আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ট্রাইব্যুনালে টবি ক্যাডম্যানের না থাকা নিয়ে আলোচনা, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিশেষ পরামর্শক পদে ব্রিটিশ আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান আর না থাকার খবর নিয়ে বাংলাদেশে অনেকের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
মি. ক্যাডম্যানের না থাকার খবরটি প্রথম এসেছে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের ফেসবুক ও এক্স-হ্যান্ডেলে দেয়া পোস্টের মাধ্যমে, যা পরে নিশ্চিত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
গত নভেম্বেরেই টবি ক্যাডম্যানের সাথে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি শেষ হয়েছে।
মি. ক্যাডম্যানকে উদ্ধৃত করে ডেভিড বার্গম্যান লিখেছেন যে, সরকার তার মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও তিনি তাতে রাজি হননি।
কিন্তু কেন তিনি চিফ প্রসিকিউটরের বিশেষ পরামর্শক পদে নতুন করে থাকতে চাননি সেটি তিনি প্রকাশ করেননি।
অন্যদিকে সোমবার বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালর চীফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান যে, মি. ক্যাডম্যানের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং আইন মন্ত্রণালয় তার সাথে নতুন করে কোনো চুক্তিতে যাবে না বলে জানিয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৯শে নভেম্বর চিফ প্রসিকিউটরের বিশেষ পরামর্শক (স্পেশাল অ্যাডভাইজর) পদে টবি ক্যাডম্যানকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তাঁর মেয়াদ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাজুল ইসলাম।
লন্ডনভিত্তিক গার্নিকা ৩৭ ল ফার্মের যুগ্ম প্রধান মি. ক্যাডম্যান।
তিনি বিশেষ পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ লাভের পর প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেয়া পোস্টে লিখেছিল "টবি ক্যাডম্যানের ভূমিকা হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–সংক্রান্ত সব বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটরকে পরামর্শ দেওয়া"।
কৌতূহল ও আলোচনা কেন
টবি ক্যাডম্যান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারের সময়ে অভিযুক্তদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু তখন ঢাকায় বিমানবন্দর থেকেই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল সরকার।
দুই হাজার চব্বিশ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই ঢাকায় আসেন টবি ক্যাডম্যান। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ঢাকায় তিনি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে দেখা করেছিলেন।
এরপর নভেম্বরে তিনি চিফ প্রসিকিউটরের স্পেশাল অ্যাডভাইজর বা বিশেষ পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পান।
এখন তার পদত্যাগ কিংবা মেয়াদ না বাড়ানোয় চলে যাওয়ার খবর নিয়ে অনেকের মধ্যেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে এবং নানা ধরনের আলোচনাও হচ্ছে।
আর এই কৌতূহল ও আলোচনার একটি কারণ হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের বিশেষ পরামর্শক পদ থেকে তার সরে যাওয়ার খবরটি প্রকাশ হলো ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় রায় ঘোষণার জন্য নির্ধারিত তারিখের আগের দিন।
আজ মঙ্গলবার ওই রায় দেওয়ার তারিখ নির্ধারিত থাকলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার তারিখ পিছিয়ে আগামী ২৬শে জানুয়ারি ঠিক করেছে।
শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকার চাঁনখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ মোট আসামি আটজন। তবে মি. রহমানসহ ৪ জন আসামি পলাতক।
ওদিকে এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রথম রায়ে তিনটি ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
অপর তিনটি ঘটনায় তাদের দুজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করার পর গত পনেরই জানুয়ারি আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত শুনানির তারিখ ২০শে জানুয়ারি নির্ধারণ করেছিলেন।
কিন্তু আজ সেটি মামলার কার্যতালিকায় আসেনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের ওই মামলায় চিফ প্রসিকিউটরের পরামর্শক হিসেবে ভূমিকা রেখেছিলেন টবি ক্যাডম্যান।
এছাড়া জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) সংঘটিত গুমের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাও এখন চলছে। এই মামলায় শেখ হাসিনার সাথে আসামি করা হয়েছে বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাকে।
মামলায় অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের সেনা হেফাজতে রেখে শুনানির জন্য সেখান থেকে ট্রাইব্যুনালে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় আনা-নেওয়া করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১০ সালে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল, সেখানে জামায়াতে ইসলামীর একাধিক শীর্ষ নেতা ও বিএনপি নেতাদেরও বিচার হয়েছে, অনেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
পরে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরে অক্টোবরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল আইনে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলা (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) হয়।
এই ট্রাইব্যুনালে এক সময় জামায়াত নেতাদের পক্ষে যারা আইনজীবী হিসেবে ছিলেন, তারাই গণ অভ্যুত্থানের পরে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে রয়েছেন।
সে কারণেই শেখ হাসিনার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বারবার বলে আসছেন, "এই বিচার প্রতিহিংসার নয়, প্রতিশোধের নয়"।
খবরটি যেভাবে আসে
বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিভিন্ন সময়ে কাজ করা ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে লেখালেখির কারণে বাংলাদেশের সুপরিচিত।
এখন তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই অগাস্টে সংঘটিত ঘটনাগুলোর জন্য হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার কার্যক্রম নিয়েও নিয়মিত লেখালেখি করছেন।
সোমবার বিকেলে তিনি তার ফেসবুক পাতায় লিখেন: "ব্রেকিং: যুক্তরাজ্যের ব্যারিস্টার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ টবি ক্যাডম্যান দেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে অবহিত করেছেন যে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের স্পেশাল অ্যাডভাইজরের পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন''।
কোনো কারণ এখনো বলা হয়নি।
এই সংবাদ এমন সময় এসেছে যার পরদিন আইসিটি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের সাথে সম্পৃক্ত দ্বিতীয় রায় দেওয়ার কথা। ওই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হয়"।
তিনি পরে তার এই পোস্টে যোগ করেন: "টবি ক্যাডম্যান তার মন্তব্য দিয়েছেন: "আমার চুক্তি নভেম্বরে শেষ হয়েছে এবং আমাকে মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কিন্তু আমি মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার সরে যাওয়ার কারণ বলা সমীচীন হবে না"।
পরে ঢাকার দৈনিক প্রথম আলোকে ক্যাডম্যান জানান যে তিনিই তার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে জানিয়েছেন। পত্রিকাটিকে তিনি একই সাথে জানান যে, তিনি তার সিদ্ধান্ত প্রধান উপদেষ্টা ও আইন উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন।
তার দাবি, সরকার তার মেয়াদ ছয় মাসের জন্য বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও তিনি তা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত আইন মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন।
ওদিকে ক্যাডম্যানের পদত্যাগ বা চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্তের খবর বার্গম্যানের পোস্টের মাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর ওই দিনই নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন তাজুল ইসলাম।
মি. ইসলাম জানান, টবি ক্যাডম্যানকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং সরকার প্রথমে এর মেয়াদ বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করেছিল।
"টবি নিজেও সরকারকে অ্যাপ্রোচ করেছিলেন, তিনি এক্সটেনশন চান। কিন্তু ফাইনালি আইন মন্ত্রণালয় চিন্তা করে বলে দিল যে যেহেতু তাঁদের মেয়াদ মাত্র কয়েক দিন আছে, এ মুহূর্তে আর নতুন করে কোনো অ্যাগ্রিমেন্টে যাবে না," বলেছেন তিনি।