পহেলা বৈশাখে সংস্কৃতি কর্মীদের অনুষ্ঠান নিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও পুলিশ নাখোশ

ছবির উৎস, RATAN KUMAR DAS
- Author, সৌমিত্র শুভ্র
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
বাংলা নববর্ষের উদযাপনকে ঘিরে প্রতিবছরই বেশকিছু নির্দেশনা দিয়ে থাকে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
কিন্তু, এবার সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বেঁধে দেয়া সময়সীমা না মেনে তাদের বর্ষবরণের অনুষ্ঠান করেছে।
এরপর এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়েছে পুলিশ এবং সাংষ্কৃতিক সংগঠনগুলো। এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রীও।
ঢাকায় পহেলা বৈশাখ উদযাপনের কেন্দ্রে থাকে রমনা পার্ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। এছাড়া, দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে নানা আয়োজনে বরণ করে নেয়া হয় বাংলা নতুন বছরকে।
গত ২৭শে মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পক্ষ থেকে নির্দেশনায় বলা হয়, “রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হাতিরঝিল ও রবীন্দ্র সরোবরসহ দেশে যে সকল অনুষ্ঠান হবে তা সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে শেষ করতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের সকল আয়োজন বিকেল পাঁচটার মধ্যে শেষ করার আহ্বান জানায়।
কিন্তু, এই বাঁধাধরা সময়ের ঘোষণা না মানার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশের অন্যতম পুরনো সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।
পহেলা বৈশাখের সন্ধ্যায় শাহবাগে ‘বর্ষবরণ মানে না শৃঙ্খল' শিরোনামে অনুষ্ঠান আয়োজন করে উদীচী। যে অনুষ্ঠান শুরুই হয় সন্ধ্যা ছয়টায়। অন্যদিকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নিষেধাজ্ঞা ভেঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ৪টা থেকে ৯টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করে।
এ নিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রী, ডিএমপি ও উদীচীকে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও বিবৃতি দিতে দেখা যায়।

ছবির উৎস, BBC/SAUMITRA SHUVRA
বাদানুবাদ কেন
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বিগত বছরগুলোতেও কর্তৃপক্ষের তরফে একই রকম বিধিনিষেধ ছিল। অন্যান্য সংগঠনের মতো উদীচী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সেসব মেনে চলেছে।
তবে, সরকারের কাছে এ সময়সীমার বাধ্যবাধকতা নিয়ে প্রতিবারই আপত্তি জানিয়ে আসছিল এসব সংগঠন।
“সরকার আমাদের কথা শোনেইনি। কয়েক বছর ধরেই সময়ের ঘেরাটোপে এমন একটা বিশাল উৎসবকে সংকুচিত করার পদক্ষেপ নিচ্ছিলো,” বিবিসিকে বাংলাকে বলছিলেন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সহ-সভাপতি জামশেদ আনোয়ার তপন।
“প্রতিবাদ স্বরূপ এবার ছয়টা এক মিনিট থেকে অনুষ্ঠান করেছি।”
নিরাপত্তার অজুহাতে সাংস্কৃতিক আয়োজনকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে, ফলে মত প্রকাশ বা প্রতিবাদের জায়গাও সংকুচিত হচ্ছে বলে অভিযোগ তার।
মি. তপন বলেন, “নিরাপত্তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব। নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে যারা আয়োজন করবেন বা আসবেন তাদের ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া অপারগতারই বহিঃপ্রকাশ।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছয়টার মধ্যে অনুষ্ঠান বন্ধ করার নির্দেশনা জারি করার পর, প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলো সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট।
সংগঠনটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিকেল চারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত নববর্ষের অনুষ্ঠান করেছে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস প্রশ্ন তুলেছেন, ধর্মীয় বা জাতীয় কোন অনুষ্ঠানে সময়ের বিধিনিষেধ না থাকলে সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসবে কেন বাধ্যবাধকতা থাকবে?
তবে, এসব বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন ডিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ ফারুক হোসেন। পুলিশের যথেষ্ট সামর্থ্য আছে বলেই নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি হয় না বলে দাবি তার।
বিবিসি বাংলাকে মি. হোসেন বলেন, “আইনের এখতিয়ারের ভেতরে থেকেই তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠান করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। এর আগে যে সমন্বয় সভার আয়োজন করা হয়েছিল সেখানে সরকারের সিদ্ধান্ত সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়।”
“তারা কেন যে নির্দেশনার বাইরে গেল সেটাও তো আমরা বুঝতে পারছি না,” যোগ করেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ ও মহানগর পুলিশ বিধিমালা অনুযায়ী সমাবেশ বা মিছিল করার অনুমতি দেয়া বা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে পুলিশ কমিশনারকে।
উদীচীর সহ-সভাপতি বলছেন, "সংকুচিত করার চেষ্টা চলতে থাকলে" এরপর আরও বড় পরিসরে এমন আয়োজন করবেন তারা।
“মানুষ কিন্তু ঘরে ঢোকে নাই, মানুষ কিন্তু বাইরেই ছিল,” বলেন মি. তপন।
তবে, পুলিশের মুখপাত্রের বক্তব্য, "এবার ছাড় দেয়া হয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতে আর ছাড় দেয়া হবে না।"
End of বর্ষবরণ সংক্রান্ত আরও খবর:

