ভারতের গুজরাট উপকূলের কাছে উদ্ধার রেকর্ড পরিমাণ মাদক

ছবির উৎস, X/@INDIANNAVY
ভারতের পোরবন্দর উপকূলে যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩,৩০০ কেজি মাদকদ্রব্য বাজেয়াপ্ত করেছে ভারতীয় নৌবাহিনী ও নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি)। নৌবাহিনী বলছে, এই অভিযানে ৩০৮৯ কেজি চরস, ১৫৮ কেজি মেথামফেটামিন বা মেথ এবং ২৫ কেজি মরফিন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবারের ওই অভিযানের কথা ভারতীয় নৌবাহিনী সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) জানিয়েছে।
ভারতীয় নৌবাহিনী জানিয়েছে, নজরদারির জন্য ব্যবহার করা পি৮আই এলআরএমআর বিমান প্রথমে এ বিষয়টির তথ্য দেয় তাদের। মাদক পাচারের বিষয়টিকে নিশ্চিত করে নারকোটিক্স ব্যুরো।
এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে সন্দেহজনক একটি নৌকার দিকে ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হয়েছিল।
তার কিছুক্ষণ পরই ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ সন্দেহভাজন ওই নৌকাটিকে আটক করে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, X/@INDIANNAVY
নৌবাহিনী জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করা মাদকের পরিমাণের নিরিখে এটাই সবচেয়ে বড় অভিযান। গুজরাট উপকূলে জল-সীমারেখার কাছে সন্দেহজনক নৌকাটিকে আটক করা হয়।
নৌকাটি এবং সেটির নাবিকদের ভারতীয় বন্দরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বৃহত্তম মাদক উদ্ধার অভিযান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো, ভারতীয় নৌবাহিনী ও গুজরাট পুলিশকে এই অভিযানের সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গুজরাটের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হর্ষ সাংভি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, "প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বে এই অভিযান মাদকমুক্ত ভারতের প্রতিশ্রুতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
এনসিবির ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল (অপারেশনস) জ্ঞানেশ্বর সিং এই মাদক অভিযানের ব্যাপারে বিশদ তথ্য দিয়েছেন।
“ভারতীয় নৌবাহিনী, এনসিবি এবং গুজরাট পুলিশের সন্ত্রাস দমন শাখা বা এটিএস যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩,৩০০ কেজি মাদক উদ্ধার করেছে। বাজেয়াপ্ত করা মাদকের পরিমাণের দিক থেকে এটাই দেশের বৃহত্তম অভিযান। বাজেয়াপ্ত করা মাদকের মধ্যে সব থেকে বেশি পরিমাণে আছে চরস ও হাশিশ।“
“এ ঘটনায় সন্দেহভাজন পাঁচজন বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বুধবার সকালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অমিত শাহ এই অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য এনসিবি, নৌবাহিনী এবং এটিএস গুজরাটকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।”
সংবাদ সংস্থা হিন্দুস্তান টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে ভারতীয় নৌবাহিনীর সহযোগিতায় এনসিবি তিনটি অভিযান চালিয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গুজরাট উপকূলে ২২১ কেজি মেথামফেটামিন বা মেথ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।
এর পর ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে কেরালা উপকূলে ২০০ কেজি হেরোইন বাজেয়াপ্ত করা হয়। গত বছরের মে মাসে পাকিস্তান থেকে আসা একটি জাহাজ থেকে ২৫০০ কেজি মেথামফেটামিন বা মেথ বাজেয়াপ্ত করেছিল এনসিবি।

