কীভাবে ক্রেমলিনের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন রাশিয়ার সমকামীরা

- Author, উইল ভারনন
- Role, বিবিসি নিউজ, সেন্ট পিটার্সবার্গ
“আমি হচ্ছি রাশিয়ার একমাত্র ড্র্যাগ কুইন দানব” – আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভূতুড়ে সাদা মেকআপ লাগাতে লাগাতে বলছিলেন দানিয়া।
আমরা বসে আছি তার বাড়ির রান্নাঘরে।
দেয়ালে ঝুলছে রংধনু পতাকা।
রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে ‘জেন্ডার ব্লেন্ডার’ নামে একটি ক্লাবে দানিয়া যেসব শো করেন – তার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে ভয়-জাগানো বা ‘হরর থিম’।
কিন্তু সেই শো এখন বন্ধ হয়ে হয়ে গেছে।
এর কারণ – কিছু দিন আগে ডিসেম্বর মাসে রাশিয়ার পার্লামেন্টে একটি নতুন এলজিবিটি-বিরোধী আইন পাস হয়েছে।
এলজিবিটি মানে হচ্ছে লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল ও ট্রান্সজেন্ডার - অর্থাৎ নারী ও পুরুষ সমকামী, উভকামী, এবং লিঙ্গ-পরিবর্তনকারী – সবাইকে একসাথে বোঝাতে কথাটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
এখন, রাশিয়ার এই নতুন আইন পাস হবার পর দানিয়ার কাজ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলছেন, “আমরা যা করছিলাম, নতুন এই আইনে সেসব করা নিষিদ্ধ । আমরা এখন অনেক বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, ঝুঁকিও অনেক বেশি।“

“আমরা পুরোপুরি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাব”
নতুন এই আইনে সকল বয়সের রুশদের মধ্যে “ঐতিহ্যগত নয় এমন যৌন সম্পর্কের প্রচার” নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এসব “অপরাধে” লিপ্ত কেউ ধরা পড়লে তার ৪০০,০০০ রুবল পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। তাছাড়া কোন প্রতিষ্ঠান বা সাংবাদিকদের ক্সেত্রে এ জরিমানার পরিমাণ আরো বেশি।
এই আইন পাসের পর দানিয়া রাশিয়া ছেড়ে ফ্রান্সে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি বলছেন, যেখানে নিজের মতো করে থাকাটা বেআইনি সেরকম একটা দেশে থাকাটা তার জন্য ভীতিকর।
“আমার হাত বাঁধা। আমার সামনে আর কোন বিকল্প নেই। হয় আমাকে এদেশে ছেড়ে চলে যেতে হবে, নয়তো এখানে থেকে পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে এটা দেখতে হবে। এখন যা হচ্ছে তা খুবই ভীতিকর।“
'শয়তানি মতবাদ'
রাশিয়ার এই এলজিবিটি-বিরোধী নতুন আইন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ কিছুদিন পরই।
ঠিক এমন এক সময় এটা ঘটে যখন ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, রাশিয়া যে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে লড়ছে তা নয়, তারা লড়ছে “পশ্চিমা মূল্যবোধের” বিরুদ্ধেও ।
ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলকে রাশিয়ার অংশে পরিণত করার যে অনুষ্ঠান হচ্ছিল ক্রেমলিনে – তাতে ভাষণ দেবার সময় মি. পুতিন পশ্চিমা বিশ্ব আর এলজিবিটি অধিকারের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন, তাদের অভিহিত করেন “বিশুদ্ধ শয়তানি মতবাদ” হিসেবে।
এলজিবিটি অধিকার কর্মী পিওতর ভজনেজেনস্কি বলছেন, এলজিবিটি ইস্যুর সাথে ইউক্রেন যুদ্ধকে সম্পর্কিত করাতে বিস্মিত হবার কিছু নেই।
সেন্ট পিটার্সবার্গে তার ফ্ল্যাটে বসে মি. ভজনেজেনস্কি আমাকে দেখাচ্ছিলেন তার স্বল্পস্থায়ী এলজিবিটি জাদুঘরের জন্য সংগৃহীত সামগ্রীগুলো।
গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি প্রদর্শনীটি শুরু করেছিলেন, কিন্তু নতুন আইনটি পাসের পরই তিনি সেটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

'ইউক্রেন যুদ্ধে বিপর্যয় থেকে দৃষ্টি ফেরাতেই এ আইন'
পিওতর ভজনেজেনস্কি মনে করেন যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনী যেসব পরাজয়ের সম্মুখীন হচ্ছিল তার থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতেই এই আইনটা করেছিল ক্রেমলিন।
“তারা যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে, অর্থনীতি ধ্বংস হয়েছে, এসময় কর্তৃপক্ষকে এমন একটা কিছু মানুষকে দেখাতে হবে যার জন্য তারা জীবন বিপন্ন করেছে। এর জন্য সবচেয়ে ভালো আইডিয়া হচ্ছে নতুন একটি বলির পাঁঠা খুঁজে বের করা – আর তা হলো এলজিবিটি সম্প্রদায়ের লোকেরা। “
মি. ভজনেজেনস্কির বাড়িতে এলজিবিটি মিউজিয়ামে প্রদর্শিত অনেক জিনিস রয়েছে, কারণ মিউজিয়ামটি এখন বন্ধ।
এ ধরনের আইন রাশিয়ায় এই প্রথম নয়। দশ বছর আগে রাশিয়াতে একটি বিল পাস হয়েছিল যাতে শিশুদের মধ্যে তথাকথিত “সমকামী প্রচারণা” নিষিদ্ধ করা হয়।
মানবাধিকার গ্রুপগুলো বলছে – এর পর রাশিয়াতে সমকামী-বিরোধী সহিংস আক্রমণের ঘটনা খুব বেড়ে গিয়েছিল।