ছবির উৎস, RATAN KUMAR DAS
পুলিশ বলছে বিব্রতকর
উদীচীর এই প্রচেষ্টা “বিব্রতকর” আখ্যা দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।
সোমবার রাতে ডিএমপি’র মিডিয়া সেন্টার থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয় গণমাধ্যমগুলোতে। আজ সেটি ডিএমপি নিউজেও প্রকাশ করা হয়েছে “বাংলা নববর্ষ উদযাপনে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজন এবং নিরাপত্তা প্রসঙ্গে ডিএমপির বক্তব্য” শিরোনামে।
এতে বলা হয়, “নিরাপত্তা বিধানে প্রদত্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা না মেনে তার বিরোধিতা করে অনুষ্ঠান করা খুবই দুঃখজনক এবং উদীচীর মতো প্রগতিশীল একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের নিকট থেকে যা কখনো কাম্য নয়।”
১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার কথাও উল্লেখ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে। এরপর রমনা বটমূলে বোমা হামলা থেকে শুরু করে হলি আর্টিজান রেঁস্তোরার ঘটনা পর্যন্ত উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “হামলা প্রতিরোধ করতে ও জনগণের জীবন বাঁচাতে গিয়ে পুলিশের অনেক সদস্য জীবন দিয়েছেন”।
“পুলিশ প্রতিটি অনুষ্ঠানে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে সদা সতর্ক থাকায় পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে কোন জঙ্গি হামলা বা সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটতে পারে নাই।”
“অতীতেও ঊদীচীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে উগ্রবাদী হামলার ইতিহাস রয়েছে বিধায়” সংস্কৃতিকর্মী ও জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে ভবিষ্যতে দেয়া নিরাপত্তামূলক নির্দেশনার মেনে চলার আহ্বানও জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।

‘দুর্ঘটনা ঘটলে দায়-দায়িত্ব কে নিতো?’
সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উদীচী অনুষ্ঠান করায় পুলিশের পাশাপাশি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা, বাসসের খবরে বলা হয়েছে, প্রতিমন্ত্রী প্রশ্ন রেখেছেন, “সেখানে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটতো তার দায়-দায়িত্ব কে নিতো?”
নিয়ম বা নির্দেশ না মেনে অনুষ্ঠান যারা করবেন তাদেরকেই সেই দায়-দায়িত্ব নিতে হবে বলে মনে করেন মি. আরাফাত।
“নির্দেশনা উপেক্ষা করে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অনুষ্ঠান করা ছিল হঠকারী ও দুঃখজনক। তাদের এই আচরণে সরকার খুবই ব্যথিত ও মর্মাহত।”

ছবির উৎস, PID
উদীচী ও সাংস্কৃতিক জোট যা বলছে
তথ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে মঙ্গলবার একটি বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
বাংলা বর্ষবরণকে এই ভূখণ্ডের “সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব” হিসেবে উল্লেখ করে ওই বিবৃতি বলা হয়, “বহু বছর ধরে এ উৎসবের বিরুদ্ধে মৌলবাদী, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী নানা ধরনের অপপ্রচার ও কুৎসা রটিয়ে চলেছে।”
পয়লা বৈশাখের আগের দিন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, “বর্ষবরণের আয়োজনে সুনির্দিষ্ট কোনো হামলার আশঙ্কা নেই।”
তারপরও, “নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের সাথে মৌলবাদী, ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর অবস্থানের সাযুজ্য রয়েছে বলে মনে করে উদীচী।”
তাদের মতে, এটি সাম্প্রদায়িক অপশক্তির কাছে একরকম আত্মসমর্পণ।
অন্যদিকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমরা মনে করি না আইন ভেঙেছি। কোনো জাতীয় দিবস, কোনো ধর্মীয় উৎসবে সময়ের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। তাহলে সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসবে কেন বাধ্যবাধকতা থাকবে?”
পহেলা বৈশাখের আয়োজন ঘিরে একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অপপ্রচার আছে উল্লেখ করে গোলাম কুদ্দুস বলেন, ''সেই অপপ্রচারের কারণে অধিক নিরাপত্তার জন্য সময়টাকে ছোটো করে আনলে বরং যারা বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, প্রকারান্তরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, তারাই উৎসাহিত হবে।''

ছবির উৎস, FACEBOOK/Bangladesh Udichi Shilpigosthi
বাংলা নববর্ষ ঘিরে নিরাপত্তার কড়াকড়ি শুরু হয় দেশটিতে জঙ্গি তৎপরতা শুরু হওয়ার পর থেকে। তবে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও গত কয়েক বছর ধরেই সন্ধ্যার মধ্যে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান শেষ করার জন্য তাগিদ দেয়া হয় পুলিশ ও প্রশাসনের তরফ থেকে।
বর্ষবরণে সবচেয়ে হামলার বড় ঘটনা ঘটেছিল ২০০১ সালে।
ঢাকার রমনা পার্কে প্রতি বছর সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের পক্ষ থেকে বর্ষবরণের যে আয়োজন করা হয়, ২০০১ সালে সেই রমনা বটমূলে ছায়ানটের বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চলার সময় মঞ্চের কাছেই বোমা বিস্ফোরণ ঘটে।
এই ঘটনায় কমপক্ষে দশ জন নিহত এবং আরো অনেকে আহত হন।
এছাড়া ১৯৯৯ সালের ছয়ই মার্চ উদীচীর সমাবেশে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত এবং ১৫০ জনের মত আহত হয়েছিল।
উদীচীর সমাবেশে বোমা হামলার সাথে জঙ্গী সংগঠনের সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন সূত্র থেকে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।
২০০৭ সালে হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবরাখবর বের হয়।
যদিও সেই হামলার জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত বা বিচার কাজ ২৫ বছরেও শেষ হয়নি।








