মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা নিয়ে কেন নিশানায় মমতার আস্থাভাজন ক্রীড়ামন্ত্রী?

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images
কলকাতার সল্ট লেক স্টেডিয়ামে গত শনিবার লিওনেল মেসির সফর ঘিরে যে ব্যাপক ভাঙচুর ঘটেছে, সেই ঘটনায় সোমবার মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
ভাঙচুরের সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পুলিশ এই পাঁচজনকে শনাক্ত করে।
এর আগে শনিবারই অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্তকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। রোববার আদালতে তোলা হলে তাকে ১৪ দিন পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
সল্ট লেক স্টেডিয়ামের ঘটনা নিয়ে মঙ্গলবার দুটি পৃথক জনস্বার্থ মামলা দায়ের করার অনুমতি দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট।
প্রথম মামলাটি করা হচ্ছে স্টেডিয়ামের ঘটনার ফলে রাজ্য হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তি খারাপ হওয়া নিয়ে। পৃথক একটি মামলায় আর্থিক ধোঁকা দেওয়া হয়েছে কী না, তার তদন্তের দাবি তোলা হয়েছে।
মাঠে ঢোকার মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যেই লিওনেল মেসি, সুয়ারেজ এবং ডি'পলদের বের করে নিয়ে যায় তাদের নিরাপত্তা কর্মীরা। তারপরেই পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে শুরু হয় তাণ্ডব।
দর্শকদের বক্তব্য হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও মেসিকে তারা দেখতেই পাননি, কারণ রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস সহ বহু অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষ তাকে ঘিরে রেখেছিলেন।
সেই আক্রোশেই স্টেডিয়ামে ব্যাপক ভাঙচুর চলে।
তবে শনিবারই হায়দরাবাদে এবং রবিবার মুম্বাইতে মেসিকে নিয়ে যে দুটি অনুষ্ঠান হয়েছে, তা সুষ্ঠুভাবে, কোনও সমস্যা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images
তদন্ত, গ্রেফতারি এবং মামলা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সল্ট লেক স্টেডিয়াম বা 'বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন' যে পুলিশ এলাকায় পড়ে, সেই বিধাননগর পুলিশ বলছে, যারা ভাঙচুর করেছিলেন, তাদের চিহ্নিত করার জন্য সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা চলছে। ওই ফুটেজ দেখেই সোমবার সকালে দুজন এবং দুপুরে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করেছে তারা।
গৌরব বসু এবং শুভ্রপ্রতিম দে নামে ওই দুজনকে গ্রেফতার করা হয় সোমবার সকালে। দুপুরে পুলিশ জানিয়েছে বাসুদেব দাস, সঞ্জয় দাস এবং অভিজিৎ দাস নামে আরও তিনজনকে তারা গ্রেফতার করেছে।
এছাড়াও শনিবারের ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিল এমন ছয়টি সংস্থার প্রতিনিধিদের তারা মঙ্গলবার ডেকে পাঠিয়েছে। এই সব সংস্থাগুলির মধ্যে যেমন আছে মূল উদ্যোক্তা 'শতদ্রু দত্ত ইনিশিয়েটিভ', তেমনই আছে স্টেডিয়ামের বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব পেয়েছিল এমন সংস্থাগুলিও।
যে সংস্থাটি অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি করেছিলে, তাদের জানানো হয়েছে টিকিট বিক্রির অর্থ যাতে মূল উদ্যোক্তা 'শতদ্রু দত্ত ইনিশিয়েটিভ'-এর অ্যাকাউন্টে না পাঠানো হয়। ওই অর্থ দর্শকদের ফেরত দেওয়ার কথা শনিবারই জানিয়েছিল পুলিশ।

