আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
রূহ আফজা- রমজানে জনপ্রিয় এক পানীয়ের এক শতাব্দীর ইতিহাস
- Author, সানজানা চৌধুরী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
রমজান মাস আসার সাথে সাথেই মুসলিম সমাজে প্রতিদিনের জীবনে শুরু হয় সেহরি ও ইফতারের আলোচনা।
ঘরে ঘরে পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা-মুড়ির মতো নানা ইফতারের আইটেমের সাথে টেবিল সাজানো হয় বিভিন্ন রকম শরবত দিয়ে। এসব শরবতের মধ্যে শতাব্দি পুরনো এক পানীয় হলো রূহ আফজা।
বাংলাদেশের বাইরে পাকিস্তান ও ভারতেও এটি রমজানের সময় বেশ প্রচলিত এক পানীয় যার চাহিদা বেড়ে যায় রমজান মাসে।
রূহ আফজার যাত্রা শুরু হয়েছে দিল্লীতে ১৯০৬ সালে। সে হিসেবে পানীয়টির বয়স ১২০ বছর। ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়া থেকে শুরু করে একাধিক যুদ্ধের সাক্ষী এই হয়েছে এই ব্র্যান্ডটি।
উর্দু শব্দ 'রূহ' অর্থ আত্মা বা প্রাণ, আর আফজা অর্থ যা সতেজ করে। ফলে এই পানীয়ের নামের অর্থ দাঁড়ায় "আত্মাকে সতেজ করে এমন পানীয়।"
রমজানের সাথে এই পানীয়র সংযোগটা এতোটাই গভীর যে বাংলাদেশে গত বছরের রমজানের সময় ফেসবুকে একটি ট্রেন্ড ছিল, "ছোটবেলায় মনে করতাম রূহ আফজা শরবত খেলে সওয়াব হয়।"
অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী জানান, প্রতিটি রমজানে তাদের মাসের বাজারে একটি বোতল রূহ আফজা থাকেই থাকে।
পাকিস্তানের বাসিন্দা আজির হাসান রিজভী তার সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন, রমজানে এশীয় মুসলমানদের কাছে রূহ আফজার গুরুত্ব ঠিক তেমনই, যেমনটা কার্টুন চরিত্র পপাইয়ের কাছে পালং শাকের।
ফেসবুক ব্যবহারকারী মারিয়া সারতাজ বলেছেন, রমজান ও রূহ আফজা একে অপরের পরিপূরক, আর ইফতার টেবিলের আসল সৌন্দর্য বাড়ায় এই লাল শরবতই।
তবে রূহ আফজার খাওয়ার পদ্ধতিতেও ভিন্নতা দেখা যায়। কেউ দুধের সঙ্গে পান করতে পছন্দ করেন, কেউ পানির সঙ্গে। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক মতভেদও দেখা যায়। কেউ কেউ তাদের নিজস্ব রেসিপি শেয়ার করছেন।
তবে এমন নয় যে সবাই এই লাল শরবত পছন্দ করেন। এই পানীয়তে থাকা চিনির মাত্রা, রঙ এবং প্রিজারভেটিভের ব্যবহার নিয়ে সমালোচনাও আছে প্রচুর। কিছু ব্যবহারকারী বুঝতেই পারেন না, মানুষের এই শরবতের প্রতি এত গভীর আবেগ কেন।
তারা মনে করেন রূহ আফজার তুলনায় অন্যান্য অনেক ঘরোয়া পানীয় মানে অনেক ভালো ও স্বাস্থ্যকর।
দিল্লির গলি থেকে সারা বিশ্বে
প্রায় ১২০ বছর আগে, ব্রিটিশ শাসিত ভারতের রাজধানী দিল্লির লাল কুয়ান বাজারে এক গরমের দিনে একটি ক্লিনিক থেকে গোলাপের সুবাস আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
সেই সুবাসে আকৃষ্ট হয়ে মানুষের ভিড় জমাতে থাকে। তারা জানতে পারে এটি লাল রঙের এক বিশেষ ধরনের পানীয়র গন্ধ। সেদিন সন্ধ্যা নামার আগেই শেষ হয়ে যায় হাকিমের তৈরি প্রথম ব্যাচ। এই ছিল রূহ আফজার জন্ম। সাংবাদিক সানাম মেহেরের প্রতিবেদনে এমনটাই উঠে আসে।
ইতিহাস বিষয়ক ম্যগাজিন হেরিটেজ টাইমের তথ্য অনুযায়ী, রূহ আফজা তৈরি করেছিলেন হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ, একজন ইউনানি চিকিৎসক। পুরনো দিল্লিতে ছিল তার ক্লিনিক হামদর্দ দাওয়াখানা। 'হামদর্দ' শব্দটির অর্থই হলো দুঃখ-কষ্টের সময়ের সঙ্গী।
১৯০৭ সালের দিকে এই দাওয়াখানাতেই তিনি এই অ্যালকোহলমুক্ত ওষুধি পানীয়টি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেন।
ক্রমেই এর চাহিদা বাড়তে থাকে। দিল্লির বাইরে গাজিয়াবাদে একটি কারখানায় রূহ আফজা ব্যাপকভাবে উৎপাদন শুরু করা হয়।
শুরুতে তিনি শরবতটি তৈরি করেছিলেন রোগীদের সতেজ করতে, গরমের কারণে শরীরে হওয়া অসুস্থতা কিছুটা লাঘব করার জন্য।
শরবতের বিশেষ বৈশিষ্ট ছিলো এতে থাকা গোলাপের গন্ধ ও স্বাদ, যা বাজারের মানুষদের নজর কেড়ে নিয়েছিল। হাকিম পরে এই লাল শরবতের নাম দেন "রূহ আফজা"।
হেরিটেজ টাইমসের তথ্যমতে, এই নামের উৎস পণ্ডিত দয়া শঙ্কর নাসিমের কাব্যগ্রন্থ 'মসনবি গুলজার-ই-নাসিম', যেখানে রূহ আফজা নামে এক রাজকন্যার চরিত্র থেকে তিনি এই নাম রাখতে অনুপ্রাণিত হন।
End of বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন
১৯২০ সালের মধ্যে রূহ আফজা হাতে হাতে প্যাক করা হতো, লেবেলও হাতে সেঁটে দেওয়া হতো। দিল্লির শিল্পী মির্জা নূর আহমদ প্রথম এই কাঁচের বোতল ও ঐতিহ্যবাহী লেবেলের ডিজাইনটি করেছিলেন।
