ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ খুবই আন্তরিকতা দেখাচ্ছে, মোহাম্মদপুরের ছিনতাইয়ের ঘটনায় ভুক্তভোগী

মোহাম্মদপুর থানা (ফাইল ছবি)
ছবির ক্যাপশান, মোহাম্মদপুর থানা (ফাইল ছবি)

ঢাকার মোহাম্মদপুরে বৃহস্পতিবার রাতের একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ভুক্তভোগীর ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর তিন জনকে গ্রেফতার ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশের একটি দৈনিক পত্রিকার সংবাদ কর্মী আহমাদ ওয়াদুদ ছিনতাইয়ের শিকার হন।

মোহাম্মদপুর থানায় এ বিষয়ে অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিশের 'অসহযোগিতার' মুখোমুখি হন বলে ফেসবুকে এক পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।

'মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের সাথে এক ঘণ্টা' শিরোনামে ওই পোস্টে মি. ওয়াদুদ ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।

ভাইরাল হয় তার ওই পোস্ট। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার বার এটি শেয়ার হয়েছে।

ছিনতাই (প্রতীকী ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি

পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার যে অভিযোগ

মি. ওয়াদুদ লিখেন, "রাত ১১টার দিকে ছিনতাইকারীরা আমার উপর হামলা করে। তারা আমার মোবাইল ফোন, মানিব্যাগসহ কিছু টাকা নিয়ে যায়। আমাকে চাপাতি দিয়ে আঘাত করে, তবে সৌভাগ্যবশত গুরুতর কিছু হয়নি।"

ঘটনার সময় তার স্ত্রী কিছুটা দূরে থাকায় নিরাপদ ছিলেন। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা মোহাম্মদপুর থানায় পৌঁছান বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

বিবিসি বাংলাকে এই সংবাদকর্মী জানান, থানায় ঢুকে ছিনতাইয়ের বিষয়টি জানানোর পর থেকেই দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা তার সঙ্গে অশোভন আচরণ ও অসহযোগিতা করতে থাকেন।

"আমি যখন অনুরোধ করি অভিযোগটি লেখার জন্য, তখন জানানো হয় অভিযোগ লেখার কেউ নেই। আমি বলি, আমি নিজেই লিখে দিচ্ছি—তাও তারা কলম পর্যন্ত দিতে চায়নি। অথচ তাদের ডেস্কে অনেকগুলো কলম পড়ে ছিল," যোগ করেন মি. ওয়াদুদ।

পরে আহমাদ নিজেই স্ত্রী'র ব্যাগ থেকে কলম নিয়ে অভিযোগ লেখেন। থানার পক্ষ থেকে তাকে কোনো অভিযোগের কপিও দেওয়া হয়নি জানিয়ে বলেন, শুধু একজন এএসআই'র ফোন নম্বর দিয়ে জানানো হয়, তার সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু তিনি ব্যস্ত আছেন।

বিবিসি বাংলার আরো খবর:
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

যেহেতু ঘটনা বেশিক্ষণ আগে ঘটেনি তাই মি. ওয়াদুদের ধারণা ছিল তখনই ঘটনাস্থলে গেলে ছিনতাইকারীদের পাওয়া যাবে। তাই তিনি অনুরোধ জানান ঘটনাস্থলে কাউকে পাঠানোর জন্য।

তবে, এতে পুলিশ কর্মকর্তারা 'বিরক্তি' প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ করেন ওই সংবাদকর্মী।

এরপর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হাসানের সঙ্গে দেখা করেন আহমাদ ওয়াদুদ।

মি. ওয়াদুদের অভিযোগ, "তিনি(ওসি) বললেন, আমি ওসি হয়েও এই কমদামি ফোন ব্যবহার করি, আপনি এত দামি ফোন নিয়ে ঘুরলে ছিনতাই তো হবেই!