ছবির উৎস, Samir Jana/Hindustan Times via Getty Images
যে ছয়টি সংস্থাকে ডাকা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছে যারা স্টেডিয়ামের জলের বোতল এবং ঠান্ডা পানীয় বিক্রির বরাত পেয়েছিল।
বহু দর্শক অভিযোগ করেছেন যে ২০ টাকা দামের জলের বোতল সেদিন ২০০ টাকাতেও বিক্রি করা হয়েছে। অথচ কলকাতার স্টেডিয়ামগুলিতে জলের বোতল নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। শনিবারের অনুষ্ঠানের আগে বিধাননগর পুলিশ সেকথা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েও দিয়েছিল।
তবুও কীভাবে একটি সংস্থা জলের বোতল বিক্রির অনুমতি পেল, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার মুকেশ সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন যে ওই অব্যবস্থার জন্য সম্পূর্ণভাবে উদ্যোক্তারাই দায়ী।
তার কথায়, "এক ঘণ্টা ৪০ মিনিটের অনুষ্ঠান যদি ২০ মিনিটে নামিয়ে আনা হয় তাহলে এটাই হওয়ার ছিল। পুরো অব্যবস্থাপনা দায়ী।"
ঘটনার পরেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন, তারাও তদন্ত শুরু করেছে।

ছবির উৎস, Shubhajit Roy Karmakar/NurPhoto via Getty Images
কী ঘটেছিল মাঠে?
শনিবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ যুবভারতীর মাঠে মেসির গাড়ি প্রবেশ করে। তার সঙ্গে ফুটবল খেলোয়াড় লুইস সুয়ারেজ এবং রদ্রিগো ডি'পলও ছিলেন।
তারা গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা কর্মীরা ছাড়াও নেতা-মন্ত্রী ও তারকা তাদের ঘিরে ধরেন। গ্যালারি থেকে লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ বা রদ্রিগো ডিপলের মধ্যে কাউকেই দেখা যাচ্ছিলো না।
ক্ষুব্ধ অনুরাগীরা 'উই ওয়ান্ট মেসি' বলে স্লোগান দিতে থাকেন। ক্রমে পরিবেশ আরো বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। মাত্র কুড়ি মিনিটের মধ্যেই নিরাপত্তা কর্মীরা মেসিদের নিয়ে বেরিয়ে যান।
এরপরেই শুরু হয় ভাঙচুর।
সল্ট লেক স্টেডিয়ামে মেসিকে দেখতে যারা গিয়েছিলেন, তাদেরই একজন অরুণ দত্ত রায় বিবিসি বাংলাকে ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে বলেছেন, "প্রথমে শুরু হয় জলের বোতল ছোঁড়া, তারপরে গ্যালারির ওপরে থাকা হোর্ডিংগুলি ভেঙে নিচে ফেলে দেওয়া হচ্ছিল। এরপরে ফাইবার গ্লাসের চেয়ারগুলির ওপরে উঠে দাঁড়িয়ে ভাঙা চলছিল''।

ছবির উৎস, Getty Images
"কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভেঙে ফেলা চেয়ার আর হোর্ডিংয়ের লোহার কাঠামোগুলি মাঠে ছোঁড়া শুরু হয়। আরেক দল দর্শক মাঠের ফেন্সিংয়ের দরজা ভাঙার চেষ্টা করতে থাকেন। প্রবল চাপে সেই গেটগুলো ভেঙে পড়ে। ভারতের সব থেকে উন্নতমানের ফুটবল ও অ্যথলেটিক্স মাঠগুলির অন্যতম এই সল্ট লেক স্টেডিয়াম বা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের মাঠে ঢুকে পড়েন শয়ে শয়ে মানুষ। পুলিশ কিছুক্ষণ তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে তারা সরে যায়," বলছিলেন মি. দত্ত রায়।
কলকাতার অন্তত দুটি সংবাদপত্র নিজেরা ঘটনাক্রম নিয়ে তদন্ত চালিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছে যে মাঠে সেদিন কী কী ঘটেছিল, যার প্রেক্ষিতে মেসির নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছিল?
আনন্দবাজার পত্রিকা এবং টাইমস অফ ইন্ডিয়া দুটি সংবাদপত্র শনিবারের ঘটনাক্রম নিয়ে পৃথক তদন্তমূলক প্রতিবেদন করেছে।
দুটি প্রতিবেদনেই লেখা হয়েছে যে ক্রীড়ামন্ত্রী সহ যে তথাকথিত 'ভিআইপি'রা মেসিকে ঘিরে রেখেছিলেন, তারা সেলফি তোলা এবং অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য এতটাই হামলিয়ে পড়েছিলেন যে সুয়ারেজ ও ডি'পলের গায়ে খোঁচা লাগে।
শেষমেষ এক নারী সেলফি তোলার জন্য মেসির হাত ধরে ফেলেন – এবং নিরাপত্তা কর্মীরা তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে মেসিকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান।

