ইতিহাসের সাক্ষী: কীভাবে হেরোইন মাদকের মহামারি ঠেকিয়েছিল সুইৎজারল্যান্ড

ছবির উৎস, Getty Images
ইউরোপে একসময় যে মাদক মহামারির মত ছড়িয়ে পড়েছিল তা হলো হেরোইন। ১৯৯০এর দশকে সুইৎজারল্যান্ডেও হেরোইনের নেশার ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছিল।
কিন্তু সুইৎজারল্যান্ড এই সমস্যা মোকাবিলা করেছিল অভিনব উপায়ে ।
সেখানে চালু করা হয়েছিল নেশাগ্রস্তদের নিরাপদে হেরোইন ইনজেকশন দেবার কক্ষ, এমনকি ছিল প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে বিশুদ্ধ হেরোইন পাবার ব্যবস্থা। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে এই নতুন কৌশলের ফলে নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছিল অতিরিক্ত হেরোইন সেবন করে মৃত্যুর ঘটনা, এইচআইভি সংক্রমণ এবং নতুন হেরোইনসেবীর সংখ্যা।
পরে ২০০৮ সালে এসব পরিবর্তনকে আইনে পরিণত করে স্থায়ী রূপ দেয়াও হয়েছিল।
সেই ঘটনা সম্পর্কে জানতে বিবিসির জ্যাক ব্রফি কথা বলেছেন সুইৎজারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট রুথ ড্রাইফাস এবং একজন চিকিৎসক আন্দ্রে সাইডেনবার্গের সাথে - যিনি দীর্ঘকাল কাজ করেছেন মাদকাসক্তদের নিয়ে। আন্দ্রে সাইডেনবার্গ বলছিলেন, ডাক্তারি পড়ার আগে তিনি নিজেও এক সময় মাদকসেবী ছিলেন।
"আমার মনে হয়, এমন কোন মাদক নেই যা আমি সেবন করিনি। আমার মাদকসেবী বন্ধুদের এ জন্য গভীর সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। আমিও হয়তো সমস্যায় পড়তাম - কিন্তু আমি সৌভাগ্যক্রমে তা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। এর পর আমি ডাক্তারি পড়তে শুরু করি। এর পর কখনো কখনো এমন হয়েছে আমার রোগীদের মধ্যেও কেউ কেউ ছিল আমারই পুরোনো বন্ধু।"
আন্দ্রে সাইডেনবার্গ ১৯৭০এর দশক থেকে মাদক ও মাদকসেবীদের নিয়ে কাজ করে আসছেন। সেসময় হেরোইন সেবন হয়ে উঠেছিল সুইৎজারল্যান্ডের এক বড় সমস্যা। প্রথম সরকার পুলিশী অভিযান এবং মাদকসেবীদের চিকিৎসা করে এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাতে কোন কাজ হচ্ছিল না।
সুইৎজারল্যান্ডে মাদকের নেশা এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে ১৯৮০র দশকের শেষ দিকে কিছু স্থানীয় কাউন্সিল প্রকাশ্য স্থানে মাদক সেবনের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।
এসব জায়গার নাম হয়েছিল নিডল পার্ক, বা সুঁই ফোটানোর উদ্যান। এর মধ্যে জুরিখের প্লাৎসবিক্স একটি পার্ক ছিল অতি কুখ্যাত।
"প্রথমে দেখা গেল সেখানে কয়েকশ লোক মাদক নিচ্ছে। তার পর দেখা গেল প্রতিদিন কয়েক হাজার লোক ওই পার্কে হেরোইন সেবন করতে সমবেত হচ্ছে।তারা নেশা করছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাদক বেচাকেনা ও অন্য আরো নানাকিছু করছে। সে এক ভয়াবহ দৃশ্য।"
"এর ফলে ব্যাপকভাবে এইচআইভি ছড়িয়ে পড়লো, অনেককে দেখা যেতো ওই পার্কেই মরে পড়ে আছে। সব মিলিয়ে এক যাচ্ছেতাই পরিস্থিতি।"
"কিছু লোক যেমন ওই পার্কের মধ্যেই মারা যাচ্ছিল, অন্য কিছু লোক মারা যাচ্ছিল পার্কের আশপাশেই, যেমন কোন গলির কোণায় বা এরকম জায়গায়। সে ছিল এক দুঃখজনক অবস্থা।"
সে সময় ডা. সাইডেনবার্গ ছিলেন একজন প্রথম সারির স্বাস্থ্যকর্মী। তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিকে চ্যালেঞ্জ করলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
তারা মাদকসেবীরা যাতে চিকিৎসা সেবা পেতে পারে তা নিশ্চিত করতে কাজ করলেন। এমনকি মাদকসেবীদের জন্য নিরাপদ জীবাণুমুক্ত সূঁচের ব্যবস্থা করলেন। সেসময় এইচআইভি সংক্রমণ ঠেকাতে এটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
