ইয়েমেনে আবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষের ছবি যা ১৯৫২ সালের ১৮ই এপ্রিল ধারণ করা হয়েছিলো। এই ধ্বংসাবশেষগুলি শেবার রানির প্রাসাদের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইয়েমেনে আবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষের ছবি যা ১৯৫২ সালের ১৮ই এপ্রিল ধারণ করা হয়েছিলো। এই ধ্বংসাবশেষগুলি শেবার রানির প্রাসাদের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়।

"তাই তিনি তাদের জন্য গ্রিক শব্দ 'প্লাকিস' ব্যবহার করেছিলেন, যার আক্ষরিক অর্থ 'ভ্রষ্ট বা অশ্লীল নারী' ছিল।"

যখন এই গ্রিক শব্দটি আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল, তখন আরবি অনুবাদক ভেবেছিলেন এটি রানির নাম, অর্থাৎ একটি বিশেষ্য ছিল। যেহেতু 'p' (প) অক্ষরটি আরবি ভাষায় নেই, তাই তিনি এটিকে 'বিলকিস' অনুবাদ করেন। তারপর সব আরবি ভাষাভাষী (এবং তাদের উদাহরণ অনুসরণ করে, ফার্সি এবং উর্দু ভাষাভাষীরা) এই নামটি গ্রহণ করেছিলেন। ফলে আজ আমরা নির্দ্বিধায় আমাদের মেয়েদের নাম 'বিলকিস' রাখি।

'দ্য আনফরগেটেবল কুইন্স অফ ইসলাম: সাক্সেশন, অথরিটি, জেন্ডার'- বইয়ের লেখক শেহলা হায়েরির মতে, ইহুদি এবং মধ্যযুগীয় মুসলিম সূত্রগুলো শেবার রানির উচ্চ মর্যাদাকে একজন দাস, যৌন বস্তু হিসাবে বর্ণনা করে তাকে অসম্মানিত করেছিল। কিন্তু জনসমক্ষে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতিতে, তিনি এখনও শেবার অবিস্মরণীয় রানি হিসেবে পরিচিত।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিলিয়ান স্টিঞ্চকম্ব বলেন, "এই ব্যক্তিত্বকে ঘিরে অনেক তথ্যের অভাব রয়েছে,"... যার কারণে, ভাষ্যকার এবং দোভাষীরা তাদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা বিকাশের সুযোগ পান।

কোরআন ও বাইবেলে শেবার রানিকে একজন বুদ্ধিমতী, স্বাধীন, নির্ভীক এবং মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

প্রথম শতাব্দীর খ্রিস্টীয় ইতিহাসবিদ ফ্লাভিয়াস জোসেফাস, যিনি "দ্য অ্যান্টিকুইটিজ অফ দ্য জিউন" বইয়ের লেখক। তিনি রানি শেবা সম্পর্কে লিখেছেন যে, তিনি "দর্শনের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন এবং অন্যান্য কারণে তিনি প্রশংসনীয় ছিলেন।"

যখন এই গল্পটি 'টারগুম শিনি', যা ৭ম বা ৮ম শতাব্দীর একটি ইহুদি গ্রন্থতে বর্ণিত হয়, তখন এতে আরও বিস্তারিত অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কোরআনে বর্ণিত শেবার রানির কাহিনী অবলম্বন করে, নারী নেতৃত্ব এবং কোরআনের দৃষ্টিতে সমাজে নারীর ভূমিকা নিয়ে প্রবন্ধ লেখা হয়েছে।

স্কেচ

ছবির উৎস, Getty Images

শাহলা হাইরির গবেষণা থেকে জানা যায় যে রানির লিঙ্গ, তার নেতৃত্ব এবং শাসন পদ্ধতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

'তবে মধ্যযুগীয় ব্যাখ্যায় লিঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। রানির বুদ্ধিমত্তা, অসাধারণ কূটনীতি এবং যুদ্ধ প্রতিরোধে সফল প্রচেষ্টা পুরুষতান্ত্রিক ভাষ্যকারদের কাছে গুরুত্ব পায়নি, বরং তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল এই 'অহংকারী' - অর্থাৎ স্বাধীন - নারীর শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা এবং বিয়ের মাধ্যমে তার চলাফেরা এবং যৌনতা সীমিত করা।

" অথচ তার (রানির) নেতৃত্ব এমন একটি আদর্শ শাসন ব্যবস্থার উদাহরণ ছিল, যা লিঙ্গকে ছাড়িয়ে যায়, আধিপত্যের চেয়ে সংলাপ, যুদ্ধ ও ধ্বংসের চেয়ে শান্তিকে প্রাধান্য দিয়েছিল।"

যদিও হিব্রু বাইবেল বা কোরআনে কোথাও শেবার রানি এবং সোলায়মানের মধ্যে কোনও যৌন সম্পর্কের উল্লেখ নেই, তবুও পরবর্তী অনেক রচনায় তাদের দম্পতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

চতুর্দশ শতাব্দীর ইথিওপীয় খ্রিস্টান কাহিনী 'কেব্রা নগাস্ট', শেবার রানিকে ইথিওপিয়া প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে।

এই গ্রন্থ অনুযায়ী, 'প্রাচীন শেবা ইথিওপিয়ায় ছিল এবং শেবার রানি এবং নবী সোলায়মানের ঘরে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছিল।'

তিনি একটি রাজকীয় বংশের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা ১৯৭৫ সালে শেষ উত্তরাধিকারী হাইল সেলাসির মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইথিওপিয়া শাসন করেছিলেন।