বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল থেকে যেভাবে শিক্ষার্থীদেরকে বের করা হলো

হল ছেড়ে যাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, হল ছেড়ে যাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে দেশব্যাপী চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকে মূল ভূমিকা পালন করে আসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

ক্যাম্পাসগুলোয় সংঘর্ষ ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে বুধবার বাংলাদেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন একযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করে। এর আগে মঙ্গলবার এই নির্দেশনা দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মন্জুরি কমিশন।

সেইসাথে, শিক্ষার্থীদেরকে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে হল ছাড়ার নির্দেশ দেন। যদিও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজি হননি।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এরপর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, এমনকি হলগুলোতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে ভয়-ভীতি দেখিয়েছে এবং হল ছাড়তে বাধ্য করেছে।

বৃহস্পতিবার সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখন দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো খালি পড়ে থাকলেও অনেক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের আশেপাশেই আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-পরিজনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন।

মুখোমুখি পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মুখোমুখি পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী

রাতভর অন্ধকারে থেকেছেন জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা

দেশের যেই গুটিকয়েক বিশ্ববিদ্যালগুলোর শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের নির্দেশ না মেনে হলে থেকে গেছে, সেগুলোর মাঝে অন্যতম হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

গতকাল ১৭ই জুলাই মঙ্গলবার সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদেরকে বিকাল চারটার মাঝে হল ছাড়তে বলা হয়। ওইদিন দুপুর ১২টার দিকে সভার প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদেরকে এই সিদ্ধান্ত জানাতে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার।

তখন শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মারেন এবং ভাঙ্গচুর চালান। একপর্যায়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ কয়েকজন শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রাখেন।

উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করার পর জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে পুলিশ, বিজিবি ও র‍্যাব হাজির হয়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হাসিব তানভীর জানান, ওইদিন বিকালে “উপাচার্যকে উদ্ধার করতে কয়েকশো পুলিশ আসে এবং শুরুতেই তারা শিক্ষার্থীদের আক্রমণ করে।”

বিকাল পাঁচটা থেকে শুরু হওয়া পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া দু’ঘণ্টা ধরে চলে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ছররা বুলেট, রাবার বুলেট ছোড়েন। এতে করে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন এবং এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়।

তালা ঝুলছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলে

ছবির উৎস, Hasib Tanvir

ছবির ক্যাপশান, তালা ঝুলছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলে
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

পরে পুলিশি পাহারায় উপাচার্যসহ সকলকে ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

“কিন্তু ভিসি তার বাসভবনে যায়নি। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে শেখ হাসিনা যুব উন্নয়ন কেন্দ্রে গতকাল রাতে তিনি অবস্থান করেন,” বলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিব তানভীর।

তিনি জানান যে উপাচার্যকে সরিয়ে নেওয়ার পর রাতে কোনও ঝামেলা হয়নি এবং প্রায় ১৫-২০ শতাংশ শিক্ষার্থী রাতে হলেই ছিল। বাকীদের কেউ কেউ বাড়িতে চলেও গেলেও অনেকেই ক্যাম্পাসের আশেপাশে পরিচিত-পরিজনদের বাসা-বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

গতকাল রাতে যে ১৫-২০ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে ছিলো, তারা রাতভর অন্ধকারে কাটিয়েছে। কারণ রাতে হলে কেউ আক্রমণ না করলেও হলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিলো।

শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার ভোর ছয়টার দিকে হলে বিদ্যুৎ আসে। কিন্তু এদিনে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হল খালি করার জন্য “রেইড দেওয়ার উদ্দেশ্যে” জাহাঙ্গীরনগরে ফের পুলিশ ঢোকে।

“হলগুলো পুলিশ নিজ দায়িত্বে তালা দিবে,” সকালের দিকে বিবিসি বাংলাকে বলেন হাসিব তানভীর।

এরপর এদিন দুপুর সোয়া দুইটার দিকে আবারও খোঁজ নেওয়া হলে তিনি জানান, ক্যাম্পাস ছেড়েছেন শিক্ষার্থীরা এবং “নিরাপত্তারক্ষীরা হলের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে ভেতরে বসে আছেন।”

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা

হল ছাড়তে চাননি ঢাবি শিক্ষার্থীরাও

১৭ই জুলাই সারাদেশের চোখ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাবি’র হল ও ঢাবি শিক্ষার্থীদের ওপর।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এখানেও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং শিক্ষার্থীদেরকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টার মাঝে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার পর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে জানা গেছে যে গতকালই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল ছেড়ে দিতে “বাধ্য হয়েছেন” তারা।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও একটি গণমাধ্যমের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি শাফাত রহমান হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে থাকেন। তিনিও ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে হল ছাড়েন।

