আলোচনায় কোহিনূর মিয়া,পুলিশ ও প্রশাসনে অবসর-বরখাস্ত থেকে ফেরানোর প্রভাব কেমন হবে

বাংলাদেশ সচিবালয়

ছবির উৎস, BBC/ABUL KALAM AZAD

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশ সচিবালয়
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশের বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ব্যাপক আলোচিত হওয়া ও পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বরখাস্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়ার দীর্ঘ পনের বছর পর আবার পুলিশের চাকরি ফেরত পাওয়ার খবর সংবাদ মাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আগের বরখাস্ত আদেশ বাতিল করে তাকে বকেয়া বেতন ভাতাসহ চাকরিতে পুনর্বহাল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।

এর আগে অধ্যাপক মুহাম্মদের ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমন অনেক ব্যক্তিকে চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, যারা দীর্ঘকাল আগেই চাকরি থেকে অবসরে গিয়েছিলেন বা সরকার অবসরে পাঠিয়েছিল।

কিন্তু এখন নির্বাচিত সরকারের সময়েও একই চর্চা অব্যাহত থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পুলিশ ও প্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে।

সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় এ ধরনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কর্মরতদের মধ্যে এবং এটি আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে বলে মনে করেন তারা।

তাদের মতে, যারা বঞ্চিত ছিলেন তাদের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা দিয়ে ভিন্নভাবে কাজে লাগাতে পারে সরকার কিন্তু সেটি না করে দীর্ঘকাল ধরে কাজে সম্পৃক্ত না থাকা এসব ব্যক্তিকে সরাসরি একই পেশায় ফিরিয়ে আনলে সেটি কর্মরত যারা আছেন তাদের জন্য ক্ষতিকর হবে।

যদিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেওয়া বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে 'মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণের' প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

সেখানে বলা হয়েছিল, "বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে"।

পুরনো কিছু কর্মকর্তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে পুলিশ ও জনপ্রশাসনে
ছবির ক্যাপশান, পুরনো কিছু কর্মকর্তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে পুলিশ ও জনপ্রশাসনে

কোহিনূর মিয়া আলোচনায় কেন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক বছরের মধ্যেই আলোচিত হয়ে উঠেছিলেন তখনকার পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়া।

ওই আমলে একসময় তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার ছিলেন। বিসিএস ১২ ব্যাচের এই কর্মকর্তা ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার হিসেবেও কাজ করেছেন। এই ব্যাচের অনেক কর্মকর্তারা বর্তমানে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদায় রয়েছে বা অবসরে গেছেন।

তবে ২০০২ সালের জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে গভীর রাতে পুলিশি অভিযানের ঘটনায় তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিলেন। ওই ঘটনার জেরে তীব্র আন্দোলনের মুখে তখনকার উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

বিএনপি সরকারের সময়েই তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছিল। যদিও এসব মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন।

পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০০৯ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোহিনূর মিয়াকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

এর দুই বছর পর ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

এখন আবার সরকার তাকে পুলিশের চাকরিতে ফিরিয়ে আনার পর এ নিয়ে আলোচনা- সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

চাকরি থেকে বিদায় নেওয়ার দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে আসার ক্ষেত্রে কোহিনূর মিয়াই একমাত্র উদাহরণ নন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেক আগে অবসরে পাঠানো অনেক কর্মকর্তাকে চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল

ছবির উৎস, CA PRESS WING

ছবির ক্যাপশান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেক আগে অবসরে পাঠানো অনেক কর্মকর্তাকে চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল

দীর্ঘবিরতির পর ফিরে আসা

আওয়ামী লীগের আমলে যুগ্ম সচিব হিসেবে অবসরে গিয়েছিলেন এ বি এম আব্দুস সাত্তার। এরপর ২০১৫ সাল থেকে তিনি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার একান্ত সচিবের কাজ করছিলেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে সচিব করা হয়। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মি. সাত্তারকে চুক্তিভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত দাবি করে আবেদন করা দেড় হাজার কর্মকর্তার (অবসরপ্রাপ্ত) মধ্যে ৭৬৪ জনকে উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব, গ্রেড-১ ও সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চাকরির বাইরে থাকা অনেকেরও আবার বকেয়া সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে চাকরিতে ফিরে আসার সুযোগ হয়েছিল। সেসময় ভূতাপেক্ষা পদোন্নতি পেয়ে সচিব হয়েছিলেন ১১৯ জন।

তবে কিছু নিয়োগ সেসময় বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তার মধ্যে ছিলেন পুলিশের সদ্য বিদায়ী আইজিপি বাহারুল আলমও।

