আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছে আরও শতাধিক, রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ
মিয়ানমারে জান্তা সরকারের সেনা সদস্যদের সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর চলমান সংঘর্ষে মঙ্গলবার সকাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশটির আরও ১১৪ জন বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।
ঘটনাস্থল থেকে বিবিসির সংবাদদাতা জানিয়েছেন, এরমধ্যে ১১০ জন দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ-বিজিপি’র সদস্য। এ পর্যন্ত দুই শতাধিক বিজিপি সদস্য পালিয়ে বাংলাদেশে আসল।
মিয়ানমার -বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে ঢেঁকিবুনিয়া এলাকায় আরাকান আর্মিসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সেনাবাহিনীর লড়াই বেড়ে যাওয়ার পর প্রাণ বাঁচাতে সেদেশের বিজিপি সদস্য, সেনা সদস্য, শুল্ক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তারা পালিয়ে বাংলাদেশে আসছেন।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এসব তথ্য সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন।
কক্সবাজার উখিয়ার রহমতের বিল এলাকা বিবিসির সংবাদদাতা মুকিমুল আহসান জানাচ্ছেন, বাংলাদেশ সীমান্তে আসার পর পরই বিজিবি প্রথমে তাদেরকে নিরস্ত্র করে। এরপর নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যায়।
বর্তমানে মিয়ানমার থেকে আসা বিজিপি সদস্যসহ অন্যদের উখিয়া সীমান্তের একটি স্কুল রহমতের বিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয়ে রাখা হয়েছে।
এদিকে এসব ঘটনার কারণে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে বাংলাদেশর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে বিজিপি ও অন্য মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে দেশটির সামরিক জান্তা।
এরপর আরাকান আর্মিসহ কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় জান্তার অনুগত সেনাদের পরাজয়ের খবর আসতে থাকে। সেনাবাহিনীর ঘাঁটি ও নিয়ন্ত্রিত এলাকাও দখলে নিতে শুরু করে বিদ্রোহীরা।
তিন দিনে আশ্রয়ে দুই শতাধিক
গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্ত এবং কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের ভেতরে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মি মধ্যে গোলাগুলি ও সংঘাত-সংঘর্ষ চলছে।
বিদ্রোহীদের তীব্র হামলার মুখে গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে দফায় দফায় প্রবেশ করতে শুরু করেন বিজিপি সদস্যরা।
গত তিন দিনে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যসহ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন মোট ২৬৪ জন। তার মধ্যে দুইশ জনের বেশি বিজিপি সদস্য। এছাড়া বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তারা রয়েছেন।
বিবিসি বাংলাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিজিবি রামুর সেক্টর কমান্ডার মেহেদি হাসান।
আশ্রয় নেয়াদের মধ্যে মিয়ানমারের বিজিপি সদস্য, সেনা সদস্য, কাস্টমস কর্মকর্তাসহ সাধারণ মিয়ানমার নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে কাজ করছে বিজিবি।
পালিয়ে আসা বিজিপি সদস্যদের অস্ত্র ও গুলি জমা রাখার কথাও বিজিবি নিশ্চিত করেছে।
যাদেরকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে দুজন নারী ও শিশু রয়েছেন বলে বিবিসির সংবাদদাতা জানতে পেরেছেন।
স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোয় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার ভেতর থেকে ব্যাপক গোলাগুলি ও মর্টার শেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এখনও বেতিবুনিয়া সীমান্তের ওপার থেকে কিছুক্ষণ পর পর থেমে থেমে এমন ভয়াবহ শব্দ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলোয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন তারা আতঙ্কে গত তিন রাত ঘুমাতে পারেননি।
এরিমধ্যে অনেকে গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছেন। বিশেষ করে রাতে কেউ থাকতে পারছেন না পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত অবনতি হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন।
এদিকে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি স্থানীয়দের নিরাপদে থাকতে বললেও বেশিরভাগই তাদের সেই নির্দেশনা মানছেন না।
স্থানীয়দের অনেকেই স্কুল প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন। ইচ্ছামতো চলাফেরা করছেন।
এমনকি, মঙ্গলবার সকালে যখন বিজিপি সদস্যরা সীমানা পাড়ি দিয়ে আসে তখন প্রথমে তাদের উদ্ধার করেন এই স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বিবিসি বাংলার সংবাদদাতাকে জানিয়েছেন, তারা সীমান্তের শূন্য রেখায় তিনজনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন।
কিন্তু সীমান্ত রেখায় হওয়ায় কেউ তাদের দেখতে বা আনতে যেতে পারছে না। মরদেহগুলো কাদের সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আহতদের চিকিৎসা
আশ্রয় নেয়া বিজিপি সদস্যের মধ্যে নতুন করে আরও সাত জন আহত হয়েছেন। এর আগে সংঘর্ষে ১৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
আহতদের মধ্যে পাঁচ জনকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আরও চার জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
রাষ্ট্রদূতকে তলব ও প্রতিবাদ
এদিকে বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার জলপাইতলী সীমান্তে সোমবার দুপুরে মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টারশেলের আঘাতে বাংলাদেশি এক নারীসহ দুজন নিহত হন।
এজন্য মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়েকে তলব করে প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক মিয়া মুহাম্মদ মাইনুল কবির মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে এক প্রতিবাদ-লিপি পেশ করেন।
সীমান্তে চলমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব সীমানায় গোলা নিক্ষেপের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের কাছে। বাংলাদেশে মিয়ানমারের গোলাবারুদ এসে পড়ার ঘটনা দুঃখজনক বলে বলেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ তার দফতরে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পালিয়ে আসা বিজিপি সদস্যসহ অন্যান্যদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে
তিনি বলেন, "মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ আছে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারা তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। তাদের সীমান্তরক্ষীদেরও ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।"
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সোমবার জাতীয় সংসদে বলেছেন, মিয়ানমার সীমান্তের পরিস্থিতি খুবই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। একইসঙ্গে সীমান্তে সশস্ত্র বাহিনীকে ধৈর্য ধরতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে তীব্র সংঘর্ষের মধ্যে সেখানে চাকমা সম্প্রদায়ের প্রায় চারশো জন এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু লোক জড়ো হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান।
এ অবস্থায় ওই চাকমা-রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা করা হচ্ছে।