বাংলাদেশের ইলিশ নয়, পশ্চিমবঙ্গে পাতে পড়ছে গুজরাত ইলিশ

ইলিশ মাছের একটি রান্না করা পদ
ছবির ক্যাপশান, পদ্মার এই ইলিশ নয়, পশ্চিমবঙ্গের বাজারে ছেয়ে গেছে গুজরাতের ইলিশে
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা

ভারতের গুজরাত থেকে আসা ইলিশ মাছে এখন ছেয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের বাজার। গত মাস দেড়েকে প্রায় চার হাজার টন ওই ইলিশ এসেছে পশ্চিমবঙ্গে।

অন্যদিকে, দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রফতানির অনুরোধ জানিয়ে ঢাকায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে চিঠি পাঠানো হলেও তার কোনো জবাব এখনও কলকাতায় পৌঁছায় নি।

তবে গুজরাতের ওই ইলিশের স্বাদ ভাল নয় বলে মন্তব্য করছেন ইলিশ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ইলিশ-প্রেমী সকলেই। স্বাদ ভাল না হলেও সব মাছই বিক্রি হয়ে গেছে বলে জানাচ্ছেন কলকাতা লাগোয়া হাওড়ায় রাজ্যের সবথেকে বড় যে মাছের পাইকারি বাজার রয়েছে, সেখানকার ব্যবসায়ীরা।

একদিকে গুজরাতের ইলিশে যখন পশ্চিমবঙ্গের বাজার ছেয়ে গেছে, তখন স্থানীয় ইলিশের জোগান খুবই কম বলে জানাচ্ছেন মাছ ব্যবসায়ীরা।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
গুজরাত বা ভারুচ ইলিশ

ছবির উৎস, Vinod Jaisawal

ছবির ক্যাপশান, গুজরাত বা ভারুচ ইলিশ

গুজরাত থেকে কেন এত ইলিশ এল?

গুজরাতের ভারুচ অঞ্চল থেকে প্রতিবছরই ইলিশের চালান আসে পশ্চিমবঙ্গে। তবে এবার তা সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে।

গুজরাতের ভারুচ এলাকায় সমুদ্র থেকে আসা এই ইলিশ ধরা হয় নর্মদা আর তাপ্তী নদীগুলি থেকে, এমনটাই জানাচ্ছেন মাছ ব্যবসায়ীরা।

ওয়েস্টবেঙ্গল ফিশ ইম্পোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ বলছিলেন, "প্রতিবছরই গুজরাতের ইলিশ, যেটাকে ভারুচ ইলিশও বলা হয়, তা আমাদের মার্কেটে আসে। এর আগে প্রতিবছর গড়ে পাঁচশো থেকে সাতশো টন ভারুচ ইলিশ আসত। কিন্তু এবার সব রেকর্ড ভেঙ্গে গেছে। গত মাস দেড়েকের মধ্যে প্রায় চার হাজার টন গুজরাত ইলিশ এসেছে।"

হাওড়ায় মাছের সবথেকে বড় পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ী বিনোদ জয়সওয়াল জানাচ্ছিলেন, "গত দুটো অমাবস্যায় গুজরাতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়েছে। প্রায় দুশো ট্রাক মাছ এসেছে এখানে, প্রতি ট্রাকে ১৩-১৪ টন করে মাছ। খুবই সস্তা মাছ, তাই সবই বিক্রি হয়ে গেছে এখান থেকে।"

মি. জয়সওয়াল বলছিলেন যে, পাইকারি বাজারে ডিম সহ গুজরাত ইলিশ বিক্রি হয়েছে কিলো প্রতি তিনশো থেকে চারশো ভারতীয় টাকায়। আর ডিম ছাড়া মাছের দর থেকেছে সাতশো থেকে নয়শো ভারতীয় টাকার মধ্যে।