মি. আলম ২০২০ সালে চাকরি থেকে অবসরে গিয়েছিলেন। তাকেই অবসর থেকে ফিরিয়ে এনে ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইজিপি করেছিল মি. ইউনূসের সরকার।

আবার পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি থাকা অবস্থায় ২০১৬ সালের নভেম্বরে চাকরীচ্যুত হওয়া পুলিশ ক্যাডারের ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা শেখ মো. সাজ্জাত আলীকে নিয়োগ দেওয়া হয় ডিএমপির কমিশনার পদে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা দুজনই চাকরি থেকে বিদায় নিয়েছেন।

ওদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সিনিয়র সচিব হয়েছিলেন বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, যাকে ২০১৩ সালে অবসরে পাঠিয়েছিল তখনকার সরকার।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসারও পরেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতেই অবসর থেকে ফিরিয়ে এনে চারজনকে চুক্তিভিত্তিতে সচিবের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার।

এর মধ্যে স্থানীয় সরকার সচিব করা হয়েছে শহীদুল হাসানকে যিনি ২০০৮ সালে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অবসরে গিয়েছিলেন।

আবার ৬৯ বছর বয়েসী মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদকে এক বছরের জন্য ধর্মসচিব কবরা হয়েছে, যিনি ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর তাকে ওএসডি করা হয়েছিল এবং তারপর আর কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়নি। তবে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (বিডা) পরিচালক ছিলেন।

আবার অন্তর্বর্তী সরকারের সরকারের সময়ে সিনিয়র সচিব হয়েছিলেন বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, যাকে ২০১৩ সালে অবসরে পাঠিয়েছিল তখনকার সরকার।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পরেও বহু বছর আগে অবসরে যাওয়া কিংবা চাকরি হারানো কিছু কর্মকর্তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে

ছবির উৎস, PID

ছবির ক্যাপশান, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হওয়ার পরেও বহু বছর আগে অবসরে যাওয়া কিংবা চাকরি হারানো কিছু কর্মকর্তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে

অবসর থেকে ফিরিয়ে আনার প্রভাব কেমন হবে

বাংলাদেশের সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী সরকার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারে। তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ দক্ষতা, যোগ্যতার বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে বিবেচনা করার কথা।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলছেন, এটি করা হয়েছিল এজন্য যে সরকার যেন বিশেষভাবে দক্ষ কর্মকর্তাদের অবসরের পরেও চাইলে কাজে লাগাতে পারে।

সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান বলছেন, স্বাধীনতার পরপরই সরকার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি চালু করেছিল তবে তখন সেটি করা হয়েছিল বিজ্ঞানী, গবেষক ও ইংরেজির শিক্ষকের মতো কিছু ক্ষেত্রে। পরে জেনারেল এরশাদ সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংখ্যা দশ শতাংশ করা হয়।

তবে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন থেকে বরাবরই এ ধরনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধিতা করা হয়েছে।

"চুক্তিভিত্তিতে একজনকে সচিব পদে নিয়োগ দিলে নিয়মিত কাজ করছেন এমন চারজন কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন কিংবা নিয়মিত পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন। অন্তর্বর্তী সরকার ৫/১০ বছর আগে অবসরে যাওয়া লোকজনকে যাকে খুশী নিয়োগ দিয়েছে। অথচ সরকার চাইলে তাদের রেগুলার সার্ভিসের বাইরেও কাজে লাগাতে পারতো। তাতে করে পুলিশ বা প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা হতো না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. খান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেউ অন্যায়ভাবে বঞ্চিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার সেটি পর্যালোচনা করে তাকে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা ও পেনশন দিয়ে অন্য কোনোভাবে কাজে লাগাতে পারতো।

ওদিকে অবসরের পর দীর্ঘ বিরতিতে যাদের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তারা এখনকার কর্মকর্তাদের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেননি- এমন কথাও প্রচলিত আছে সচিবালয়ে।

"চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ রাজনৈতিক বিবেচনায় পুরস্কৃত করার জন্য ব্যবহৃত হলে এটা খারাপ নজির তৈরি করবে। এগুলোর মাধ্যমে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও ভালো প্রশাসন আর কখনোই হবে না। ভালো আমলাতন্ত্র হবে না। অথচ সরকারের ভিশন বাস্তবায়নের জন্যই দক্ষ আমলা দরকার। মনে রাখতে হবে দশ বছর আগের প্রশাসন আর এখনকার প্রশাসন তো এক না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ফিরোজ মিয়া।

তার মতে, খুব দক্ষ ছাড়া কাউকে চুক্তিভিত্তিতে আনা হলে তারা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্য বোঝা হবে এবং এদের কারণে প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা তৈরির হতে পারে।