ভারতীয় পাইলট অভিনন্দন ভর্তমানকে আটককারী পাকিস্তানি মেজর নিহত

মেজর সৈয়দ মোইজ আব্বাস শাহ

ছবির উৎস, ISPR

ছবির ক্যাপশান, ওয়াজিরিস্তানে এক অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মেজর সৈয়দ মোইজ আব্বাস শাহ, সেই সময় গুলিবিনিময়ে তার মৃত্যু হয়
    • Author, ফারহাত জাভেদ
    • Role, বিবিসি উর্দু, ইসলামাবাদ

পাকিস্তানের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান জেলার সারারোগা এলাকায় এক সামরিক অভিযান চালানোর সময় দেশটির সেনাবাহিনীর মেজর সৈয়দ মোইজ আব্বাস শাহের মৃত্যু হয়েছে। তিনি সেই পাকিস্তানি অফিসার, যিনি ২০১৯ সালে বালাকোট এয়ার স্ট্রাইকের সময় ভারতীয় বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার অভিনন্দন ভর্তমানকে আটক করেন বলে দাবি করেছিলেন।

আভিনন্দন ভার্থামানের মিগ-২১ জেট বিমানকে, ২০১৯ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গুলি করে ভূপাতিত করেছিল।

রাওয়ালপিন্ডিতে মেজর সৈয়দ মোইজ আব্বাস শাহের জানাজার নামাজ পড়া হয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইন্টার সার্ভিস পাবলিক রিলেশন্স (আইএসপিআর) বা আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও রাওয়ালপিন্ডিতে তার জানাজার নামাজের সময় উপস্থিত ছিলেন।

ওই সময় ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মেজর শাহের প্রশংসা করেন। আইএসপিআর-এর তথ্য অনুযায়ী আসিম মুনির বলেন, সৈয়দ মোইজ আব্বাস শাহ সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন এবং "বীরত্ব, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি কর্তব্য পালন করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।"

জানাজার নামাজ শেষ হওয়ার পর মি. শাহের মরদেহ তার বাড়িতে পাঠানো হয়। সেখানে তাকে দাফন করা হবে। পরিবারে তার স্ত্রী এবং দুই ছেলে আছেন।

আইএসপিআর জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের সারারোগা এলাকায় অভিযান চালায় সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী। ওই অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মেজর শাহ।

সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিযানের সময় নিরাপত্তা বাহিনী "সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এই অভিযানে ১১ সন্ত্রাসীর মৃত্যু হয়েছে এবং সাতজন আহত হয়েছে।"

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের তরফে জানানো হয়েছে, অভিযানের সময় দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গুলি বিনিময় হয়েছিল। সেই সময় মেজর মোইজ আব্বাস শাহ ও ল্যান্স নায়েক জিবরানুল্লাহ'র মৃত্যু হয়।

আরও পড়তে পারেন
অভিনন্দন ভর্তমানের বিমানকে পাকিস্তানে ভূপাতিত করা হয়েছিল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অভিনন্দন ভর্তমানের বিমানকে পাকিস্তানে ভূপাতিত করা হয়েছিল

সৈয়দ মোইজ কে ছিলেন?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

পাকিস্তানের চকওয়ালের বাসিন্দা ছিলেন বছর ৩৭-এর সৈয়দ মোইজ আব্বাস শাহ। তিনি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ২০১১ সালে।

সে দেশের কর্মকর্তাদের মতে, তার কমিশনড ইউনিট ছিল সেভেন এনএলআই। পরে তিনি পাকিস্তানের স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপে (এসএসজি) যোগ দেন। বর্তমানে ওয়াজিরিস্তানে কর্মরত ছিলেন সৈয়দ মোইজ আব্বাস শাহ।

তার নাম খবরের শিরোনামে উঠে আসে বছর ছয়েক আগে, ২০১৯ সালে। সেই সময় ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধের একেবারে দ্বারপ্রান্তে ছিল। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার আবহে বালাকোট এয়ার স্ট্রাইকের সময় ভারতীয় বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার অভিনন্দন ভর্তমানকে পাকিস্তানে আটক করা হয়েছিল।

ওই বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি একটা ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। যেখানে ভর্তমানকে পাকিস্তানে আটক অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। ওই ভিডিওতে মি. শাহকেও দেখা যায়।

সৈয়দ মোইজ আব্বাস শাহসহ অন্যান্য পাকিস্তানি সেনার আরও কয়েকজন জওয়ান মিলে নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে এক এলাকায় ভারতীয় পাইলট অভিনন্দন ভর্তমানকে গ্রেফতার করতে গিয়েছিলেন।

উইং কমান্ডার ভর্তমানের বিমান পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ভূপাতিত করার পর ওই অঞ্চলে প্যারাসুটের সাহায্যে অবতরণ করেন তিনি।

এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের বাসিন্দা মহম্মদ রাজ্জাক চৌধুরী। তিনি বিমানকে দুর্ঘটনাগ্রস্ত অবস্থায় দেখেন এবং প্যারাসুটের সাহায্যে ভারতীয় পাইলট যে অবতরণ করেছেন, তা-ও লক্ষ্য করেন।

সেই সময় ঘটনার বিষয়ে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। জানিয়েছিলেন, অন্যান্য গ্রামবাসীদের সঙ্গে তিনি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন সেখানে জড়ো হওয়া জনতা "ভারতীয় পাইলটকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ছিল। যুদ্ধবিমানের পাইলট আভিনন্দন ভার্থামান তাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে অন্যত্র যাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন"।

মি. চৌধুরী জানান, উইং কমান্ডার অভিনন্দন ভর্তমান কোনোমতে সেখান থেকে বেরিয়ে কাছাকাছি একটা ড্রেনের কাছে পৌঁছান। কিন্তু "স্থানীয় লোকজন তখনো তাকে ঘিরে রেখেছিল।"

সেই সময় ক্যাপ্টেন সৈয়দ মইজের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেখানে পৌঁছায় এবং তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।

মোহাম্মদ রাজ্জাক চৌধুরী জানিয়েছিলেন উপস্থিত জনতাদের মধ্যে কেউ কেউ মি. ভর্তমানকে মারধরও করেছিলেন।

সেই সময় রেকর্ড করা একটা ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। ওই ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, উইং কমান্ডার অভিনন্দন ভর্তমান আহত, তার মুখে রক্ত লেগে রয়েছে। পাশাপাশি দেখা যায় পাকিস্তানি সেনা তাকে ভিড়ের মধ্যে থেকে বের করে আনছে।

২০২০ সালে, হামিদ মীরকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়

ছবির উৎস, Hamid Mir/X

ছবির ক্যাপশান, ২০২০ সালে, হামিদ মীরকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়
আরও পড়তে পারেন

মি. শাহ যে বিবরণ দিয়েছিলেন

এই ঘটনার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সৈয়দ মোইজ আব্বাস শাহ পাকিস্তানি নিউজ চ্যানেল জিও নিউজ-এ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সেই সময় উপস্থাপক হামিদ মীরকে জানিয়েছিলেন, তিনি যখন অভিনন্দন ভর্তমানের কাছে পৌঁছান, তখন স্থানীয় লোকজন তাকে ঘিরে ধরে।

সেই সাক্ষাৎকারের ভিডিও আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ঘোরা ফেরা করছে। ওই ভিডিওতে মেজর সৈয়দ মোইজ আব্বাস শাহকে বলতে শোনা যায়, "এটা একটা কঠিন জায়গা। এই ধরনের অভিযান সবসময় একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাঁধা থাকে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাইলটকে গ্রেপ্তার করতে হয়েছিল। তাকে জীবিত অবস্থায় গ্রেপ্তার করাটাই আমাদের কাছে সেই সময় অগ্রাধিকার ছিল।"

সাক্ষাৎকারের সময় মি. শাহ উল্লেখ করেছিলেন তিনি যখন উইং কমান্ডার অভিনন্দন ভর্তমানের কাছাকাছি পৌঁছান, সেই সময় তখন তাকে "বেসামরিক লোকজন তার ওপর চড়াও হয়েছিল।"

সেই সময় সৈয়দ মইজ আব্বাস শাহ ক্যাপ্টেন পদে ছিলেন। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মি. শাহকে বলতে শোনা গিয়েছিল, "আমি ওর (অভিনন্দন ভর্তমানের) কাছে পৌঁছানো মাত্রই উনি আমার পদমর্যাদা দেখে বলে ওঠেন- ক্যাপ্টেন, আমি ভারতীয় বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার অভিনন্দন ভর্তমান। আমি আত্মসমর্পণ করছি, দয়া করে আমাকে রক্ষা করুন।"

"এই পরিস্থিতিতে এটা দেখা (অভিনন্দন ভর্তমানের সুরক্ষার দায়িত্ব) আমার দায়িত্ব ছিল। কারণ ততক্ষণে তিনি আত্মসমর্পণ করে ফেলেছেন।"

প্রসঙ্গত, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় অভিনন্দন ভর্তমানের একটা ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই সময় তাকে প্রশ্ন করা হলে, তিনি নিজের নাম এবং পদমর্যাদা উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন তার সঙ্গে পাকিস্তানে ভালো আচরণ করা হয়েছে।

তাকে বলতে শোনা গিয়েছিল, "পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার দেখাশোনা করেছে। প্রথমে একজন ক্যাপ্টেন আমাকে জনতা ও সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন।"

এরপর পহেলা মার্চ তাকে মুক্ত করা হয়। ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে তাকে ভারতে ফেরত পাঠিয়েছিল পাকিস্তান।