আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
তামিম ইকবাল, বিসিবি ও কোয়াব- ত্রিমুখী সংকটের নেপথ্যের রাজনীতি ও পুঞ্জিভূত ক্ষোভ
বাংলাদেশের ক্রিকেট এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে যেখানে স্বভাবতই তিনটি পথ তিন দিকে চলে গেছে।
একদিকে মোস্তাফিজের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ যাত্রায় বাঁধা, একদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অন্যদিকে সমর্থকদের মধ্যে দুটি পক্ষ- এক পক্ষ কিছুতেই মানছেন না ক্রিকেটাররা নিজেদের ইচ্ছায় বিপিএল বয়কট করতে পারেন, অপর পক্ষ বলছেন ক্রিকেটাররাই ক্রিকেটের প্রাণ, তাদের আঁতে ঘা দিয়ে ক্রিকেট এগোনো যাবে না।
এই ত্রিমুখী টানাপোড়েনের মাঝেই বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন নিজের পরিচয় খুঁজছে। মাঠের বাইরের সিদ্ধান্ত, দ্বন্দ্ব আর অনিশ্চয়তা যেন মাঠের ভেতরের খেলাটাকেই গ্রাস করে ফেলছিল প্রায়।
ভারতে উগ্রবাদীদের আক্রমণের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক বোর্ডের নির্দেশে প্রথমে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে ফিরিয়ে নিলো কলকাতা নাইট রাইডার্স।
এরপর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও সরকার থেকে জানানো হলও যেহেতু মোস্তাফিজের জন্য নিরাপদ না ভারত, তাই গোটা দলের জন্যই অনিরাপদ হওয়ার কথা।
ঘটনার শুরু তামিম ইকবালের মন্তব্য থেকে
ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তামিম ইকবাল বলেন, প্রসঙ্গ যখন বিশ্বকাপ তখন এমন সিদ্ধান্ত নিতে হলে আবেগ নয়, ভবিষ্যৎকে সামনে রেখেই ভাবতে হয়। পরিস্থিতি জটিল এবং অনেক কিছুই একসঙ্গে ঘটছে বলে এই মুহূর্তে সরাসরি মন্তব্য করা কঠিন, তবে তিনি মনে করেন পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই বহু সমস্যার সমাধান সম্ভব।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান কী এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের ক্রিকেট কোন পথে যেতে পারে, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন।
তিনি আরও বলেন, বিসিবিকে তিনি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখেন। সরকার এই কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও বোর্ডের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকা উচিত।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বোর্ড যদি মনে করে কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য সঠিক, তাহলে সেটি নেওয়ার অধিকার তাদেরই থাকা উচিত।
তামিম দর্শকদের আবেগী প্রতিক্রিয়ার বাইরে এসে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও জোর দেন।
তার মতে, আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে এত বড় একটি সংস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বরং আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তার প্রভাব আগামী এক দশকে বাংলাদেশের ক্রিকেট ও খেলোয়াড়দের ওপর কীভাবে পড়বে, সেটি ভেবেই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
এই প্রেক্ষাপটে তামিম বলেছিলেন, আইসিসি থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড প্রায় ৯০-৯৫% আয় করে।
এই মন্তব্যের পক্ষে ও বিপক্ষে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা হয় তখন। সমর্থকদের এক পক্ষ বলেন, তামিম জাতীয় আবেগকে পাত্তা দিচ্ছেন না, আরেক পক্ষ বলেন তামিম ইকবালের বক্তব্য যৌক্তিক, সরকার ও বিসিবির উচিৎ বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নেয়া।
তবে সাংবাদিক ও ক্রিকেট পরিসংখ্যানবিদ রিফাত এমিল মনে করেন, তামিম ইকবাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনে দাঁড়ানোর পর থেকে একটা 'সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ' থেকে মতামত দিচ্ছেন।