তবে মাত্র দুই বছর পর ১৯২২ সালে হাকিম মারা যান। তখন হামদর্দের দায়িত্ব আসে তার বড় ছেলে আবদুল হামিদের কাঁধে, যার বয়স তখন ছিলো মাত্র ১৪ বছর।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার পরে হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদের বড় ছেলে আবদুল হামিদ দিল্লিতে থেকে যান এবং ছোট ছেলে হাকিম মহম্মদ সৈয়দ পাকিস্তানে চলে যান।
দুই দেশে তৈরি হয় 'হমদর্দ ইন্ডিয়া' এবং 'হমদর্দ পাকিস্তান' নামে দু'টি সংস্থা। সেখান থেকে তারা রূহ আফজার উৎপাদন শুরু করেন।
পরে ১৯৫৩ এবং ১৯৫৬ সালে কোম্পানির সম্প্রসারণ হয়। ছোট ছেলে হাকিম মহম্মদ সৈয়দ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বিক্রয় কেন্দ্র খোলেন।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তান যখন বাংলাদেশ নামে নতুন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়, হামদর্দ পাকিস্তান তখন হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ) বাংলাদেশ হিসেবে কাজ শুরু করে।
এরপর ইউসূফ হারুণ ভুইঁয়া নামের এক ব্যক্তি বাংলাদেশের হামদর্দে যোগ দেন এবং রূহ আফজা প্রস্তুত ও বিক্রি শুরু করেন।
মূল রেসিপিটি কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়েছে এবং প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে।
ইতিহাসের স্বাক্ষী
একটি শরবত যে ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার রক্তক্ষয়ী অধ্যায় এবং অনেক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে টিকে আছে সেটি অনেকের কাছে একটি বিস্ময়।
এখন এই পানীয় পুরানো দিল্লির সরু গলি ছাড়িয়ে, উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে পশ্চিমা দেশেও পৌঁছে গিয়েছে।
রাহেল ফার্নান্দেজ নামের এক ব্যবহারকারী বিবিসি উর্দুকে বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভারতীয় দোকান থেকে পাকিস্তানি রূহ আফজা কিনেছেন।
সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় আফগান শরণার্থীদের কাছে ত্রাণ হিসেবে রূহ আফজা পাঠানো হয়েছিলো।
তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বিস্মিত হয়ে যান যে এসব শরণার্থী শিবিরে প্রতিদিন কেন এতো বোতলের দরকার হচ্ছে?
পরে তদন্তে দেখা যায়, আফগানরা রূহ আফজা সরাসরি পান করতেন। পানি বা দুধ মেশানো ছাড়াই।
রূহ আফজার প্রতি মানুষের ভালোবাসার প্রমাণ মিলেছিল ২০১৯ সালে। সে বছর ভারতের বাজারে রূহ আফজা হঠাৎ করে দুর্লভ হয়ে যায়। কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ভেষজ উপাদান সহজলভ্য না হওয়ায় বাজারে এই সংকট দেখা দেয়।
এই সংকটের জেরে টুইটারে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ভারতীয় ব্যবহারকারীরা পানীয়টি না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেন।
পাকিস্তানি ব্যবহারকারীরা তখন ভারতের এই 'সংকট' বুঝে রূহ আফজা উপহার দেওয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছিলেন।
রিচিকা তালওয়ার নামের একজন ব্যবহারকারী উল্লেখ করেছেন, রূহ আফজা সেই অসংখ্য জিনিসের একটি যা পাকিস্তান ও ভারতকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
রূহ আফজার বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ২০২২ সালে ভারতের দিল্লি হাই কোর্ট ই-কমার্স ওয়েবসাইট অ্যামাজন ইন্ডিয়াকে নির্দেশ দিয়েছে, পাকিস্তানে তৈরি রূহ আফজা ভারতের বিক্রির তালিকা থেকে সরাতে। তখন নকল রুহ আফজা বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল।
ভারতীয় প্রস্তুতকারকরা আদালতে অভিযোগ করেন, পাকিস্তানে তৈরি রূহ আফজা অবৈধভাবে ভারতে বিক্রি হচ্ছে। আদালত এরপর এই নির্দেশ দেয়।
বাংলাদেশে ২০১৮ সালে অননুমোদিত উপাদান দিয়ে খাদ্য তৈরি ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচারের দায়ে রুহ আফজাকে চার লাখ টাকা জরিমানা করে ঢাকার একটি বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত। সেখানে দোষ স্বীকার করে ক্ষমাও চেয়েছিল হামদর্দ কর্তৃপক্ষ। যদিও ওই রায়ের বিরুদ্ধে ১২০২ সালে আপিল করা হলে আগের রায় ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়া হয়।
এই লাল রঙের ঘন শরবত কতোটা সুস্বাদু বা আদৌ কতোটা স্বাস্থ্যকর সেই আলাপের বাইরে এটি শতাব্দীর ইতিহাসের স্বাক্ষী এবং রমজানের আচার-অনুষ্ঠানের প্রতীক হয়ে উঠেছে।