আবার উত্তর কলকাতার শোভাবাজারের খুচরো মাছ ব্যবসায়ী শম্ভু চরণ দাস জানাচ্ছেন, "আমি ওই মাছ তুলি নি, কারণ আমার যারা নিয়মিত খদ্দের, তাদের ওই মাছ আমি খাওয়াতে পারব না, বদনাম হয়ে যাবে। তবে এটা ঠিকই গুজরাতের ইলিশ বাজারে ছেয়ে গেছে। সবই মোটামুটি এক কিলো ওজনের মাছ। আমাদের বাজারে ওই ইলিশের দাম উঠেছে নয়শো থেকে ১২শো ভারতীয় টাকা পর্যন্ত।"

বাঁয়ে গুজরাত ইলিশ, ডানে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় ইলিশ, মাঝে পদ্মার ইলিশ

ছবির উৎস, BBC/Getty Images/ Vinod Jaisawal

ছবির ক্যাপশান, বাঁয়ে গুজরাত ইলিশ, ডানে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় ইলিশ, মাঝে পদ্মার ইলিশ

কেমন স্বাদ গুজরাত ইলিশের?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

"উত্তম কুমারের সঙ্গে কি আর এখনকার কোনো নায়কের তুলনা হয়? ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম – পদ্মার মোহময়ী ইলিশ কোথায় আর গুজরাতের ইলিশ কোথায়!" বলছিলেন কলকাতার সিনিয়র সাংবাদিক ও খাবার নিয়ে একাধিক বইয়ের লেখক সুরবেক বিশ্বাস।

তার ব্যাখ্যা, "পদ্মার ইলিশ হল কুলীন। আবার মেঘনার ইলিশও খুবই সুস্বাদু। ইলিশের মোহময়ী যেমন রূপ, তেমনই ভীষণ আকর্ষক তার গন্ধ। একেবারে নিজস্ব গন্ধ সেটা – যেভাবেই রান্না করুন না কেন, ওই গন্ধ পাওয়া যাবেই। আবার ভাল জাতের ইলিশের স্বাদ হয় মিষ্টি।

"ইলিশের ওই গন্ধটা গুজরাত বা ভারুচের ইলিশে পাওয়া যায় না। যদিও স্বাদটা কিছুটা পাওয়া যায়, তবে গন্ধ একেবারেই নেই। মিয়ানমারের ইরাবতীর যে ইলিশ আসে, সেটাও অনেকটা এই ভারুচ বা গুজরাত ইলিশের মতো," বলছিলেন মি. বিশ্বাস।

কিন্তু পদ্মা-মেঘনার ইলিশ একেবারেই না থাকা এবং পশ্চিমবঙ্গ বা ওড়িশার ইলিশের জোগান খুব কম হওয়ায় গুজরাতের ইলিশই এখন অনেক পশ্চিমবঙ্গ-বাসীর পাতে পড়ছে।

পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী নদীর মোহনার কাছে নিশ্চিন্দপুরে ভাল জাতের ইলিশ পাওয়া যায়। আর যে নদীতে স্থানীয় ইলিশ পাওয়া যেত, সেই রূপনারায়ণে এখন আর ইলিশ ওঠে না।

সুরবেক বিশ্বাস বলছিলেন, "নিশ্চিন্দপুর আর তার আশপাশের এলাকায় যে ইলিশ ওঠে, সেটার স্বাদ খুবই ভাল। বাংলাদেশের ইলিশ যখন পাওয়াই যাচ্ছে না, তখন এই স্থানীয় ইলিশটাই স্বাদে-গন্ধে সবথেকে ভাল। ওড়িশার বুড়ি বালাম নদীর মোহনা থেকে যে ইলিশ ওঠে, সেটাও খুব সুস্বাদু, আকারেও বড়।"