যেমন ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলায় অপারগতা জানিয়ে বোর্ডের অবস্থান নিয়ে তামিমের বক্তব্যকে সাধারণ মতামত হিসেবে দেখতে নারাজ তিনি। রিফাত এমিলের মতে তামিম এর আগে এই বোর্ডকে 'অবৈধ বোর্ড' আখ্যা দিয়েছিলেন।
আর যেহেতু তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে বোর্ড প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়েও ছিলেন তাই তার বক্তব্যকে 'একান্ত ব্যক্তিগত মতামত' হিসেবে নেয়ার পক্ষে নন অনেকেই।
রিফাত এমিল বলেন, আইসিসি থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৩ শতাংশ আয় করেছিল, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে আয় করেছিল ৬১%। অর্থাৎ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড গড়ে প্রতি বছর ৪০-৫০ শতাংশ আয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল থেকে করে।
আইসিসির থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পাওয়া অর্থের একটা বড় অংশ নির্ভর করে আইসিসি ইভেন্ট ও ম্যাচ ফি থেকে।
'ভারতীয় এজেন্ট' মন্তব্য ঝড় তুললো
তামিম ইকবালের বক্তব্যের পরেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এক পরিচালক নাজমুল ইসলামের ব্যক্তিগত ফেসবুক একাউন্টে দেয়া এক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে নিউজফিডে, যেখানে তিনি তামিম ইকবালকে ইঙ্গিত করে 'ভারতীয় এজেন্ট' লিখেছেন।
স্ট্যাটাসটি ছিল এমন- "এইবার আরো একজন পরিক্ষিত ভারতীয় এজেন্ট এর আত্মপ্রকাশ বাংলার জনগণ দুচোখ ভরে দেখলো।"
এটাই নাজমুল ইসলামের একমাত্র স্ট্যাটাস ছিল না, অন্য এক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন -'মোস্তাফিজ ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন ভারতে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে, মাননীয় ক্রীড়া উপদেষ্টা বিষয়টা আন্দাজ করতে পেরে আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচসমূহ ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরে বিসিবিকে আইসিসির সঙ্গে আলোচনা করতে বলেছেন। মাননীয় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা পর্যন্ত সমর্থন করেছেন ক্রীড়া উপদেষ্টার সিদ্ধান্তকে। এমন এক পরিস্থিতিতে দেশের জনগণের সেন্টিমেন্টের বাইরে গিয়ে ভারতীয়দের হয়ে ব্যাট করেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের জার্সিতে ১৫ হাজার রান করা এক লিজেন্ডারি ক্রিকেটার।'
এই স্ট্যাটাসগুলো যদিও শুরুতে ছিল প্রাইভেট প্রোফাইলে ফ্রেন্ডস প্রাইভেসি দেয়া, তবে এটার স্ক্রিনশট ভাইরাল হতেই একের পর এক ক্রিকেটার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তামিম ইকবালের পক্ষে দাঁড়ান।
তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ, মমিনুল হকের মতো সিনিয়র ক্রিকেটাররা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বোর্ড ডিরেক্টরের এমন বক্তব্যকে 'রুচিহীন' ও 'অগ্রহণযোগ্য' ঘোষণা দেন।
যদিও এর আগে বোর্ড পরিচালক হিসেবে নাজমুল ইসলাম সুপরিচিত ছিলেন না, আলোচনায় আসার পর তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়া শুরু করেন।
তখনই বাঁধে বিপত্তি, তার প্রতি এক প্রশ্ন ছিল শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে না খেলতে পারলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ক্রিকেটাররা যে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন, বিসিবি থেকে কোনও ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে কি না।
এই প্রশ্নের উত্তরে নাজমুল ইসলাম বলেন, "ওরা খেলতে গিয়ে কিছুই না করতে পারলে আমরা যে এত কোটি টাকা খরচ করছি, আমরা কি টাকা ফেরত চাচ্ছি?"