ছবির উৎস, X/@SANGHAVIHARSH
গুজরাটে মাদক কোথা থেকে আসে?
গত কয়েক বছরে জাতীয় ও রাজ্য স্তরের বিভিন্ন এজেন্সি গুজরাট থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক বাজেয়াপ্ত করেছে।
মাদক উদ্ধারের এইসব অভিযান মূলত চালানো হয়েছে কচ্ছ, জামনগর, সৌরাষ্ট্রের উপকূলবর্তী কয়েকটি এলাকা এবং দক্ষিণ গুজরাটের কিছু জায়গায়।
কচ্ছ এলাকার গান্ধীধাম থেকে কিছুটা দূরে মিঠি রোহর নামের একটি গ্রামের সমুদ্র তীর থেকে ২০২৩ সালে প্রায় ৮০ কেজি কোকেন উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ।
এর আগে ২০২১ সালে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) মুন্দ্রা বন্দর থেকে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা মূল্যের তিন হাজার কেজি মাদক বাজেয়াপ্ত করেছিল।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এত বড় বড় মাদকের চালান গুজরাট উপকূলে কীভাবে পৌঁছায় এবং কারাই বা এই মাদক চোরাচালানের প্রচেষ্টা চালায়?
নিরাপত্তা এজেন্সিগুলির দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে গুজরাটে উদ্ধার হওয়া মাদকের উৎপত্তিস্থল পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা ইরান।
অর্থ মন্ত্রকের গোয়েন্দা বিভাগ ডিরেক্টরেট অফ রেভেনিউ ইন্টেলিজেন্স, ডিআরআই সূত্রে খবর, তদন্তে আফগান নাগরিকদের নামও উঠে আসছে।
আফগানিস্তানে ক্ষমতার পালাবদলের কারণেই মাদক চোরাচালান বেড়েছে কি না, সেদিকে নজর রাখছে এজেন্সিগুলো।
আফিম চাষী ও চোরাকারবারিদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি তালেবানের আয়ের একটি বড় উৎস।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত দপ্তরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের মোট আফিম উৎপাদনের ৮০ শতাংশই হয় আফগানিস্তানে। সেই আফিমই পরিশোধন করে হেরোইন-সহ নানা মাদক তৈরি করা যায়।
ভারতের নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচ গ্রাম পর্যন্ত হেরোইন ধরা পড়লে সেটিকে ‘স্বল্প পরিমাণ’ বলেই ধরে নেওয়া হয়।
আবার, ২৫০ গ্রাম বা তার বেশি ওজনের হেরোইনকে ‘বড় পরিমাণ’ বলা হয় এবং ওই চালান বিক্রি করার জন্যই আনা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।
কয়েক বছর আগে পর্যন্ত গুজরাটের সালায়া, ওখা, মান্ডভি ও সৌরাষ্ট্র বন্দর থেকে সোনা, ঘড়ি বা বৈদ্যুতিন সামগ্রী পাচার হত। এর জন্য 'ধও' নামের ছোট দেশীয় জাহাজ ব্যবহার করা হত।
পোরবন্দরের গোসাবারা বন্দরে ১৯৯৩ সালে আরডিএক্স বিস্ফোরক আনা হয়েছিল, যা পরে মুম্বাই বিস্ফোরণে ব্যবহৃত হয়েছিল।
গত কয়েক বছর ধরে গুজরাটকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কিছুদিন আগেও কচ্ছ, পাঞ্জাব ও রাজস্থানের সীমান্ত দিয়ে সুড়ঙ্গ বা পাইপের মাধ্যমে ভারতে মাদক পাচার করে আনা হত।
গুজরাটে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা রয়েছে, যা ভারতের অন্য যে কোনও রাজ্যের তুলনায় দীর্ঘতম।
গুজরাটে ৩০ হাজারেরও বেশি নৌকা ও ছোট নৌযান নথিভুক্ত রয়েছে। ফলে উন্মুক্ত সমুদ্রে আন্তর্জাতিক জলসীমায় সেগুলির চলাচলের ওপরে নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির দেওয়া খবর, জেলেদের মধ্যে থেকে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে খবর জোগাড় করা ছাড়াও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে ভারতের দিকে আসা জাহাজগুলির ওপরে নজরদারি চালায় নিরাপত্তা এজেন্সি, নৌবাহিনী এবং উপকূলরক্ষী বাহিনী।

ছবির উৎস, Getty Images
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
কারা মাদক পাঠায়, কারা কেনে?
গুজরাট সন্ত্রাস দমন বাহিনীর ডেপুটি পুলিশ সুপার ভবেশ রোজিয়া কিছুদিন আগে বিবিসিকে বলেছিলেন, গুজরাট থেকে যেসব মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, সেগুলো মূলত উত্তর ভারতে পাচারের জন্য আনা হয়।
তার কথায়, “গুজরাটে মাদক পৌঁছানোর পর তা মূলত নানা ব্যক্তির মাধ্যমে দিল্লি ও পাঞ্জাবে নিয়ে যাওয়া হয়। গুজরাটে মাদক পৌঁছনর পরে বাস, ট্রেন বা গাড়িতে করে তা বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।“
বাজেয়াপ্ত হওয়া মাদক গুজরাটের কোনও একজন ব্যক্তির কাছে যায় না। প্রতিবারই ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি মাদক আনিয়ে সেগুলো আবার গুজরাটের বাইরে পাচার করার জন্য আলাদা আলাদা ব্যক্তিকে ব্যবহার করা হয়।
সম্প্রতি গুজরাট সন্ত্রাস দমন বাহিনী এবং উপকূলরক্ষী বাহিনীর যৌথ অভিযানে ভারতের জলসীমার অভ্যন্তর থেকে ২৮০ কোটি টাকার হেরোইন বাজেয়াপ্ত করা হয়।
গুজরাট এটিএস জানিয়েছে, পাকিস্তানের মাদক মাফিয়া মুস্তাফা 'আল হাজ' নামের একটি নৌকায় করে পাকিস্তান থেকে কোটি কোটি টাকা মূল্যের মাদক পাঠিয়েছিল।
ওই মাদকের চোরাচালানটি গুজরাট হয়ে উত্তর ভারতে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। গুজরাট সন্ত্রাস দমন বাহিনী আগেই এই বিষয়ে তথ্য পেয়েছিল। তারা উপকূলরক্ষী বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে মাঝপথে সেই নৌকাটি ধরে ফেলে।
উপকূলরক্ষীরা নৌকাটি ঘিরে ফেললে চালক পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়ে যায়।
নৌকাটিতে হেরোইন-সহ নয় জন পাকিস্তানি নাগরিকও ছিলেন। এটিএস ও এনসিবি আলাদা আলাদা দল গঠন করে উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ওই পাচারের ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে।








