মস্কোর সঙ্গে ভারতের ব্যবসা নিয়ে আবার চড়াও ট্রাম্প, পাল্টা অভিযোগ দিল্লির

ছবির উৎস, Ashish Vaishnav/SOPA Images/LightRocket via Getty Images
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে তিনি ভারতের ওপরে আরও বেশি হারে শুল্ক চাপিয়ে দিতে পারেন। তবে ভারত সেই হুমকির পাল্টা বেশ কড়া জবাব দিয়েছে।
রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতকে যে নিশানা করছে, অথচ তারা নিজেরাই তো রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে দিল্লি।
রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেন কিনে চলেছে ভারত, সেই প্রশ্ন তুলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, সেই তেল খোলা বাজারে বিক্রি করে বড়সড় লাভ করছে ভারত।
রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্র ইউক্রেনে কত মানুষ মারছে, সে ব্যাপারে ভারতের কোনো মাথাব্যথা নেই, এমনও লিখেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ স্টিফেন মিলার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট, " রাশিয়া থেকে তেল কিনে ভারত যেভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থায়ন করছে, তা মেনে নেওয়া যাবে না।"
মি. ট্রাম্প যদিও শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিয়েছেন, তবে কত শতাংশ শুল্ক বাড়াবেন, তা নিয়ে কিছু লেখেননি। দিন কয়েক আগেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে ভারতের ওপরে ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক বসাচ্ছেন তিনি।
তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যাকে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে দাবি করে থাকেন, সেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারির জবাব দিয়েছে দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তারা পাল্টা খতিয়ান দিয়ে দেখিয়েছে যে আমেরিকাও তাদের পারমাণবিক শক্তি শিল্পের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড কিনে চলেছে।
দিল্লি বলেছে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতকে নিশানা করছে।
বর্তমানে ভারত রাশিয়ার খনিজ তেলের সব থেকে বড় আমদানিকারক দেশ। রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনের ওপরে আক্রমণ করার পর থেকে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়ে দিয়েছে, তবে সেই সময় থেকেই রাশিয়ার কাছে ভারত একটা বড় বাজার হয়ে উঠেছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Social Media
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সামাজিক মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এর পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, "ভারত যে শুধু বড় পরিমাণে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে, তা নয়, ওই তেল কিনে তার একটা বড় অংশ খোলা বাজারে বিক্রি করে বড়সড় লাভ করছে। তাদের এই বিষয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই যে রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্র ইউক্রেনে কত মানুষকে হত্যা করছে। এই কারণেই আমি ভারতের ওপরে শুল্ক বাড়াতে চলেছি।"
গত ৩০শে জুলাই মি. ট্রাম্প ভারতের ওপরে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছিলেন।
তিনি সেসময়ে এও বলেছিলেন যে যদি ভারত রাশিয়া থেকে অস্ত্র ও তেল কেনা জারি রাখে, তাহলে চালু শুল্কের ওপরে জরিমানাও চাপানো হবে।
মি. ট্রাম্পের অভিযোগ যে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের এই আমদানি ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ায় মদত দিচ্ছে।
মি. ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকির আগেই হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ স্টিফেন মিলার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, "মানুষ এই পরিসংখ্যান দেখে চমকে যাবেন যে রাশিয়া থেকে চীন আর ভারত প্রায় সমপরিমাণ তেল আমদানি করে থাকে। এটা খুবই আশ্চর্যজনক।"
"ভারত দাবি করে থাকে যে তারা আমাদের সবথেকে কাছের মিত্র, তবে তারা আমাদের পণ্য কেনে না। ভারত অভিবাসনের ক্ষেত্রে সমস্যা করে। এটা আমেরিকার শ্রমশক্তির কাছে বিপজ্জনক ব্যাপার। আর রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি করে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।"
"প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চান, কিন্তু আমাদের বাস্তবটাও বুঝতে হবে," বলেছেন তিনি।

ছবির উৎস, Dhiraj Singh/Bloomberg via Getty Images
ভারতের পাল্টা জবাব
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য খারিজ করে পাল্টা জবাব দিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে যে আমেরিকা আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেরাই তো রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে গত বছর কড়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার সঙ্গে সাড়ে তিনশো কোটি ডলারের বাণিজ্য চালিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের পোস্ট করা ওই বিবৃতিতে লেখা হয়েছে যে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি করা নিয়ে ভারতকে নিশানা করছে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
"তবে বাস্তবটা হলো রাশিয়ার কাছ থেকে ভারত এ কারণে আমদানি শুরু করেছিল যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে চিরাচরিত যোগান ইউরোপের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে আমেরিকা নিজেই ভারতকে উৎসাহিত করেছিল যাতে আমদানি করে তেলের বিশ্ববাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায়," জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, "ভারত নিজের ক্রেতাদের জন্য সস্তায় ও নিশ্চিত হওয়া যায় এমন শক্তির যোগান দিতে আমদানি করে থাকে। এটা বিশ্ব বাজারের পরিস্থিতির আবশ্যিকতা। কিন্তু এটা উল্লেখ্য, যে দেশ ভারতের সমালোচনা করছে, তারা নিজেরাই তো রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালাচ্ছে। ভারতের মতো তাদের এই বাণিজ্যের কিন্তু কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।"
ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছে, যে কোনো বৃহৎ অর্থনীতির মতোই নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষা করতে ভারত প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।
বিবৃতিতে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে ভারত বলেছে যে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার সঙ্গে কত পরিমাণে বাণিজ্য চালাচ্ছে।
পারমাণবিক শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইড ছাড়াও বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে ব্যবহৃত প্যালাডিয়াম, সার ও রাসায়নিক রাশিয়া থেকে আমদানি করে আমেরিকা।
অন্যদিকে ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৬৭.৫ বিলিয়ন ইউরো।
এছাড়াও ২০২৩ সালে রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে পরিষেবা বাণিজ্য হয়েছে ১৭.২ বিলিয়ন ইউরো-র। ওই বছর বা তার পরে ভারত-রাশিয়ার মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণের থেকেও বেশি।

ছবির উৎস, Andrew Harnik/Getty Images)
বিশ্লেষকরা কী বলছেন?
ভারতের সামরিক বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেলানির কথায়, মি. ট্রাম্পের মোকাবিলা করা ভারতের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
তিনি নিজের 'এক্স' হ্যান্ডেলে লিখেছেন, "নিজের আক্রমণাত্মক শুল্ক নীতি আর নিয়মকানুন উপেক্ষা করার সঙ্গেই ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে অস্থিরতা তৈরির কারিগর হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন ট্রাম্প।"
"তাকে মোকাবিলা করা যে কোনো দেশের পক্ষেই চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে – বিশেষ করে ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে। তার সর্বশেষ হুঁশিয়ারির পরে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের ব্যাপারে পশ্চিমা দ্বিচারিতার মুখোশ খুলে দেওয়া উচিত ভারতের," যুক্ত করে তিনি।
অন্যদিকে ভারতে আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত এরিক গার্সেটির একটা পুরনো বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে।
ওই ভিডিওতে মি. গার্সেটি বলেছেন, "আমেরিকা চেয়েছিল যে নির্ধারিত সর্বোচ্চ দামে ভারত তেল আমদানি করুক, সেজন্যই রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে ভারত। এটা কোনো বিধিনিষেধের লঙ্ঘন নয়। আমেরিকা চায়নি যে তেলের দাম বাড়ুক, সেজন্যই এটা হয়েছে।"
মি. গার্সেটি ২০২৪ সালের মে মাসে এক সাক্ষাৎকারে এই বক্তব্য রেখেছিলেন।








