ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর কান্নাভেজা চোখে মাঠ ছাড়া কি 'পথের শেষ'?

    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আরও একবার ভঙ্গ হলো, খুব অলৌকিক কিছু না হলে চিরতরের জন্যই হলো।

তবে এবার প্রশ্ন উঠেছে এটা তার ক্যারিয়ারেরই শেষ?

রোনালদোর জন্য সময়টা ছিল টালমাটাল, ‘বিস্ফোরক’ এক সাক্ষাৎকারে প্রথমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে সর্ম্পক নষ্ট হয় রোনালদোর।

এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে নানা ঘটনায় কোচ ফার্নান্দো সান্তোসের সাথে মতবিরোধে জড়িয়ে রোনালদো প্রথমে বসেছিলেন বেঞ্চে।

এবার পর্তুগাল বাদ পড়ার পর রোনালদোর ক্যারিয়ারের এমন একটা মুহূর্ত সামনে এসে দাঁড়ালো যেখানে তিনি নিজে কিছু না বললেও, সমর্থকরা, প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকরা, রোনালদোর ভক্তদের অনেকে মনে করছেন, ‘এটা পথের শেষ’।

রোনালদোর বয়স এখন ৩৭, সামনের ফেব্রুয়ারিতে ৩৮ হবে।

বৈশ্বিক এই সুপারস্টারের নামের পাশে বিশ্বকাপের কোনও মেডেল থাকবে না এটা একরকম নিশ্চিত, বিশ্বকাপে মাঠে নামার আগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে রোনালদোর সাথে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।

এখন তার কোনও ক্লাব নেই।

লোকে ইতোমধ্যে ক্লাব ফুটবলে তার শেষ দেখছেন।

বিবিসি স্পোর্টের ক্রিস বেভান গতরাতে আল থুমামা স্টেডিয়ামে ছিলেন। দোহা থেকে তিনি লিখেছেন, “পর্তুগিজেরা তাকে ভালোবাসেন, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চান।”

বিশ্বকাপে রোনালদোর শুরুটা কিন্তু একেবারে খারাপ ছিল না। একটি বিতর্কিত পেনাল্টি জিতে নেন তিনি, সেখান থেকে গোল করেন, ঘানার বিপক্ষে তার দল ৩-২ গোলের জয় পায়।

ঘানার বিপক্ষে জয়ের পরে রোনালদোর পরিস্থিতি অবনতি হওয়া শুরু করে, পরের দুই ম্যাচে তিনি গোল পাননি।

পর্তুগালের কোচ ফার্নোন্দো সান্তোস দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে রোনালদোকে বদলি করার পর রোনালদো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান।

রোনালদোর এই আচরণ পছন্দ হয়নি কোচের।

তা তিনি সরাসরিই প্রকাশ করেন সংবাদ সম্মেলনে।

তারপর রোনালদো আর শুরুর একাদশে সুযোগ পাননি।

গত ১৪ বছরে এবারই প্রথম রোনালদো কোনও বড় টুর্নামেন্টে পর্তুগালের শুরুর একাদশে ছিলেন না, তার জায়গায় সুযোগ পেয়ে গনসালো রামোস হ্যাটট্রিক করে বসেন।

হুট করেই ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা হয়ে গেলেন কেবলই একজন বদলি ফুটবলার।

মরক্কোর বিপক্ষেও তিনি ছিলেন বেঞ্চে, দ্বিতীয়ার্ধে ৫১ মিনিটের দিকে রোনালদো মাঠে নামেন।

কিন্তু রোনালদো যে কারণে বিখ্যাত, যে কারণে তাকে সেরাদের একজন মনে করা হয় সেই রোনালদোকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

প্রায় ৫০ মিনিট মাঠে ছিলেন রোনালদো, এর মধ্যে মাত্র ১০বার তিনি বল পেয়েছেন।

মাঠে নামার ৪০ মিনিটের মাথায় তিনি প্রথমবার কোনও শট গোলে নেন।

বছরের পর বছর যেসব বিশেষ মুহূর্ত উপহার দিয়ে এসেছিলেন রোনালদো, পর্তুগালের হয়ে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে, রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে, সেই রোনালদোকে মনে হয়েছে- অতীত।