তবে ওড়িশার ইলিশের জোগান এবছর কমই রয়েছে বলে জানাচ্ছেন মাছ ব্যবসায়ীরা।

অন্যদিকে স্থানীয় বাজারগুলোতে যে ইলিশ আসছে, তার একটা বড় অংশই হচ্ছে 'খোকা ইলিশ'।

হাওড়া পাইকারি মাছ বাজারের ব্যবসায়ী বিনোদ জয়সওয়াল বলছিলেন, "মৎস্য দফতর থেকে এসে খোকা ইলিশ বিক্রি না করতে নির্দেশ দিয়ে গেছে। আমরাও আগে থেকেই জানি যে খোকা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ। কিন্তু ডায়মন্ড হারবার বা রায়দীঘীর মাছের আড়ৎগুলো থেকে প্রচুর খোকা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। সব দেড়শো দুশো গ্রামের ছোট ইলিশ আসছে। প্রশাসনের কোনো নজর নেই। এতে যে মাছের জাতটাই পুরো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সেটা কে বোঝাবে!"

কলকাতার একটি মাছের বাজারে পদ্মার ইলিশ কিনছেন ক্রেতারা - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Shib Shankar Chatterjee / BBC

ছবির ক্যাপশান, কলকাতার বাজারে কি এবার পদ্মার ইলিশ আসবে? - ফাইল ছবি

বাংলাদেশের ইলিশ কি আসবে ভারতে?

দুর্গাপুজোর আগে প্রতিবছরই বাংলাদেশ থেকে পদ্মার ইলিশ আমদানি করেন পশ্চিমবঙ্গের মাছ ব্যবসায়ীরা। পুজোর সময়ে ইলিশ খাওয়ার একটা চল রয়েছে ভারতের বাঙালীদের মধ্যে, যদিও এর সঙ্গে ধর্মীয় কোনো রীতি জড়িত নয়।

বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানির জন্য প্রতিবছরই চিঠি যায় ঢাকায়, এবারও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে সেই চিঠি পাঠিয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিশ ইম্পোটার্স অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনটির সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ বলছিলেন, "আমরা জুলাই মাসের ২৯ তারিখ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মি. তৌহিদ হোসেনকে চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করেছি যাতে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের ইলিশ পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়। তবে এখনও তার কোনো জবাব আসে নি। আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যে কিছু একটা খবর পাওয়া যাবে।"

ওই চিঠিতে লেখা হয়েছে যে গত বছর ২৪২০ মেট্রিক টন ইলিশ বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানির অনুমতি দেওয়ার জন্য "এপার বাংলার মানুষ আপনার কাছে গভীর ভাবে কৃতজ্ঞ।"

গত বছর ২৪২০ টন ইলিশ বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানির অনুমোদন দেওয়া হলেও আসলে এসে পৌঁছিয়েছিল মাত্র ৫৭৭ মেট্রিক টন মাছ। তার আগের বছরগুলিতেও যত পরিমাণ রফতানির অনুমোদন দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার, তার অর্ধেক বা আর কম পরিমাণ মাছ আসলে এসেছিল ভারতে।

যেমন ২০২৩ সালে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ৩৯৫০ টনের, এসেছিল ৫৮৭ টন, ২০২২ সালে ২৯০০ টনের অনুমোদন থাকলেও বাংলাদেশের রফতানিকারকরা পাঠাতে পেরেছিলেন ১৩০০ টন মাছ।

"বাংলাদেশের সরকার ইলিশ রফতানির যে অনুমতি দেয়, সেটার একটা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। মাত্র এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ মাছ আনা অসম্ভব। শুধু ২০১৯ আর ২০২০ সালে যে পরিমাণ মাছ আনার অনুমোদন পাওয়া গিয়েছিল, তার পুরো চালানটাই আমরা তুলতে পেরেছিলাম। তাই এবার আমরা অনুরোধ করেছি যাতে ওই সময়সীমা বেঁধে না দেওয়া হয়," বলছিলেন মি. মাকসুদ।

তার কথায়, সময়সীমা বেঁধে না দেওয়া হলে বাংলাদেশের রফতানিকারকরাই লাভবান হবেন, আর ভারতের বাঙালীদের পাতে সবসময়েই পদ্মা-মেঘনার মোহময়ী ইলিশ পড়তে পারবে।