শুল্ক নিয়ে ট্রাম্পের 'জয়ের' জন্য দিতে হতে পারে চড়া মূল্য

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Christopher Furlong/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিভিন্ন দেশের পণ্য আমদানির ওপর বিভিন্ন ধরনের শুল্ক আরোপের কথা বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
    • Author, অ্যান্থনি জুরচার
    • Role, উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা
    • Author, দর্শিনী ডেভিড
    • Role, ডেপুটি ইকোনমিক্স এডিটর

বিদেশি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে গত এপ্রিল মাসে গোটা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ঘোষণাকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক শঙ্কা তৈরি হলে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিতও করেছিলেন তিনি।

এর চার মাস পর, বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে হওয়া কয়েকটা গুটিকয়েক চুক্তি প্রকাশ্যে এনে তাকে 'ধারাবাহিক বিজয়' বলে দাবি করেছেন মি. ট্রাম্প।

তবে আগে ও পরে, সব ক্ষেত্রেই তিনি একতরফাভাবে অন্যদের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন। যদিও এর ফলে আর্থিক বাজারে ব্যাপক আকারের কোনো ব্যাঘাত এখনো দেখা যায়নি।

বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করার যুক্তি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এই প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন যে তার এই পদক্ষেপের মাধ্যমে নয়া রাজস্ব নীতির সুবিধা মিলবে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত হবে, শত শত বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ হবে এবং মার্কিন পণ্য কেনার পরিমাণও বাড়বে।

বাস্তবে তেমনটাই হবে কি না এবং এই সব পদক্ষেপের নেতিবাচক পরিণতি দেখা যেতে পারে কি না তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

এরই মাঝে এখন পর্যন্ত যেটা স্পষ্ট, তা হলো ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আগেও মুক্ত বাণিজ্যের যে জোয়ার (মৃদুভাবে) ঘুরপাক খাচ্ছিল, তা বিশ্বজুড়ে আছড়ে পড়া বিশালাকার ঢেউয়ে পরিণত হয়েছে।

এটা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রকে বদলাচ্ছে সত্যি, তবে এর কারণে কোনো বিপর্যয়মূলক প্রভাব এখনো দেখা যায়নি যেমনটা অনেকেই আগাম আশঙ্কা করেছিলেন।

আবার এটাও ঠিক, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরো মাত্রায় প্রভাব চোখে পড়তে সময় লাগে।

পুরো বিষয়টা অনেক দেশের ক্ষেত্রেই একটা 'ওয়েক আপ কল' বা ঘুম ভাঙানোর সংকেতের কাজ করেছে। যার মাধ্যমে তাদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে নতুন জোটের জন্য আবার সক্রিয় হয়ে ওঠার সময় এসে গেছে।

তাই এর স্বল্পমেয়াদী ফলাফল হিসেবে বিষয়টাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের 'জয়' বলে মনে করলেও সামগ্রিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে এই পদক্ষেপের প্রভাব কেমন হবে সেটা তেমন নিশ্চিত নয়।

দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য ভিন্ন বলে যেমন প্রমাণিত হতে পারে, তেমনই তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এর প্রভাব দেখা যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে।

স্যার কিয়ের স্টারমারের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Christopher Furlong/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির পর তাদের ওপর সবচেয়ে কম, অর্থাৎ ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র

'৯০ দিনের মধ্যে ৯০টা চুক্তি'

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের ক্যালেন্ডারে পহেলা অগাস্ট দিনটা বড় করে দাগানো ছিল, তবে তার কারণ আলাদা।

নীতি নির্ধারকেরা জানতেন, হয় ওইদিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নতুন বাণিজ্য শর্তে সম্মত হতে হবে, কিংবা শর্তে রাজি না হলে বিপুল পরিমাণে বাণিজ্যশুল্ক চাপানো হবে।

প্রসঙ্গত, হোয়াইট হাউজের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো '৯০ দিনে ৯০টা চুক্তির' পূর্বাভাস আগেই দিয়েছিলেন।

মি. ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, আমদানি শুল্ক নিয়ে চুক্তির বিষয়ে তিনি আশাবাদী।

তবে চুক্তির ক্ষেত্রে সময়সীমার বিষয়টা একটু বাড়িয়ে চড়িয়েই বলা হচ্ছে বলেই মনে হয়েছিল এবং সেটাই হয়েছে।

জুলাইয়ের শেষের দিকে তিনি মাত্র এক ডজন বাণিজ্য চুক্তির কথা ঘোষণা করেছিলেন। সেই চুক্তি এক বা দুই পাতার বেশি দীর্ঘ নয় এবং অতীতের আলোচনায় যেমন বিস্তারিতভাবে বিধানের উল্লেখ থাকত, এক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি।