ছবির উৎস, Debarchan Chatterjee/NurPhoto via Getty Images
ক্রীড়ামন্ত্রীকে কেন নিশানা?
দর্শকরা বলছেন যে ২০ মিনিটের মধ্যেই মেসি মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেই ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ওপরে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
সেদিনের ঘটনার কারণে তৃণমূল কংগ্রেস দলের একাংশও মি. বিশ্বাসের ওপরে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। কয়েকজন নেতা-মন্ত্রী তার নাম না করে ক্রীড়ামন্ত্রীর দিকেই সেদিনের ঘটনাক্রমের জন্য নিশানা করছেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অত্যন্ত আস্থাভাজন মন্ত্রীদের মধ্যে একজন হলেন রাজ্যের ক্রীড়া মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। সরকারের পক্ষ থেকে তিনিই ছিলেন সেদিন মাঠের দায়িত্বে। লিওনেল মেসিরা যতক্ষণ মাঠে ছিলেন, ততক্ষণ তার প্রায় গা ঘেঁষেই ছিলেন মি. বিশ্বাস।
মাঠে দাঁড়িয়ে মেসির কোমর জড়িয়ে ধরে তোলা একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। একই সঙ্গে তার দুজন এবং মমতা ব্যানার্জীর পরিবারের তিনজনকে মেসির সঙ্গে পৃথক একটি ছবিতে দেখা গেছে। দ্বিতীয় ছবিতেও ছিলেন ক্রীড়া মন্ত্রী।
তবে মেসি মাঠ ছাড়ার কিছুক্ষণ পরেই অরূপ বিশ্বাসও মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ততক্ষণে অবশ্য দর্শকাসন থেকে জলের বোতল ছোঁড়া, চেয়ার ভাঙা শুরু হয়ে গিয়েছিল। মি. বিশ্বাস যখন মাঠ ছাড়ছেন, তার উদ্দ্যেশ্যেও দর্শকদের কটূক্তি করতে শোনা গেছে একাধিক ভিডিওতে।
তারও পরে ভাঙচুর আরও বাড়ে, দর্শকরা নেমে পড়েন মাঠে।

ছবির উৎস, Sudipta Das/NurPhoto via Getty Images
ক্রীড়া মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস নিজে হাজির থেকেও কেন এই বিশৃঙ্খলা সামলাতে পারলেন না, উলটে নিজেই মেসির সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, নিজের এবং মমতা ব্যানার্জীর পরিবারের কয়েকজন সদস্যকেও নিয়ে এলেন ছবি তোলানোর জন্য – এই সব কারণেই তাকে নিশানা করছেন বহু মানুষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও।
মি. বিশ্বাসের দফতরেরই প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন সদস্য মনোজ তিওয়ারিও নাম না করেই মন্ত্রীর সমালোচনায় মুখ খুলেছেন।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি সংবাদমাধ্যমে বলেন, "বিভিন্ন ভিডিও এবং ছবিতে যাঁদের দেখলাম, তাঁদের প্রত্যেকের দায়ে মেসি দ্রুত মাঠ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।"
তবে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ বলা হয়েছে যে শনিবারের বিশৃঙ্খলার এবং ভাঙচুরের জন্য দল এবং সরকারকে কোনোভাবে দায় করা যায় না।
অরূপ বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক নেতা বলছেন যে দলীয় ভাবে দায় নেই বলা হলেও মন্ত্রী যে সত্যিই চাপে পড়েছেন, সেটা তারাও উপলব্ধি করতে পারছেন।