ছল ছাড়ার সময়ের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “কালকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে হল কর্তৃপক্ষ মাইকিং করছিল যে সময় শেষ। তারা বলছিলো—এখন নেমে যান, নয়তো পুলিশ অভিযানে আসবে। আর, তারা অভিযানে আসলে যে ফলাফল হবে, তার দায় হল প্রশাসন নিবে না।”

“এভাবে ভয় দেখানোয় সবাই হল ছেড়ে চলে গেছে,” বলেন তিনি।

তবে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা উপায়ন্তর না পেয়ে হল ছেড়েছেন উল্লেখ করে চলমান আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ বলেন, “হল খালি করার জন্য পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, সোয়াটের মতো চারটা বাহিনী শত শত শিক্ষার্থীদেরকে বের করেছে। বিভিন্ন হলের ভেতরে টিয়ারশেল মারা হয়েছে।”

“মেয়েদের হল বঙ্গমাতা ও কুয়েত মৈত্রী হলেও তারা অভিযান করেছে এবং শিক্ষার্থীদেরকে হল থেকে বের করতে বাধ্য করেছে।

“পুরো ক্যাম্পাস এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। শিক্ষার্থীরাও যেতে পারছে না।”

আসিফ মাহমুদ আরও বলেন যে এই আন্দোলনের সমন্বয়করা এখন নির্দিষ্ট কোথাও থাকতে পারছে না। বারবার জায়গা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। “কারণ ডিবি, পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদেরকে খোঁজ করছে।”

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদর ওপর হামলার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদর ওপর হামলার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।

এখনও হল ছাড়েনি জগন্নাথের ছাত্রীরা

বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণার সঙ্গে ছাত্রীদেরকে বিকাল চারটার মধ্যে জবি’র একমাত্র আবাসিক হল ‘ঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল’ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত জানার পরেই বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা হলের প্রভোস্ট দীপিকা রানীসহ হলের হাউজ টিউটরদেরকে কক্ষের মাঝে রেখে বাইরে তালা লাগিয়ে দেন।

শিক্ষার্থীদের দাবী ছিল, তারা কোনও পরিস্থিতিতে হল ত্যাগ করবেন না এবং যারা হলের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ কিছুতেই বন্ধ করে দেওয়া যাবে না।

একপর্যায়ে কর্তৃপক্ষ এতে মৌখিক সম্মতি দিলেও শিক্ষার্থীরা লিখিত সম্মতি চান। পরবর্তীতে ওইদিন দুপুরে একটি বিজ্ঞপ্তিতে আবাসিক হল খোলা রাখার কথা জানান কর্তৃপক্ষ।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া শিকদার বৃহস্পতিবার বিবিসিকে জানান যে যেসব শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি, তারা হল ছাড়ার নির্দেশের আগেই বাড়িতে চলে গেছেন।

কিন্তু যেসব শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের সাথে ছিলেন, তাদের “৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই এখনও হলে আছে। শিক্ষার্থীদের দুই একজন যাচ্ছে। আন্দোলনকারীদের সবাই হলেই আছে।”

তিনি আরও জানিয়েছেন যে তারা হলে নিরাপদেই আছে এবং হলের অবস্থা “ভালো”।

“হলের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ হল প্রাঙ্গণে আছেন। শান্ত পরিবেশ। এখানে তেমন কোনও ঝুঁকি নেই, হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছি না,” তিনি যোগ করেন।

তেজগাঁও, নাবিস্কো মোড় এলাকায় শিক্ষার্থীদের অবস্থান।

ছবির উৎস, BBC/SaumitraShuvra

ছবির ক্যাপশান, তেজগাঁও, নাবিস্কো মোড় এলাকায় শিক্ষার্থীদের অবস্থান।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের বহর

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মীর কাদির বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় কোনও শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে।

তিনি জানান, অনেক শিক্ষার্থী হল থেকে চলে গেছেন। আর যেসব আন্দোলনকারী ক্যাম্পাসের আশেপাশে আছেন, তারা ক্যাম্পাসে এসে জড়ো হতে পারছে না।

কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সকাল থেকেই অনেক পুলিশ অবস্থান করছে।

মঙ্গলবার দিনভর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে রাবি শিক্ষার্থীরা দুপুর দুইটার পর প্রশাসনিক ভবন অবরুদ্ধ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ ২০জন শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রাখে।