যে দেশের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, সেই তালিকায় প্রথমেই ছিল যুক্তরাজ্য, সম্ভবত অনিবার্যভাবেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সবচেয়ে সমস্যার বিষয় ছিল বাণিজ্য ঘাটতি এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বিস্তৃত ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প

বেশিরভাগ ব্রিটিশ পণ্যের ওপর আরোপ করা ১০ শতাংশের বেসলাইন দেখে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে একটা অন্য বিষয়ও ছিল।

অন্য দেশের ওপর আরোপ করা শুল্কের তুলনায় যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে বাণিজ্য শুল্ক কম এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাপানের মতো অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর আরোপ করা ১৫ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা যুক্তরাজ্যকে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। শুধু গত বছরই এর পরিমাণ যথাক্রমে ২৪০ বিলিয়ন ডলার ও ৭০ বিলিয়ন ডলার ছিল।

তবে এই চুক্তিগুলো এমনি এমনি হয়নি, সেখানে শর্ত ছিল।

এদিকে যেসব দেশ আরও বেশি পরিমাণে মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি, তাদের চড়া শুল্কের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া, কম্বোডিয়া, পাকিস্তানের মতো দেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় একদিকে যেমন তালিকা দীর্ঘ হয়েছে, তেমনই শুল্ক সংক্রান্ত চিঠি পাঠানোও শুরু হয়েছে।

মার্কিন আমদানির বেশিরভাগ অংশই এখন একটা চুক্তির আওতায় থাকে অথবা প্রেসিডেন্টের ডিক্রির মাধ্যমে সুরক্ষিত, যার শেষে কিছুটা রূঢ়ভাবেই লেখা থাকে- "এই বিষয়ে আপনার মনোযোগের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ"।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Andrew Harnik/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক সংক্রান্ত নীতি বৈশ্বিকস্তরে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে

বিশ্ব অর্থনীতিকে 'ক্ষতি' করার ক্ষমতা

এখনো পর্যন্ত অনেকই কিছু প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমেই সুখবরের বিষয়ে আসা যাক।

গত কয়েক মাসের বাগ-বিতণ্ডা, মানে শুল্ক ও আর্থিক মন্দার হুঁশিয়ারির মতো সবচেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপারগুলো এড়ানো গেছে। শুল্ক স্তর ও তার ফলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যত্র) নিয়ে যে তীব্র আশঙ্কা ছিল তা এখনো দেখা যায়নি।

দ্বিতীয়ত, আমদানি শুল্ক সংক্রান্ত চুক্তির শর্তাবলী (তা সে যতই অপছন্দের হোক না কেন) নিয়ে অনিশ্চয়তা (শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে যার নেপথ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প) অনেকটাই কমেছে, তা সে ভালোর জন্য হোক বা খারাপের জন্য।

ভালো বলার কারণ–– এখন অন্তত ব্যবসায়ীরা জানেন তাদের পণ্যের ওপর কী পরিমাণ শুল্ক বসতে চলেছে। এর আগে বিনিয়োগ এবং কর্মী নিয়োগের বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারছিলেন না, সেটা তারা নিতে পারবেন।

পণ্যের ওপর আরোপ করা শুল্কের বিষয়ে জানার ফলে তারা ঠিক করতে পারবেন কীভাবে ওই ব্যয়ের বিষয়টা মোকাবিলা করা যায়, কিংবা ভারসাম্য রাখতে বোঝার কিছুটা ভোক্তাদের দিকে ঠেলে দেওয়া যায় কি না।

এই যে এক ধরনের নিশ্চয়তা অনুভব করা যাচ্ছে, সেটা আর্থিক বাজারে আরও স্বচ্ছন্দ মেজাজকে দর্শায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শেয়ারের দিক থেকে লাভ করছে।

এবার আসা যাক কেন খারাপ প্রভাবের কথা বলা হচ্ছে।

খারাপ এই অর্থে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে গেলে বিদেশি রফতানিকারকদের আগের চেয়ে বেশি শুল্ক দিতে হবে। ছয় মাস আগে বিশ্লেষকরা যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তার চেয়েও চড়া শুল্ক দিতে হবে তাদের।

মি. ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হওয়া মার্কিন চুক্তির আকারের প্রশংসা করতেই পারেন, তবে আগের দশকগুলোতে বাণিজ্য বাধা কাটিয়ে উঠতে যেসব চুক্তি হয়েছিল, তার সঙ্গে এর তুলনা চলে না।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, অর্থাৎ সম্ভাব্য আর্থিক বিপর্যয় নিয়ে অনেকে যে সতর্কতার কথা বলেছিলেন সেই উদ্বেগের বিষয়টা এড়ানো গেছে।