"সেই সুঁই ফোটানোর পার্কে গেলে আপনি দেখতেন মাদকসেবীদের মধ্যে সমাজের সব স্তরের লোকই সেখানে আছে। বড়লোকরা আছে ,গরিবরাও আছে। সু্স্থ লোকেরা যেমন আছে, তেমনি একেবারে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এমন মাদকসেবীরাও আছে। হয়তো দেখবেন ধনী এবং স্বাস্থ্যবান লোক - যে হয়তো দিনের বেলা কোন ব্যাংকে চাকরি করে, - সে-ও হেরোইন কিনতে ওই পার্কে এসেছে। "
১৯৮০র দশকের শেষ দিকে ২০০ লোক এইডসে মারা গিয়েছিল - যাদের মধ্যে পেশাজীবী লোকেরাও ছিল। সে সময় সুইৎজারল্যান্ডে এইচআইভি-এইডস সংক্রমণের হার ছিল পশ্চিম ইউরোপের সর্বোচ্চ।
পৃথিবীর অন্যতম ধনী সমাজ সুইৎজারল্যান্ডের ভেতরে তখন যেন এক গভীর অন্ধকার নেমে এসেছিল - এমন কেউই ছিল না যার জীবনে এই মাদক সংকটের স্পর্শ লাগেনি।
"আমার এক বন্ধু ছিল, তার ছেলে মারা গিয়েছিল অতিরিক্ত মাদক সেবনের ফলে। সে দুই বছর ধরে চেষ্টা করেছিল হেরোইনের নেশা ছাড়ার।"
"তখন আমরা নেশার বিস্তার প্রতিরোধ করতেও ব্যর্থ হয়েছিলাম, ব্যর্থ হয়েছিলাম মাদকাসক্তদের চিকিৎসা দিতেও । মাদকাসক্তির ব্যাপকতার মুখে আমরা আসলে অসহায় হয়ে পড়েছিলাম।"
কথা হয় রুথ ড্রেইফাসের সাথে - যিনি সুইৎজারল্যান্ডের একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট। ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকে তিনি ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সেই সময় ডা. সাইডেনবার্গের মত যারা সরকারি নীতিতে পরিবর্তনের কথা বলছিলেন - তাদের বক্তব্য তখন নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছাচ্ছিল। তা ছাড়া রুথ ড্রেইফাস নিজেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর সমর্থক ছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি বলছিলেন - "তখন এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে ফেডারেল স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মাদকনিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়নকারী হিসেবে আমাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে আসতে হবে। যাদের সাথে আসলে জনগণের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল - তারা বলছিলেন যে, অতীতে আমরা যেভাবে কাজ করেছি তা আর চলবে না, আমাদের নতুন কিছু পন্থা নিতে হবে।"
সুইস সরকার ১৯৯১ সালে একটি নতুন জাতীয় নীতি গ্রহণ করলো। এতে অপরাধপ্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর হবার কথা ছিল, আর ছিল মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিভঙ্গী নেবার কথা। এটা পরিচিত হলো চার-স্তম্ভবিশিষ্ট নীতি হিসেবে।
এর মধ্যে একটি স্তম্ভ হচ্ছে আইনের প্রয়োগ। কিন্তু বাকি তিনটি নীতি ছিল, মাদকপ্রতিরোধ, ক্ষতি কমিয়ে আনা, আর চিকিৎসা। মাদকসেবীদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী নেয়াটাই ছিল এর ভিত্তি।
তবে সুইৎজারল্যান্ডের ফেডারেল প্রশাসনিক কাঠামো যেহেতু ব্যাপকভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে, তাই অনেক সিদ্ধান্তই সেখানে নেয়া হয় গণভোটের ভিত্তিতে। কোন নতুন নীতি নেয়া হলে তার ব্যাপারে প্রতিটি কাউন্টি বা শহরকে রাজী করাতে হয়।
"আমি এজন্য যে প্রচারাভিযানগুলো হচ্ছিল তাতে জড়িত ছিলাম। আমি দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত গেছি। লোকদের বুঝিয়েছি কেন আমরা এটা করছি, এতে কি ফল পাওয়া যাবে, এবং এক্ষেত্রে মাদকসেবীদের খারাপ চোথে দেখা মানসিকতা ত্যাগ করার জন্য জনসাধারণের দায়িত্বটা কি।"