এসময় শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের সাথে দয়ায় দফায় আলোচনায় বসে এবং তাদের দাবী জানায়। কিন্তু উপাচার্য তাদের দাবি মেনে না নেওয়ায় তাকে অবরুদ্ধই করে রাখেন।

হল ছেড়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

ছবির উৎস, Sajid Hossain

ছবির ক্যাপশান, হল ছেড়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

পরবর্তীতে “পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব যৌথভাবে এসে শিক্ষার্থীদেরকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে সরিয়ে দেয় এবং ভিসিসহ সকল শিক্ষকদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়,” বলেন মীর কাদির।

ভিসি শিক্ষার্থীদের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদেরকে হল ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং বলেন, “তোমরা চলে যাও। আমি হয়তো বা এরপর আর কোনও দায়িত্ব নিতে পারবো না।”

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ছেলেদের সকল হল খালি এবং মেয়েদের কোনও কোনও হলে ১০-১২ জন করে আছেন। “কিন্তু তাদেরকেও আজ চলে যেতে বলা হয়েছে।”

এই শিক্ষার্থী জানান, পুলিশ গতকাল শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে।

তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো খুব দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পেছনে ‘গুজব’কেও দায়ী করেন মীর কাদির। তিনি বলেন, গত ১৫ই জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী মিছিল করে। ওইসময় গুজব ছড়ায় যে ছাত্রলীগ ও পুলিশ মিলে এক হাজার লোক হলে হামলা করবে।

“এরপর ক্যাম্পাস ফাঁকা হওয়া শুরু করে, সেটা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের নির্দেশনা আসার আগেই।”

পুলিশ গুলি ছুড়লে বেশ কয়েকজন আহত হন। আহত একজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ছবির উৎস, BBC/SaumitraShuvra

ছবির ক্যাপশান, পুলিশ গুলি ছুড়লে বেশ কয়েকজন আহত হন। আহত একজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

হল খালি করার সিদ্ধান্ত কতটা কাজে এসেছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয় মঙ্গলবার।

কিন্তু বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হল ছাড়তে অসম্মতি প্রকাশ করেছেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয় ও চাপের মুখে শিক্ষার্থীরা হল ছাড়েন।

অতীতে সামরিক সরকারসহ বিভিন্ন সরকারের আমলে ছাত্র বিক্ষোভ প্রশমন করতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে হল খালি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

ধারণা করা হয়েছিলো যে, হলের শিক্ষার্থীরা চলে গেলে বৃহস্পতিবার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে আসবে এবং আন্দোলন বড় মাত্রায় রূপ নিবে না। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

কারণ, বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকেই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছেন।

কোটা সংস্কারের এই আন্দোলন শুধুমাত্র এখন বিভাগকেন্দ্রিক নেই। বরং, তা জেলা-উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে।

আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ এদিন দুপুরে বিবিসিকে বলেন, “আজকের আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগদান করছে। পাবলিকের শিক্ষার্থীরা পারছি না, কারণ ক্যাম্পাস তাদের (পুলিশের) দখলে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুভমেন্ট করার মতো সিচুয়েশন নাই।”

এদিকে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা

কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনের মূল কারণ

২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল বাংলাদেশে।

তার মাঝে ৩০ শতাংশই ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটা। বাকি কোটার মাঝে ১০ শতাংশ নারী কোটা, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ৫ শতাংশ কোটা ছিল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য এবং এক শতাংশ কোটা ছিল প্রতিবন্ধীদের।

ওই বছরই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল যে কোটা ৫৬ শতাংশ না হয়ে ১০ শতাংশ করা হোক।

তাদের দাবির মুখে সে বছর পুরো কোটা পদ্ধতিই বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করা হয়।

কিন্তু ২০২১ সালে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ফিরে পাবার জন্য উচ্চ আদালতে রিট করেন এবং গত পাঁচই জুন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের ওই রায়ের পর গত ছয় জুন থেকেই তা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।

তবে কিছুদিন আন্দোলন চললেও মুসলিমদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আজহা চলে আসায় ২৯শে জুন পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখেন শিক্ষার্থীরা।

এরপর গত ৩০শে জুন থেকে ফের আন্দোলন শুরু করেন তারা এবং পহেলা জুলাই থেকে এই আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় দফা থেকে হিসাব করলে, আজ টানা ১৯ দিন ধরে এই আন্দোলন চলছে।