আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
পূর্বাচলের বাণিজ্য মেলা ক্রেতাদের কতটা আকর্ষণ করতে পারছে ?
- Author, সায়েদুল ইসলাম
- Role, বিবিসি বাংলা নিউজ, ঢাকা
নারায়ণগঞ্জ থেকে সপরিবারে পূর্বাচলের বাণিজ্য মেলায় এসেছেন নজরুল ইসলাম। স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে তিনি মেলায় ঢোকার লাইনে অপেক্ষা করছিলেন।
"বাসার সবাই বাণিজ্য মেলায় আসতে চায়। তাই নিয়ে এসেছি। প্রতিবছরেই একবার অন্তত আসি, জিনিসপত্র কিনি।"
তিনি বলছিলেন, তার কাছে আগের বাণিজ্য মেলার স্থান আগারগাঁও আর বর্তমান পূর্বাচলের মধ্যে খুব বেশি ফারাক নেই। কারণ নারায়ণগঞ্জ থেকে দুটোই দূরে।
কিন্তু সোহানা ইসলামের কাছে ব্যাপারটা সেরকম নয়।
"আমার বাসা আজিমপুরে। আগে চাইলেই ছুটির দিনে একটা সিএনজি ভাড়া করে মেলায় আসতে পারতাম। কিন্তু এখন তো সেটা হয় না। এখানে আসতে আজ সিএনজি ভাড়া দিতে হয়েছে ছয়শ টাকা। তারপরও দূরও তো কম না। আমি তো আসতেই চাইছিলাম না, মার জন্য এসেছি," - তিনি বলছেন।
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের আন্তর্জাতিক প্রচার ও প্রসার এবং বিদেশি আমদানি-রপ্তানিকারকদের সাথে বাংলাদেশি আমদানি-রপ্তানিকারকদের মেলবন্ধনের জন্য একসময় যে 'ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা' চালু হয়েছিল, কালের বিবর্তনে সেটি পরিণত হয়েছে ঢাকার লাখ লাখ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বার্ষিক কেনাকাটা ও বিনোদনের একটি মাধ্যমে।
১৯৯৫ সাল থেকে ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাণিজ্য মেলা হলেও গত বছর থেকে পূর্বাচলের বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী এক্সিবিশন সেন্টারে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এবার দ্বিতীয় বছরের মতো এই নতুন স্থানে বসেছে মেলা। চলবে এই মাসের শেষ অবধি।
মেলায় তৈজসপত্র, কাপড়চোপড়, অলংকার, প্লাস্টিক সরঞ্জাম, খাদ্যদ্রব্যসহ নানারকম জিনিসপত্রের দোকান রয়েছে। বাংলাদেশি বড় কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি অনেক ছোট ছোট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানও অংশ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক কিছু প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগারগাঁওয়ে তাদের যেরকম ব্যবসা-বাণিজ্য হতো, এখানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ইরানি সাদাফ সিলভারের কর্মী মির্জা আসিফ আলী বলছিলেন, "আগের সাথে যদি তুলনা করি, তাহলে আসলে ব্যবসা ভালো না। আগারগাঁওয়ে থাকতে আমাদের প্রতিদান ২/৩ লাখ টাকার বিক্রি-বেচা হতো, এখন সেটা হচ্ছে ৭০/৮০ হাজার টাকার। মেলায় লোকজন আসছে কম। যারা আসছেন, তাদের মধ্যে স্থানীয় লোকজনই বেশি।"
বহু বছর ধরে মেলায় অংশ নিচ্ছেন 'কাশ্মীর শাল হাউজের' সাব্বির আহমেদ। তিনি বলছেন, "মেলায় আসা লোকজন ঘোরাঘুরি করছে বেশি, কেনাকাটা করছে কম। যারা আসছে, তারা আশেপাশের এলাকা থেকেই বেশি আসছে। ঢাকার লোকজন যেমন কেনাকাটা করতো, এখানে তেমন হয় না।"
End of বিবিসি বাংলায় সম্পর্কিত খবর:
গত বছর পূর্বাচলের তিনশো ফিট সড়কের সংস্কার কাজ চলার কারণে মেলায় লোকসমাগম কম ছিল। সেই তুলনায় এই বছর ক্রেতাদের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
বেচা-বিক্রি কম হলেও মেলায় সুবিস্তৃত জায়গার কারণে খুশী আমির হোসেনের মতো অনেক ব্যবসায়ী।
নিকাই স্টোরের আমির হোসাইন বলছেন, "গত বছরের তুলনায় এবার মেলায় লোক বেড়েছে। এখানে জায়গা বেশি, স্টল বেশি হয়েছে, মানুষজনের বসার, হাঁটার জায়গা আছে। এবার তো দ্বিতীয় বছর। আস্তে আস্তে এখানেও মেলা জমে যাবে।"
পূর্বাচলে ২০ একর জমির ওপর বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারটি নির্মিত হয়েছে। প্রদর্শনী কেন্দ্রে ৭ হাজার ১৭৩ স্কয়ার মিটারের দুইটি পৃথক প্রদর্শনী হল রয়েছে।
সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই কেন্দ্রে সম্মেলন কক্ষ, সার্ভিস রুম, প্রেস কক্ষ, খাবারের জন্য বিশাল কক্ষ আর বাচ্চাদের খেলার জায়গা রয়েছে।