শুরু হয়ে গেছে সেন্সরশিপ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এলজিবিটিদের জন্য গড়ে তোলা মস্কোর একটি কেন্দ্রের কর্মী ওলগা বারানোভা বলছিলেন নতুন এই আইন এলজিবিটি সম্প্রদায়ের প্রতি মানুষের নেতিবাচক মনোভাবকে আরো বাড়িয়ে দেবে।
“আমরা পুরোপুরি আণ্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবো, অনেক রকম ভুয়া বিয়ে, ভুয়া পরিবারের ঘটনা ঘটবে। যাদের সুবিধা আছে তারা দেশ ছেড়ে চলে যাবে। যারা তা পারবে না তারা আত্মগোপনে চলে যাবে, এবং নানা ভাবে তাদের সঙ্গী খুঁজে নেবার চেষ্টা করবে। “
রাশিয়ার এই এলজিবিটিরা এখন যা নিয়ে চিন্তিত তা হলো – কোথায় কখন কার বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করা হবে। কারণ রাশিয়ার আইনগুলো অত্যন্ত ধোঁয়াটে - যা কর্তৃপক্ষ একটা ভোঁতা অস্ত্রের মত যেভাবে-খুশি ব্যবহার করতে পারে।
এই ভীতি-আতংকের কারণে এখনই যা শুরু হযে গিয়েছে - তা হলো সেন্সরশিপ।
অনলাইনে এলজিবিটি-বিষয়ক অনেক সিনেমা ও টিভি সিরিজ এর মধ্যে মুছে দেয়া হয়েছে, কোন কোনটি থেকে সমকামিতার দৃশ্য কেটে বাদ দেয়া হয়েছে।
এইবিও চ্যানেলে 'হোয়াইট লোটাস' নামে একটি সিরিজে থাকা ‘গে’ বা ‘পুরুষ সমকামী’ শব্দটি বাদ দিয়ে সেখানে শুধু ‘পুরুষ’ কথাটি বসিয়ে দিয়েছে একটি রুশ স্ট্রিমিং সার্ভিস।
এ ছাড়া একটি পুরুষ চরিত্রের নগ্ন পশ্চাদ্দেশের ছবির ওপর একটি তোয়ালে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। বাদ দেয়া হয়েছে একটি পুরুষ সমকামী যৌন দৃশ্য।
আর এসবই ঘটেছে নতুন আইন পাসের পর।
সেন্সরশিপ চলছে বইয়ের ক্ষেত্রেও

রাশিয়ায় সেন্সরশিপ চলছে বইয়ের ক্ষেত্রেও । দেশব্যাপি বইয়ের দোকানগুলো এলজিবিটি বিষয়ক বা এমন চরিত্রবিশিষ্ট বই সরিয়ে ফেলেছে।
সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি বইয়ের দোকানে আমি দেখতে পেলাম দুজন পুরুষের প্রেমের গল্প নিয়ে একটি উপন্যাস ‘শ্যাটার্ড’ বিক্রি হচ্ছে।
তবে এটি বিক্রি হচ্ছে প্লাস্টিকে মোড়া অবস্থায় এবং আপনাকে বইটি নেড়েচেড়ে দেখতে হলেও আগে তা কিনতে হবে।
বইটির বহু অংশ এর প্রকাশক কালি দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন।

'আমি চাই এক মুক্ত রাশিয়া'
রাশিয়ার এলজিবিটি-বিরোধী আইনটির প্রণেতাদের অন্যতম হচ্ছেন ভিতালি মিলোনভ। তিনি একজন জাতীয়তাবাদী এবং খোলাখুলিই তিনি তার সমকামী-বিদ্বেষী মতামত প্রকাশ করে থাকেন। তা ছাড়া তিনি পূর্ব ইউক্রেনে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুদ্ধ করতেও গিয়েছেন।
তার সাথে আমার কথা হয় ভিডিও লিংকে। তিনি বলছেন, এ আইনটি বৈষম্যমূলক নয় এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে সম্মান দেখানো হবে।
কিন্তু যখন ইউক্রেনে যুদ্ধ হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, রাশিয়া আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং লোকজন দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে – সেই সময় এলজিবিটি আইনের দিকে মনোনিবেশ করাটা কতটা যুক্তিসংগত? এ প্রশ্ন করেছিলাম মি, মিলোনভকে।
রাশিয়া যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এ অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তাদের সংঘাত পশ্চিমা বিশ্বের সাথে।
“আমাদের মতাদর্শ যে ভুল একথা আপনি কেন বলছেন? আমরা যেমন চাই তেমন আইন করার সার্বভৌম অধিকার আমাদের আছে,“ বলেন তিনি।
দানিয়া তার সেন্ট পিটার্সবার্গের ফ্ল্যাটে বসে আমাকে তার শো-র পোশাকগুলো দেখাচ্ছিলেন।
শহরের ক্লাবগুলোর দর্শকরা তাকে ভালোবাসতেন। তিনি বলছেন, তিনি এ শহর ছেড়ে যেতে চাননা।
আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, রাশিয়াকে কেমন দেখতে চান তিনি।
“আমি চাই মুক্ত এক রাশিয়া” – বলছিলেন তিনি, “যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব হবে না। আমি মনে করি আমার যৌন অভিরুচি জন্মগত। তাই এটাকে বাতিল করা, নিষিদ্ধ করা বা এর জন্য আমার বিচার করার অধিকার কারো নেই।“








