খাবার কি আসলেই মানসিক উদ্বেগ কমাতে পারে?

ছবির উৎস, Getty Images
ওমেগা থ্রি গ্রহণ থেকে শুরু করে কিটো ডায়েট মেনে চলা –যে কোনও ধরনের উন্নত ডায়েট উদ্বেগ বা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করেন বিশেষজ্ঞরা।
উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা বিশ্বজুড়েই একটা সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও পরীক্ষা বা চাকরির ইন্টারভিউয়ের মতো নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতির কারণে উদ্বিগ্ন হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক মানুষ এখন নিয়মিতভাবে উদ্বেগের শারীরিক এবং মানসিক লক্ষণগুলো অনুভব করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগসহ বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে খাদ্যের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন।
“বিভিন্নভাবে বিভিন্ন নামে এর অনুশীলন হয়, যার মধ্যে রয়েছে পুষ্টির মনোরোগবিদ্যা (নিউট্রিশনাল মনোরোগবিদ্যা ) এবং মেটাবলিক মনোরোগবিদ্যা," ব্যাখ্যা করেছেন ড. নিকোলাস নরউইটজ, যিনি এই বিষয়ে গবেষণা করেছেন।
"একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা কেমন সেটা দেখার একটা আইডিয়া এটি - অন্তত আংশিক যেন বুঝতে পারা যায়, যেমন ডায়াবেটিস বা স্থূলতায় আক্রান্ত মানুষের মেটাবলিক কন্ডিশন।”
"শরীরের অন্যান্য অঙ্গগুলো থেকে মস্তিষ্ক আলাদাভাবে কাজ করে – এরকম মনে করার কোনও কারণ নেই। কারণ প্রত্যেকটি অঙ্গের কার্যক্রম খাদ্য দ্বারা প্রভাবিত। সেই কারণে, পুষ্টিকর খাবার ও লাইফস্টাইল সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্য তৈরিতে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।”
তাহলে, থেরাপি এবং ওষুধের পাশাপাশি, কোন খাবার এবং ডায়েটগুলো উদ্বিগ্ন মানুষের উদ্বেগ বা মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে?
প্রোবায়োটিকস ও ফার্মেন্টেড ফুড
“মাইক্রোবায়োম ও উদ্বেগের মধ্যে একটা দ্বি-মুখী সম্পর্ক আছে,” বলছেন মি. নরউইটজ, যিনি এক গবেষণায় তুলে ধরেছেন যে, আমাদের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ভ্যাগাস নার্ভের মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্কের সাথে সংযোগ তৈরি করে (কথা বলে)।
“আপনার অন্ত্রের সঙ্গে যদি মস্তিষ্কের সংযোগ থাকে, তাহলে সেটা মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দারুণ একটা সাইকেল তৈরি করতে পারে। আপনি যা খাচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করছে আপনার মনের ইতিবাচক বা নেতিবাচক অবস্থা”- বলছেন মি. নরউইটজ।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ফার্মেন্টেড ফুড যেমন দই, কম্বুচা, কিমচি বা ফার্মেন্টেড বাঁধাকপি, ফার্মেন্টেড সবজি, চিজ, ভিনেগার, পাউরুটি- এমন সব খাবারগুলোতে ভালো ব্যাকটেরিয়া থাকে। ভালো ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এসব খাবার খেলে মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো থাকে- তাই নিয়মিত এ ধরনের খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
অস্ট্রেলিয়ার ডিয়াকিন ইউনিভার্সিটির ফুড অ্যান্ড মুড সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর ফেলিকা জাকা তার গবেষণাতেও দেখেছেন, উদ্বেগ, মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক রয়েছে।
প্রফেসর জাকা বলছেন “মানসিক এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা সম্পর্কে আমরা নতুন গবেষণায় যা জানতে পেরেছি, তা অনেক বড় একটা অগ্রগতি। এই গবেষণার ফল ভবিষ্যতের অনেক কিছুকে প্রতিনিধিত্ব করবে। অন্ত্রের স্বাস্থ্য ও এর ব্যাকটেরিয়াকে প্রভাবিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা অনুষঙ্গ হলো ডায়েট”।
“এই বিষয় নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য কীভাবে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা যাবে ও কীভাবে এর পরিচালনা করতে পারি- এ বিষয়ে জানতে হয়তো আমাদের বেশি সময় লাগবে না।”
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার হবে, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট এবং ফার্মেন্টেড ফুড যা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা পদ্ধতির অংশও হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ওমেগা থ্র্রি ফ্যাটি এসিড
মস্তিষ্কের সাধারণ কার্যকারিতার জন্য ওমেগা থ্রি যে বেশ সহায়ক এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় এটাও উঠে এসেছে যে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বিষণ্ণতা, মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে । অর্থাৎ মানসিক স্বাস্থ্য ও মনমেজাজ ভালো রাখতে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিডযুক্ত খাবার ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, উচ্চমাত্রার ওমেগা থ্রি গ্রহণ ও প্রদাহের মাত্রা কম থাকার সঙ্গে একটা সম্পৃক্ততা আছে, যার ফলে উদ্বেগ বা মানসিক চাপের লক্ষণগুলো কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন - প্রদাহ কমাতে, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ওমেগা থ্র্রি খুবই প্রয়োজনীয়।
নরউইটজ বলছেন, “ওমেগা থ্রি ও উদ্বেগ সংক্রান্ত যেসব ডেটা পেয়েছি তা দারুণ। সামুদ্রিক মাছে যে ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায় তা মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মনের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এটি। ”
খাদ্যতালিকায় কোনও তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত মাছ অন্তর্ভুক্ত করার সময় এই বিষয়গুলো মনে রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
ওমেগা থ্রি হলো অসম্পৃক্ত বা আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা মূলত মাছের তেলে পাওয়া যায়। প্রায় সব মাছেই কম বেশি ওমেগা–৩ চর্বি থাকে। তবে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় সামুদ্রিক মাছে। যেমন ইলিশ, টুনা, সার্ডিন, স্যামন, ট্রাউট, হেরিং, কড মাছের তেলে।