তবে শেরেবাংলা নগরের বাণিজ্য মেলার তুলনায় এখানে স্টলের ক্যাপাসিটি কম রয়েছে।
মেলায় লোকজনের আসা-যাওয়ার সুবিধার জন্য বিআরটিসির দোতলা বাসের সেবা দেয়া হচ্ছে। কুড়িল বিশ্বরোডের মোড় থেকে এসব বাসে করে মেলা পর্যন্ত যাওয়া যায়।
এরকমই একটি বাসে করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলার মুখে এসে নামলেন আবু জাফর। তিনি মিরপুর থেকে এসেছেন।
"আগে তো বাসার কাছেই মেলা ছিল, অন্তত দুই তিনবার যাওয়া হতো। কিন্তু মেলার কারণে সেখানে যে জ্যাম হতো, তাদের আমাদের সবার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে যেতো। এখন দূরে হলেও ঢাকার ভেতর তো সেই জ্যাম নেই। আর বাণিজ্য মেলায় তো প্রতিদিন আসার কিছু নেই, একবার এলেই যথেষ্ট।"
তিনি জানান, পরিবারের জন্য দরকারি কিছু তৈজসপত্র কেনার ইচ্ছা রয়েছে তাদের। প্রতিবছর এই মেলায় আসা তাদের একটা নিয়মিত বেড়ানোর মতো বিষয় হয়ে গেছে।
"বাসার অনেক কিছু কেনার জন্য ঠিক করে রাখা হয়, এই মেলা থেকে কেনা হবে। টুকটাক অনেক জিনিস তো লাগে," তিনি বলছেন।
বাণিজ্য মেলা ঘিরে বাইরে ও আশেপাশেও বেশ একটা উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
মেলার আশেপাশে অসংখ্য খাবারের দোকান ও নানারকম জিনিসপত্রের দোকান পশরা সাজিয়ে বসেছে।
মেলার ভেতরে ঘুরে দেখা গেল, বাইরের খোলা জায়গায় বিভিন্ন কোম্পানি, প্রতিষ্ঠানের স্টল সাজানো হয়েছে। ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি তাঁবুর ভেতরে স্টল আকারে জায়গা করে দেয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল ভবনের ভেতরে জায়গা দেয়া হয়েছে।
তবে এর আগেও বহুবার বাণিজ্য মেলা নিয়ে অনেক সময় সমালোচনা উঠেছিল যে, মেলায় আন্তর্জাতিক পরিবেশ থাকে না।
২৫তম বাণিজ্য মেলার উদ্বোধনকালে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছিলেন, "এই মেলা কোনভাবেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নেই। তবে আগামীবার থেকে পূর্বাচলে অনুষ্ঠিত হলে আন্তর্জাতিক মানের করার চেষ্টা করা হবে।'' কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এবারের মেলায় মূলত রপ্তানিযোগ্য প্রতিষ্ঠানই যাতে অংশ নেয়, সেই চেষ্টা করা হবে।
কিন্তু এবারো সেই অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি।
সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইরানের মতো গুটিকয়েক দেশের ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মেলায় অংশ নিয়েছেন।
পাকিস্তান থেকে বোরখা ও শাল নিয়ে এসেছেন সামিরা রেজওয়ান।
তিনি বলছিলেন, "কতো টাকা বিক্রি হল, সেটা আমাদের কাছে প্রধান বিষয় না। আমরা আসলে এখানে আমাদের নিজেদের পণ্য তুলে ধরতে আসি, ক্রেতাদের সাথে পরিচয় হয়। পরে এ থেকে বড় বড় অর্ডার পাওয়া যায়।"
তিনি বলছিলেন, পূর্বাচলের এই মেলায় তারা আগের চেয়ে বড় স্টল পেয়েছেন, খরচও কম হয়েছে। কিন্তু তাদের সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে ঠিকই যোগাযোগ হচ্ছে।
এর আগে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আগারগাঁওয়ে হলেও করোনা মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে মেলা হয়নি।
পরবর্তীতে পূর্বাচলের এই কেন্দ্রে ২০২২ সাল থেকে মেলা শুরু হয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সচিব ও বাণিজ্য মেলার পরিচালক মোঃ ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, গত বছর বাণিজ্য মেলায় ২৫ লাখ মানুষ এসেছিল। এই বছর সেটা ৩৫/৪০ লাখ হবে বলে তারা ধারণা করছেন।
"আগারগাঁও আদলে মেলাকে জমজমাট করে তোলার জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। এজন্য দেখুন পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, রাস্তাঘাট ভালো হয়েছে। অন্তত প্রথম এক দুই বছর নানারকম ছাড় দিয়ে ক্রেতাদের আনার চেষ্টা করেছি।"
"মানুষ কিন্তু এখন আসতে শুরু করেছে," - তিনি বলছেন।