আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
মর্টার শেলে বাংলাদেশে দুই জনের মৃত্যু, জনশূন্য হচ্ছে গ্রামগুলো
মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথে জান্তা বাহিনীর চলমান যুদ্ধে এবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রাণ গেলো দুই জনের। নিহতদের একজন বাংলাদেশি নারী এবং অপরজন ঐ বাড়িতেই শ্রমিক হিসেবে কাজ করা রোহিঙ্গা পুরুষ।
বিবিসি বাংলাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া।
সোমবার বিকেল পৌনে তিনটায় নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের জলপাইতলী গ্রামে এ ঘটনাটি ঘটে।
ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজও বিবিসি বাংলার কাছে ঘটনাটি নিশ্চিত করেছেন।
ঘুমধুম ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান বিবিসি বাংলাকে জানান, ‘রোববার গুলির ঘটনায় দুজন আহত হওয়ার পর সোমবার দুই জনের মৃত্যুর খবরে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে সীমান্ত এলাকায়।
ঘুমধুমের এক নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শরিফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, ঘুমধুমের জলপাইতলীর বাদশা মিয়ার বাড়ির সাথেই তার জমিতে কাজ করছিলেন রোহিঙ্গা এক শ্রমিক। দুপুর আড়াইটার পর তিনি সেই বাড়িতে ভাত খেতে রান্নাঘরে যান। তখন মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টার শেল এসে পড়ে রান্নাঘরের ওপর।
ঘটনাস্থলেই ওই রোহিঙ্গা শ্রমিক মারা যান। এতে গুরুত্বর আহত হোসনে আরাকে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
মিয়ানমারের যুদ্ধে বাংলাদেশে দুই জনের মৃত্যুর ঘটনায় সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে বাড়িঘর ছাড়ছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানান স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা।
এমন পরিস্থিতিতিতে বিজিবি সদস্যদের ধৈর্য্য ধরতে অনুরোধ করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।
জনশূন্য হচ্ছে গ্রাম-বাড়িঘর
রোববার সকালে গুলির আঘাতে দুজন আহতের পর থেকেই আতঙ্ক বাড়ছিলো ঘুমধুমের তুমব্রু সীমান্ত এলাকায়। এর আগে নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এই অঞ্চলের কেউ কেউ বাড়িঘড় ছাড়তে শুরু করেছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহজাহান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এতদিন মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে যে গুলি ও বোমার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল গত দুই তিন দিনে এটি বেড়েছে। মানুষের বাড়িঘড়ের ছাদের ওপরে গুলি, মর্টার শেলের খোসা পড়ছে। আতঙ্কিত হয়ে বাড়িঘর ছাড়ছে এলাকাবাসী।
মি. শাহজাহান বিবিসি বাংলাকে বলেন, আমি আমার পরিবারকে উখিয়ায় পাঠিয়ে দিয়েছি। এমন অনেকেই তাই করেছে। কেননা মানুষ বাড়িঘরে থাকতে ভয় পাচ্ছে। সোমবার দুপুরের পর থেকে এইসব এলাকার কেউ আর বাড়িতে থাকার সাহস পাচ্ছে না।
এক নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার শরিফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, এলাকা থেকে সব মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, অনেক দূর থেকে বোমা এসে পড়ছে। তারা রিমোর্ট কন্ট্রোল সিস্টেমে অনেক ভেতর থেকে বোমা মারতেছে।
এলাকার বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা জানাচ্ছেন, ঘণ্টা খানেকের মধ্যে দুই চারটা বোমা এসে পড়তেছে এলাকায়। এই কারণে সবাই বাড়িঘর ছাড়ছে। সীমান্ত এলাকার কয়েকটি গ্রাম এখন প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে বলেও জানান তারা।
“আমরা যতটুকু সম্ভব এলাকাবাসীদের পাশে আছি। কিন্তু কতক্ষণ ধরে তাদের সাহস যুগিয়ে রাখা যাবে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আমরা জনগণকে সামলানোর চেষ্টা করছি”, বলেন মি. ইসলাম।
সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি যেমন দেখা যাচ্ছে
রোববার সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বন্ধ ছিল গোলাগুলি। ভোর থেকে আবার গোলাগুলি শুরু হয়।
স্থানীয় ইউপি মেম্বার শরীফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, কিছুক্ষণ পর পর মিয়ানমার সীমান্তে আকাশে হেলিকপ্টার দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে গোলাগুলি হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানাচ্ছে, সীমান্তের ওপারে রাইট সাইট ও লেফট সাইট নামে দুটি প্রান্ত রয়েছে। জান্তা বাহিনীর সাথে যুদ্ধের পর রাইট সাইট এখন আরাকান আর্মির দখলে চলে এসেছে সেটা এ পাশ থেকেই অনেকটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তবে লেফট সাইটে এখনও দুই পক্ষের মধ্যে চরম গোলাগুলি চলছে বলেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সীমান্ত এলাকা থেকে।
এমন অবস্থায় ঘুমধুম সীমান্ত থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় আছেন দেশটির চাকমা সম্প্রদায়ের প্রায় ৪০০ জন।
পাশাপাশি কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গাকেও সীমান্তে জড়ো হতে দেখা গেছে। গণমাধ্যমকে এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান।
অন্যদিকে আরাকান আর্মির আক্রমণের মুখে এ পর্যন্ত ১০৩ জন মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী পুলিশ-বিজিপি সদস্য বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদেরকে হেফজতে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ- বিজিবি।
এমন অবস্থায় সীমান্ত এলাকায় বিজিবিকে ধৈর্য্য ধরার জন্য বলা হয়েছে বলে সংসদে জানান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি জানান সরকার যথাযথ সময় ব্যবস্থা নেবে।
একই দিন নিজ দপ্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, প্রাণ বাঁচাতে আসা মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের ফেরত পাঠাতে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। তারা কোন পদ্ধতিতে যাবে, সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে দুই পক্ষের মধ্যে। এখনই তৃতীয় কোনো দেশের সহযোগিতা নিচ্ছে না বাংলাদেশ।