তবে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গ্লোবাল ম্যাক্রো ফোরকাস্টিং ডিরেক্টর বেন মে মনে করেন, মার্কিন শুল্ক বিভিন্নভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে 'ক্ষতি' করার ক্ষমতা রাখে।

তিনি বলেছেন, "তারা স্পষ্টতই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জিনিসের দাম বাড়াচ্ছে এবং পরিবারগুলোর আয় করা অর্থ নিংড়ে নিচ্ছে।"

তার মতে, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যদি কম পণ্য আমদানি করে তবে ওই পলিসির হাত ধরে বিশ্বজুড়েও চাহিদা হ্রাস পাবে।

নরেন্দ্র মোদী ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক এবং বাড়তি 'জরিমানা' ঘোষণা করেছেন মি. ট্রাম্প

বিজয়ী এবং পরাজিত: জার্মানি, ভারত ও চীন

এই বিষয়টা শুধু শুল্কের আকার সঙ্গেই সম্পর্কিত না, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যান্য দেশগুলোর যে পরিমাণ বাণিজ্য হয়, তার সঙ্গেও এর যোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ভারতের দেশজ উৎপাদনের মাত্র দুই শতাংশ হলো মার্কিন চাহিদা।

এ কারণে ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের অর্থনীতিবিদরা অনুমান করছেন, প্রবৃদ্ধির ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব সামান্য হতে পারে।

তবে জার্মানির জন্য খুব একটা সুখবর নয়। জার্মানির ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু এর ফলে বছরের শুরুতে যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল তার তুলনায় এই বছর অর্ধ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।

এর কারণ দেশের অটোমোটিভ (মোটরগাড়ি) সেক্টরের আকার। নতুন শুল্কের কথা মাথায় রাখলে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মন্দার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া দেশকে কোনোভাবেই সাহায্য করে না।

এদিকে, চীনের ভাগ্যে কী রয়েছে সে বিষয়ে উদ্বেগ জন্মাবার পর অ্যাপল তার প্রোডাকশন স্থানান্তর করে এবং গত কয়েক মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্মার্টফোন বিক্রির শীর্ষ উৎস হয়ে উঠেছে ভারত।

অন্যদিকে, ভারত এই বিষয়ে সচেতন থাকবে যে ভিয়েতনাম এবং ফিলিপিন্সের মতো দেশগুলো যাদের ওপর তুলনামূলকভাবে কম শুল্ক আরোপ করা হয়, তারা অন্যান্য শিল্পে ক্ষেত্রে আরও আকর্ষণীয় সরবরাহকারী হয়ে উঠতে পারে।

একটা স্বস্তির বিষয় আছে এবং সেটা হলো–– এই আঘাত যতটা বিস্তৃত হতে পারত তার চাইতে কম হওয়ারই সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু এরই মধ্যে যা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ধরন ও জোটের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

কিছু দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ-প্রতিষ্ঠিত সম্পর্কের মাঝে ঝুঁকির উপাদান ঢোকানোর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা গতি পেয়েছে, আবার ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেক দেশের জন্য এটা একট 'ওয়েক আপ কল' বা ঘুম ভাঙানোর সংকেত হিসেবেও কাজ করেছে। তাদের ভাবতে বাধ্য করছে যে নতুন জোটের জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠাটা কতটা প্রয়োজন।

ট্রাম্পের জন্য বাস্তবিক রাজনৈতিক ঝুঁকি?

যা হওয়ার তা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে এবং মার্কিন অর্থনীতিতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে তাও স্পষ্ট হচ্ছে।

বসন্তের শেষের দিকে রফতানির হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বছরের বাকি সময়ে প্রবৃদ্ধি গতি হারাবে।

বছরের শুরুতে শুল্ক গড়ে দুই শতাংশ থেকে বেড়ে এখন প্রায় ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মার্কিন সরকারের রাজস্বের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। এইটাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল।

আমদানি শুল্ক থেকে চলতি বছরে এখনো পর্যন্ত ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রাজস্বের প্রায় পাঁচ শতাংশ, যা বিগত বছরগুলোতে এই অংকটা ছিল প্রায় দুই ছিল শতাংশ।

ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, চলতি বছরে এই শুল্ক রাজস্ব প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার হবে বলে তার অনুমান। ফেডারেল আয়কর থেকে বছরে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার আসে।

এখন একেবারে সামনের সারিতে রয়েছেন মার্কিন ক্রেতারা। পণ্যের দাম বেড়ে ঠিক কী দাঁড়াবে তা পুরোটা সামনে আসেনি।

কিন্তু ইউনিলিভার এবং অ্যাডিডাসের মতো কোম্পানিগুলো ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রোডাক্টের দাম বাড়াতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত 'রেট কাট'কে বিলম্বিত করার জন্য যথেষ্ট।