পরবর্তীতে ওসি মি. হাসান, সহকারী-উপপরিদর্শক আনারুল ইসলামকে ফোনে নির্দেশ দিলে, পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যান আহমাদ। সেখানে গিয়ে মি. আহমাদ ছিনতাইকারীদের শনাক্তও করেন।

কিন্তু এএসআই আনারুল তাদের দিকে না গিয়ে অন্য লোকজনের সঙ্গে আলাপ করতে চলে যান, বলছিলেন ওয়াদুদ।

"আমি বারবার দেখিয়ে দিলাম, ওরা ওখানেই বসে আছে। কিন্তু পুলিশ নড়ল না। তারপর ওরা আমাদের সামনেই ধীরে ধীরে চলে গেল," যোগ করেন তিনি।

আনারুল তখন 'গভীর রাতে অভিযান চালাবেন' বলায় আহমাদ ও তার স্ত্রী বাসায় ফিরে যান।

পুলিশ প্রহরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে

'ছিনতাইকারীর প্রতি ক্ষোভ, পুলিশের দিকে ঘুরে যায়'

মি. আহমাদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ছিনতাইয়ের পর আমার ক্ষোভ ছিনতাইকারীদের দিকেই ছিল। কিন্তু পুলিশের অসহযোগিতামূলক আচরণে সেই ক্ষোভ পুরোপুরি পুলিশের দিকেই ঘুরে যায়।"

রাত তিনটার দিকে তিনি ফেসবুকে ঘটনার বিবরণ দিয়ে একটি পোস্ট লেখেন। সকালে দেখেন পোস্টটি ভাইরাল হয়ে গেছে।

এরপর পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং দুঃখ প্রকাশ করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।

আহমাদ ওয়াদুদ বলেন, "ছিনতাই হওয়াটা একটা দুঃখজনক ঘটনা। কিন্তু সবচেয়ে বড় হতাশা এসেছে পুলিশের অসম্মানজনক ও দায়িত্বহীন আচরণ থেকে।"

শুক্রবার দুপুরে থানা থেকে ফোন করে জানানো হয়, তার ফোন উদ্ধার করা হয়েছে এবং তিনজনকে আটক করা হয়েছে। থানায় গিয়ে আটককৃতদের মধ্যে একজনকে শনাক্ত করেন ওয়াদুদ।

থানা থেকেই বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ খুবই আন্তরিকতা দেখাচ্ছে।

"এটা তো সবসময়ই হওয়ার কথা। স্বাভাবিকভাবেই যেন মানুষ এই সেবাটা পায়," যোগ করেন তিনি।

বিবিসি বাংলার আরো খবর:
পুলিশ সদস্যদের অবস্থান

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভুক্তভোগীর বলেন, "সবচেয়ে বড় হতাশা এসেছে পুলিশের অসম্মানজনক ও দায়িত্বহীন আচরণ থেকে।"

পুলিশ কী বলছে?

প্রাথমিকভাবে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে যে চারজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, তারা হলেন উপ-পরিদর্শক জসিম উদ্দিন. সহকারী উপ-পরিদর্শক আনারুল ইসলাম ও দুইজন কনস্টেবল।

মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ তড়িৎ গতিতে ব্যবস্থা নিয়েছে।

"জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং যেসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে," বলছিলেন মি. রহমান।

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হাসান বলছেন, মি. ওয়াদুদ ফেসবুকে যেসব অভিযোগ করেছেন, সেগুলো 'ফেব্রিকেটেড'।

"একই অফিসের সবার দক্ষতা সমান হয় না। ভুক্তভোগী হয়তো কোনো পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু, তার অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়," বলেন ওসি মি. হাসান।

তিনি আগের একটি চুরির ঘটনার ব্যাপারে কথার প্রেক্ষিতে দামি ফোনের প্রসঙ্গ টানলেও নিজের কমদামি ফোন ব্যবহারের তুলনা টানেননি বলেও দাবি করেছেন।

প্রশ্নের জবাবে ইফতেখার হাসান বলেন, ভাইরাল না হলেও তারা অপরাধী ধরতে সচেষ্ট থাকতেন।

"ঢাকা মহানগর পুলিশের মোট গ্রেফতারের তিন ভাগের এক ভাগ মোহাম্মদপুরে হয়। সবাই তো আর ভাইরাল হয় না," বলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

অবশ্য যে ফোনের জন্য এতকাণ্ড সেটি এখনই হাতে পাচ্ছেন না আহমাদ ওয়াদুদ। মামলা হওয়ায় এটি আদালতে আলামত হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। তারপর আদালতে নির্দেশ সাপেক্ষে ফোনটি হাতে পাবেন তিনি।