এই মন্তব্যের জের ধরে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ বন্ধ ছিল দুই ম্যাচ।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন
ক্রিকেটারদের ক্ষোভের জায়গা ছিল আরও গভীরে
বুধবার রাত থেকে পরিস্থিতির উত্তপ্ত হতে থাকে। মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের কয়েকটি মন্তব্যকে ঘিরে শুরু হয় বিতর্ক।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কঠোর অবস্থান নেয় ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। তারা জানিয়ে দেয়, নাজমুল ইসলাম পদত্যাগ না করা পর্যন্ত ক্রিকেটাররা মাঠে নামবেন না।
বুধবার সিলেট পর্ব শেষে বিপিএল পুনরায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ক্রিকেটাররা তাদের অবস্থানে অনড় থাকেন। কোনো দলই মাঠে হাজির হয়নি।
ফলে বাধ্য হয়ে ম্যাচগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। যেখানে প্রথম ম্যাচটি দুপুর ১টায় শুরু হওয়ার কথা ছিল, ঠিক সেই সময়ই ক্রিকেটাররা তাদের দলীয় হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন শুরু হয় দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে।
সাংবাদিক মাজহারুল ইসলাম বলেন, "অতীতে এই ধরনের মন্তব্য করতেন সমর্থকেরা, এবার বোর্ড ডিরেক্টর করলেন- সেটা আসলে গ্রহণযোগ্য নয়"।
তবে ক্রিকেটাররা বারবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড প্রধানের সাথে নানা ইস্যুতে বসতে চেয়েও কথা বলতে পারেননি বলে অভিযোগ জানিয়ে আসছে আগে থেকেই।
মাজহারুল ইসলামের মতে, বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে অনেকদিন ধরেই ক্রিকেটারদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল, সেটারই একটা প্রতিফলন দেখা গেল সাম্প্রতিক সপ্তাহের ঘটনায়।
ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নাজমুল ইসলামের মন্তব্য আসলে ছিল শুধু একটি স্ফুলিঙ্গ। এর আড়ালে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ একে একে সামনে চলে আসে।
কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা সব ক্রিকেটারের পাশাপাশি তিন ফরম্যাটের অধিনায়ক- নাজমুল হোসেন শান্ত, মেহেদী হাসান মিরাজ ও লিটন দাস খুবই সরব ছিলেন। এর আগে কখনো এত প্রকাশ্য ও পূর্ণাঙ্গ অচলাবস্থার মুখে পড়েনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।
এই সংকটের শিকড় অনেক গভীরে। গত বছরের বোর্ড নির্বাচন, যা অধিকাংশ সংগঠক বর্জন করেছিলেন, তার পর থেকেই নতুন সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বোর্ডের সঙ্গে ঢাকা ক্লাবগুলোর সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
এর জেরে প্রথম বিভাগ থেকে আটটি দল সরে দাঁড়ায়, বহু ক্রিকেটার জীবিকার সংকটে পড়েন এবং ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে- যার কোনো কার্যকর সমাধান এখনো দিতে পারেনি বোর্ড।
কোয়াব সভাপতি মিঠুন বলেন, এসব সমস্যা সমাধানে বোর্ডের আন্তরিকতার ঘাটতি স্পষ্ট। তিনি এটিকে দায় এড়ানো ও নিষ্ক্রিয়তার সংস্কৃতি বলে উল্লেখ করেন।
"একজন বলেন আরেকজনকে পাওয়া যাচ্ছে না," বলেন তিনি। ক্রিকেটারদের সমস্যা সমাধানের বেলায়, তার ভাষায়, "কাউকেই পাওয়া যায় না।"
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত তুলে ধরেন নারী ক্রিকেটার জাহানারা আলমকে ঘিরে ওঠা হয়রানির অভিযোগের বিষয়টি। তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও এখনো প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
শান্ত বলেন, সবাই দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তের আশা করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্ব হতাশাজনক এবং এতে অন্যরাও অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
লিটন দাস নারীদের ক্রিকেটে অবকাঠামোগত দুরবস্থার কথা বলেন। অন্যদিকে শামসুর রহমান শুভো সমালোচনা করেন ফিক্সিং অভিযোগের ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
চলতি বিপিএলের আগে প্রমাণ ছাড়াই সন্দেহের ভিত্তিতে নয়জন ক্রিকেটারকে নিলাম থেকে বাদ দেওয়া হয়, অথচ তারা অন্য ঘরোয়া লিগে খেলতে পেরেছেন- যা বিভ্রান্তি তৈরি করেছে এবং একই সাথে মর্যাদাহানিকর বলছেন ক্রিকেটাররা।
বিপিএলই টুর্নামেন্ট হিসেবে নানা বিতর্কে জর্জরিত। স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি ও বিভিন্ন কমিটির প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি। টুর্নামেন্টের কাঠামোও ছিল অস্থির- একটি নতুন দল যুক্ত হওয়ার পর আরেকটি ফ্র্যাঞ্চাইজি সরে দাঁড়ালে বিসিবিকেই শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব নিতে হয়।