রোনালদো এখনও ফিফার আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক।

মোট ১১৮ গোলের মালিক রোনালদো, এই তালিকায় আর নতুন গোল যোগ করতে পারলেন না।

তার দল পর্তুগালও বিদায় নিলো।

ক্ষুধা ছিল, প্রাপ্তি মেলেনি

মরক্কোর গোলকিপার ইয়াসিন বুনো টুর্নামেন্টেরই সেরা গোলকিপারদের একজন।

রোনালদো তার কোনও কঠিন পরীক্ষা নিতে পারেননি।

যেসব হেডে রোনালদো গোল করতে ভালোবাসেন, তিনি এমন সুযোগও পেয়েছিলেন। সাতানব্বইতম মিনিটে রোনালদোর মাথার ওপর দিয়ে বল চলে যায়, সতীর্থ পেপের মাথায় বল লেগে গোলবারের পাশ ঘেঁষে চলে যায় বল।

রোনালদো হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন, মনে হচ্ছিল তিনি ততক্ষণে বুঝে গেছেন, সময় ফুরিয়ে গেছে।

শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে রোনালদো প্রতিপক্ষ দুই ফুটবলারের সাথে হাত মেলান।

সোজা মাঠ ছাড়ার জন্য হাঁটা দেন। সাথে একজন ক্যামেরাম্যান। যিনি হয়তো এই মহাতারকার বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষ কিছু মুহূর্ত ধরে রাখছিলেন।

একজন ভক্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী ডিঙ্গিয়ে রোনালদো পর্যন্ত আসার চেষ্টা করেছিলেন, পারেননি।

রোনালদো টানেলের কাছে যাওয়ার পর আর বাঁধ মানেনি দুই চোখ, এটাই এই বিশ্বকাপে রোনালদোর হাইলাইটস হয়ে রইলো।

রোনালদো মাঠ ছেড়ে বেরোলেন কাঁদতে কাঁদতে।

কোচ ম্যাচ শেষে বলেন, “রোনালদোর সাথে যা হয়েছে তা ম্যাচে কোনও প্রভাব ফেলেনি। আমরা একটি একতাবদ্ধ দল।”

“আমি যদি বলি এই ম্যাচ এই ফলাফলের কারণে কোন দুজন বেশি কষ্ট পেয়েছে, সেটা রোনালদো এবং আমি।”

রোনালদোকে ছাড়াই পর্তুগাল ভালো?

রোনালদোকে বেঞ্চে রেখেই পর্তুগাল ভালো দল কি না এই আলোচনাও হয়েছে অনেক।

নতুন ফুটবলার, তরুণ পা যুগল দিয়ে হ্যাটট্রিক করে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ৬-১ গোলের জয় ছিনিয়ে আনার পর রোনালদোর শুরুর একাদশে আবারও সুযোগ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সেটা নিয়ে ভক্তরা বিচলিত নন।

কাতারের আল থুমামা স্টেডিয়ামে বিবিসি রিপোর্টার দেখেছেন, হাজারো রোনালদোকে যারা সাত নম্বর জার্সি পরেই মাঠে খেলা দেখতে এসেছেন।

তাদের সবাই পর্তুগালের বা পর্তুগিজ নন, অনেকে কেবল ও শুধুমাত্র রোনালদোর নামের কারণে পর্তুগালের খেলা দেখেন।

গত ২ সপ্তাহে রোনালদোর সাথে কী হয়েছে, কেন হয়েছে তা এই সমর্থকদের ভাবায়নি, তারা কেবল রোনালদোকে ভালোবাসেন।

রোনালদোর বোন কাটিয়া অ্যাভেইরো ইন্সটাগ্রামে একটি পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, "রোনালদো একটি সাম্রাজ্য তৈরি করে দিয়ে গেছেন। আমি তার শক্তির কথা বলবো, তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং পূরণ করেছেন। আমি তার চরিত্রের কথা বলবো, যিনি কখনো হার মানেননি।”

বিবিসি স্পোর্টের রিপোর্টার ক্রিস বেভান লিখেছেন, এই সিনেমার শেষ কোথায় হবে আমি জানি না। কিন্তু হতে পারে আরও একটা বিশ্বকাপ খেলা রোনালদো আরও ভালো উপসংহার টানতে পারবেন।

তখন রোনালদোর বয়স হবে ৪১, তার আগে তিনি একটা ইউরো পাবেন ২০২৪ সালে।

এর মধ্যে রোনালদোর ক্লাব খুঁজতে হবে, যেখানে খেলে তিনি নিজেকে প্রমাণ করবেন।

তার প্রস্তাব আসছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যেখানে খেলা মানে ক্যারিয়ারের ইতি একরকম মেনে নেয়া, সে যত ডলারই তিনি পান না কেনো।

কিন্তু রোনালদো আরও একবার প্রমাণ করতে চাইবেন, কেন তার জন্য সাত নম্বর জার্সি বিখ্যাত হয়ে উঠলো বিশ্বজুড়ে।