"তাদের বলেছি, যারা মাদকাসক্ত তাদেরকে রোগাক্রান্ত মানুষ হিসেবে দেখতে হবে - তাদের যত্ন নিতে হবে।"
তাদের পরিকল্পনার সবচেয়ে বিতর্কিত দিক ছিল হেরোইন এ্যাসিস্টেড থেরাপি বা এইচ এ টি। এর অধীনে আসক্তদের প্রেসক্রিপশনের অধীনে বিশুদ্ধ হেরোইন দেয়া হতো, এবং বিশেষায়িত ক্লিনিকে তা নিরাপদভাবে তাদের দেহে ইনজেকশন আকারে দেয়া হতো।

ছবির উৎস, Getty Images
এর লক্ষ্য ছিল কালোবাজারে যে দূষিত হেরোইন পাওয়া যেতো তা থেকে তাদের দূরে রাখা। সুইৎজারল্যান্ডে প্রথম এইচ এ টি ক্লিনিক খুলেছিল ১৯৯৪ সালে। এই সেবা পাবার ক্ষেত্রে রোগীদের কড়া নিয়মকানুন মেনে চলতে হতো। তাদেরকে চাকরি এবং বাসস্থান পাবার জন্য সহায়তা দেয়া হতো।
"প্রথমে আমি এখানে আসতে চাইনি। আমি ভেবেছিলাম এটা একটা অত্যন্ত খারাপ একটা ব্যাপার। কিন্তু আমি ছিলাম একজন মাদকাসক্ত। তার পরও আমি একটা চাকরি পেলাম।"
"আর সবার মতই আমি সকালে উঠি , কাজে যাই, অফিসে আমার কাজ ঠিকমত করি। সপ্তাহ শেষে আমার দুই ছেলেকে নিয়ে একজন স্বাভাবিক পিতার মতই আমার জীবন কাটে।"
এইচএটি কর্মসূচিটি চালু হয়েছিল বৈজ্ঞানিকের অনুসন্ধিৎসা নিয়ে। কিন্তু এর ফলাফল ছিল আশাব্যঞ্জক। যদিও সুইজারল্যান্ডের কিছু কিছু অঞ্চলে এর বিরোধিতা করা হচ্ছিল।
"ওরা মনে করছে, মাদক আইন উদার করা হলে তা এই সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু তা ঠিক নয়। এই হেরোইন কর্মসূচি হচ্ছে সব রকম মাদকের ব্যবহার উন্মুক্ত করে দেবার প্রথম ধাপ। এখন পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাদের খুশি হবারই কথা।"
কিন্তু কিছুদিন পর উপাত্তগুলো থেকে নিশ্চিত আভাস পাওয়া যেতে লাগলো।
পরীক্ষামূলক এইচ এ টি কর্মসূচি নিরাপদ ইনজেকশন কক্ষ ইত্যাদির ফলে অতিরিক্ত মাদক সেবনে মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেক কমে গেল। একই সাথে এইচ আই ভি সংক্রমণ ৬৫ শতাংশ কমে গেল। আর নতুন হেরোইন আসক্তির সংখ্যা কমে গেল ৮০ শতাংশ। ড. সাইডেনবার্গ সারাজীবন ধরে যে কাজ করছিলেন - তা যে সঠিক ছিল তা প্রমাণিত হলো।

ছবির উৎস, Getty Images
"একদিক থেকে এটা গর্বিত হবার মতই ব্যাপার। কিন্তু মানুষ যে আবার তাদের স্বাস্থ্য ফিরে পাচ্ছে, স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবার কথা ভাবছে - এটাই আসল ব্যাপার। তা ছাড়া মাদকাসক্তদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি লোকই এটা অর্জন করতে পেরেছিল - স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেয়েছিল। তারা নেশার কারণে মারা যাচ্ছিল না। এটা আমাকে আনন্দ দেয়।"
তবে এ পরিকল্পনার শেষ পর্বটা ছিল রাজনৈতিক। এই নীতি নিয়ে ২০০৮ সালে একটি জাতীয় গণভোট হয়। সুইস ভোটারদের দুই তৃতীয়াংশই এই বৈপ্লবিক চার-স্তম্ভ বিশিষ্ট পরিকল্পনার পক্ষে ভোট দেয় - এটা পরিণত হয় ফেডারেল আইনে।
এই রাজনৈতিক ঐকমত্য অর্জন করতে সময় লেগেছে ঠিকই - তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট রুথ ড্রেইফাসের জন্য সেই পরিশ্রম ছিল সার্থক।
"একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক অর্জন হচ্ছে মানুষের জীবন বাঁচাতে ভুমিকা রাখতে পারা। এ ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই হয়েছিল।"
রুথ ড্রেইফাস এখন মাদকসংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে একজন বৈশ্বিক কমিশনার।
আর ডাক্তার আন্দ্রেই সাইডেনবার্গ এখন অবসর জীবন যাপন করছেন।