পাশাপাশি ভোক্তাদের পকেটে একটা বড়সড় থাবা বসাতেও চলেছে।

পূর্বাভাস অনিশ্চিত হলেও এটা বাস্তব যে এমনটা হলে তার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ যিনি দাম কমানোর প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি এও বলেছিলেন যে তিনি এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না যাতে ভোক্তাদের ব্যয়ের বোঝা বেড়ে যায়, তার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতেই পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউসের অন্যান্য কর্মকর্তারা নিম্ন আয়ের আমেরিকানদের রিবেট চেক দেওয়ার ধারণাও উত্থাপন করেছেন। তেমনটা হলে, যে শ্রমজীবী ভোটাররা ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছেন, তাদের সমস্যা কিছুটা কমতে পারে।

তবে এই ধরনের প্রচেষ্টা অযৌক্তিক হতে পারে এবং এর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনেরও প্রয়োজন হবে।

আবার একদিক থেকে এটা কৌশলগত স্বীকারোক্তিও হতে পারে।

বর্তমান ব্যয় কাটছাঁট ও কর ছাড়ের বিষয়গুলোর সঙ্গে আরসাম্য আনতে এই রাজস্ব নীতি চালু করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে চাকরি ও সম্পদ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে এমন দাবি করলেও বিষয়টা রিপাবলিকান দলের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক।

কারণ আগামী বছরে মিড টার্ম স্টেট ইলেকশন এবং মিড টার্ম কংগ্রেসনাল ইলেকশনের সময় তাদের ভোটারদের মুখোমুখি হতে হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মি. ট্রাম্পের আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে মার্কিন বাজারে বিদেশি পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞরা

যে চুক্তি বাকি আছে

এই সব কিছুকেই আরও জটিল করে তোলার মতো অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। এখনো একাধিক চুক্তি বাকি, বিশেষত কানাডা এবং তাইওয়ানের সঙ্গে।

মার্কিন প্রশাসন এখনো ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ইস্পাত শিল্পের বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। ভিন্ন সময়সীমা সাপেক্ষে চীনের ইস্যুটিও অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে।

এরই মাঝে বৃহস্পতিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক প্রধান বাণিজ্য অংশীদার মেক্সিকোর সঙ্গে আলোচনার মেয়াদ বাড়াতে বাড়াতে রাজি হয়েছেন মি. ট্রাম্প।

অন্যদিকে, যে সমস্ত চুক্তি এখনো হয়েছে তার বেশিরভাগই মৌখিকভাবে হয়েছে। এখনো স্বাক্ষর করা হয়নি।

তাছাড়া চুক্তির সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শর্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, মার্কিন জ্বালানি খাত থেকে ক্রয় বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টা কীভাবে হবে সেই বিষয়গুলোও স্পষ্ট নয়।

কিছু ক্ষেত্রে, বিদেশি নেতারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের উল্লেখ করা বিধানগুলো মানতে রাজি হননি।

হোয়াইট হাউজের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মধ্যে শুল্ক চুক্তির মূল্যায়ন করতে গিয়ে ডেন মে বলেছেন, "বিস্তারিত বিবরণের মধ্যেই জুজু লুকিয়ে রয়েছে" এবং বিশদে এখন পর্যন্ত কিছুই জানা যায়নি।

তবে এটা স্পষ্ট যে একটা ধ্বংসাত্মক বাণিজ্য যুদ্ধের দ্বারপ্রান্ত থেকে সরে আসা গেছে। এখন অন্যান্য দেশ নতুন ধরনের বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করছে, আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে।

কিন্তু ইতিহাস বলছে, আমেরিকায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য হয়তো খুব সীমিত সাফল্যই পাবে।

কানাডা এবং ইইউর মতো দীর্ঘদিনের বাণিজ্য অংশীদাররা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংযোগ তৈরির জন্য বিকল্প খুঁজতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রকে তারা আর নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক মিত্র হিসেবে দেখবে না।

বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর বিশিষ্ট অবস্থানের কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প এর সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ওই জায়গায় পৌঁছাতে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ব্যয় করেছে।

যদি বর্তমান শুল্ক অর্থনীতির কাঠামোকে আঘাত করে তবে তার তার ফল কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে হবে না।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যে আসন্ন সপ্তাহে বা আগামী কয়েক মাসে মিলবে তেমনটা নয়, জবাব মিলবে আসন্ন বছরগুলোতে।

এর মাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজের ভোটারদেরই চড়া দাম, কম বিকল্প এবং শ্লথ প্রবৃদ্ধির সম্মুখীন হতে পারে।

অতিরিক্ত প্রতিবেদন: মাইকেল রেস।