ছবির উৎস, Getty Images
"সার্ডিন, স্যামনসহ বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছে যে ধরনের ওমেগা থ্রি পাওয়া গেছে তা 'মস্তিষ্কে প্রাপ্ত নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর' বাড়াতে পারে যেটা মস্তিষ্কের জন্য স্বাস্থ্যকর এবং ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মাত্রা উন্নত করতে পারে।"
সপ্তাহে অন্তত দুইবার ওমেগা-থ্রি–সমৃদ্ধ মাছ খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে মাছ না ভেজে গ্রিল করে কিংবা অল্প আঁচে রান্না করে খাওয়ার পরামর্শ দেন তারা। কারণ- অল্প আঁচে রান্না বা গ্রিল করলে মাছের তেলে অপরিবর্তিত ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায়।
মাছ ছাড়াও কিছু খাবারে ওমেগা থ্রি অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। যেমন আখরোট বা তিসির তেল, চিয়া সিড, সয়াবিন, সবুজ সবজি, ইত্যাদি।
তবে ওমেগা থ্রি সমৃদ্ধ মাছ আর বাদাম জাতীয় খাবার যদি কেউ সপ্তাহে দু-তিনদিন না খান তাহলে তাদের বিকল্প উৎস বা সাপ্লিমেন্ট নেয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
মেডিটেরিয়ান বা ভূমধ্যসাগরীয় খাবার
বেশ কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে, কীভাবে মেডিটেরিয়ান বা ভূমধ্যসাগরীয় খাবার মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একটা কারণ হলো – এটা রক্তে সুগার বা শর্করার মাত্রা সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখে যেটা মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকদের মতে - "যদি কারও রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়, তাহলে তিনি ক্লান্ত, খিটখিটে বা বিষণ্ণ বোধ করতে পারেন। নিয়মিত খাওয়া এবং ধীরে ধীরে শক্তি নির্গত করে এমন খাবার খাওয়া হলে, তা ব্যক্তির রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করতে পারে।"
বেশি মাংস ও দুগ্ধজাত খাবার থাকে না ভূমধ্যসাগরীয় খাবারে। সাধারণ ফল, শাকসব্জি, শস্যদানা, মাছ, বাদাম ও অলিভ অয়েল থাকে এই ধরনের খাবারে।
এমন খাবার মন মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে বলে গবেষকরা বেশ কিছুদিন ধরেই দাবি করে আসছেন।
গবেষক পিরিল হেপসোমালি বলছেন, তিনি ও তার দল বিভিন্ন গবেষণায় দেখেছেন যে ডায়েটে সুষম খাবার বিশেষ করে শাকসবজি, মাছ, ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার ও পানি বেশি পরিমাণে থাকলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে মনের ওপর।
যদিও এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ - কোনও একক খাদ্য উপাদান বা নির্দিষ্ট গ্রুপের খাবার থেকে সব উপকারিতা আসে না। খাদ্যে বৈচিত্র থাকা জরুরি।
“প্রদাহ কমাতে যে ডায়েট তৈরি করা হয়, সেই ডায়েট উদ্বেগজনিত লক্ষণ কমাতে সাহায্য করে”, বলছেন পিরিল হেপসোমালি।
কিটো ডায়েট

ছবির উৎস, Getty Images
লো-কার্ব ডায়েট মানসিক স্বাস্থ্যে কতটা সাহায্য করে এই নিয়ে গত বেশ কয়েক বছর ধরে গবেষণা চলছে।
ওজন কমানোর উপায় হিসেবে পুরো বিশ্বেই কিটো ডায়েটের জনপ্রিয়তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ বেড়েছে। কিছু গবেষণায় এটাও বলা হয়েছে যে এমন ডায়েট মনের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটায়।
ড. নিকোলাস নরউইটজ বলছেন, "অনেকগুলো ট্রায়াল হয়েছে যেখানে দেখা গেছে যে কিটোজেনিক ডায়েট মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে। ফ্রান্সের সাম্প্রতিক একটি গবেষণাতেও ইতিবাচক ফলাফল এসেছে যা অনেকের নজর কেড়েছে।"
গবেষণার অংশ হিসেবে, বিষণ্ণতা, বাইপোলার এবং সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তদের নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করেন গবেষকরা । সেখানে তারা দেখতে পান যে কিটো ডায়েটের ফলে তাদের মানসিক অসুস্থতা প্রায় শতভাগ দূর হয়ে গেছে।
"এই বিষয়ে অনেকেই বলছেন, এমনকি চিকিৎসকরাও বলছেন যে কিটোজেনিক ডায়েট উদ্বেগকে অনেকটাই প্রশমিত করতে পারে " – বলছেন মি নরউইটজ।
তবে নতুন ডায়েট শুরু করার আগে অবশ্যই পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে– কারণ একেক ব্যক্তির স্বাস্থ্য বিবেচনায় পুষ্টি চাহিদা বা প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন ভিন্ন, আর এই কথাটা ড. নরউইটজসহ সব বিশেষজ্ঞরাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

ছবির উৎস, Getty Images








