আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
শহরাঞ্চলে বিশুদ্ধ বা সুপেয় পানির সঙ্কট কীভাবে সামাল দিচ্ছে বাসিন্দারা?
- Author, আফরোজা নীলা
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
ধরুন আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুতে গেলেন, কিন্তু দেখলেন কল দিয়ে বের হচ্ছে ময়লা পানি বা দুর্গন্ধযুক্ত পানি। সেই সময় কেমন লাগবে আপনার?
এইরকম পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করলেও কতটা আশ্বস্ত হবেন?
হয়তো পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অনেকে এমন পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করবেন, আবার অনেকে হয়তো বাইরে থেকে বিশুদ্ধ পানি কিনে আনবেন।
কিন্তু শহরাঞ্চলে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষ যারা লাইনে ময়লা পানি আসার অভিযোগ করেন, তারা কীভাবে এমন পরিস্থিতি সামাল দেন?
“একমাসের মধ্যে পনের দিনই থাকে না পানি। আর ওই পানির কথা আর কী কইয়াম?” – বলছিলেন কড়াইল বস্তিতে দশ বছর ধরে বসবাসরত মায়া।
বিশুদ্ধ পানির চাহিদা দিনে দিনে বাড়ছে
পানি মানুষের জীবনের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু বিশ্বের অনেক মানুষ এখনও পর্যাপ্ত পানি পায় না। বিশেষ করে বিশ্বের অনেক দেশেই বিশুদ্ধ পানির অভাব রয়েছে ।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের যে লক্ষ্যগুলো রয়েছে তার মধ্যে ছয় নাম্বারে রয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে সব মানুষের জন্য সুপেয় বা বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হবে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে প্রতি বছর ২২শে মার্চ পালন করা হয় পানি দিবস।
বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৮ ভাগ মানুষের আওতার মধ্যে পানির কোনও উৎস রয়েছে৷ কিন্তু এর সবটাই পানযোগ্য নয়৷
বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির যেসব উৎস রয়েছে সেগুলোও আস্তে আস্তে দূষিত হয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা ৮০ শতাংশ পানিতে ক্ষতিকর জীবাণু ই-কোলাই রয়েছে। পুকুরের পানিতেও একই মাত্রায় এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে৷ যথাযথ স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় পানি দূষিত হয়ে পড়ার অন্যতম একটি কারণ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশুদ্ধ বা সুপেয় পানির দাবিতে নানা ধরনের কর্মসূচি পালনের চিত্রও দেখা যায় কিছুদিন পরপর।
‘ময়লা পানি খাওয়ানো লাগে পোলাপানরে’
ঢাকায় পানি সরবরাহ ও পয়:নিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ বা ওয়াসার সরবরাহ করা পানি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অভিযোগ শোনা যায় বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের কাছ থেকে।
“পানির কারণে ভাতের রঙ বদলে যায়। ওয়াসার পানি আসে কল দিয়ে কখনও হলুদ, কখনও কালো। আর গন্ধ অনেক। এভাবেই বেঁচে থাকতে হবে আমাদের”- বলছিলেন ঢাকার জুরাইনের বাসিন্দা সীমা খন্দকার।
জুরাইনে এই পানির ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার নাগরিক অধিকার কর্মী মিজানুর রহমান জানালেন- সেই এলাকার পরিস্থিতি একটুও বদলায়নি।
“পরিস্থিতি আগের মতোই আছে। ওরা জরিপ চালায়ে গেছে নতুন লাইন লাগানোর জন্য। কিন্তু তাও এক-দেড় বছর হয়ে গেল। যখন কেউ অভিযোগ করে তখন আনঅফিশিয়ালি বলে আপনারা নিজেরা ডিপ টিউবওয়েল লাগায়ে নেন”- বলেন মি. রহমান।
"ইচ্ছে করে ওয়াসা পানির চাপ এলাকায় কমায়ে রাখে" বলে অভিযোগও করেন মিজানুর রহমান।
“মাঝেমধ্যে দেখতে ভালো পানি পাই, কিন্তু মাঝেমধ্যে কালো পানি বা অন্যরকম ময়লা পানি। আমাদের প্রশ্ন হলো একই লাইনে একেক সময় একেক রকম পানি আসে কীভাবে। ওরা পানির চাপ বাড়ায়ে দিলে ময়লা পানিটা আর লাইনে আসতে পারে না। কিন্তু পানির চাপ কম থাকলেই দুর্গন্ধযুক্ত পানি পাই। ড্রেনের পানি যেমন ওয়াসার পানি সেরকমই পাচ্ছি। প্রায় জায়গাতে আসছে এরকম”- বলছিলেন তিনি।
ওয়াসার সরবরাহ করা পানির এমন মান নিয়ে জুরাইনের বাসিন্দাদের এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়।
পানিতে দুর্গন্ধ বা নোংরা বা কালো রঙের পানি এমন সমস্যার কথা জানা গেছে গ্রিন রোড, বাসাবো, মুগদা, পল্লবীসহ ঢাকার কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের কাছ থেকেও।
তাদের একজন নাঈমা করিম জানান, পানির সমস্যায় কখনও তিনি লিটার ধরে পানি কিনে আনেন আবার কখনও কারো বাসা খোঁজেন যেন ভালো পানি দিয়ে গোসল করে আসতে পারেন।
তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা।
রাজধানীর কড়াইল বস্তির বেশিরভাগ বাসিন্দার অভিযোগ, ময়লা পানি খাওয়ানোর কারণে অনেক সময় ছোট ছোট শিশুদের অসুখ লেগেই থাকে।
বিবিসির সাথে আলাপকালে মায়া নামে একজন বলছিলেন “পানিতো আর ঠিকমতোন পাই না। এখান থেকে ওইখান থেকে খুইজ্যা খাওন লাগে পানি। আর পানির মধ্যে মইলাতো আছেই। আর পানি যে ফুটামু গ্যাসই থাকে না ঠিকমতো। পানি ফুটায়ে খামু ক্যামনে? ময়লা পানি খাওয়ানো লাগে পোলাপানরে”।
একই ধরনের অভিযোগ জুলহাস নামের এক রিকশাওয়ালার, তিনি বলেন “পানির মধ্যে আহে ময়লা। পানি ফুটায়ে খাইতেও পারি না সবসময়। পোলাপাইনের প্রায়ই অসুখ লাইগা থাকে, পাতলা পায়খানা হয়, জ্বর আসে। কোনও কোনও সময় পানি ফুটায়া খাইতে পারি। রাতের বেলা পানি ফুটাই”।
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
বিশ্লেষকরা বলছেন, পানি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে এমন সব সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং বছরের পর বছর ধরে এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ওয়াসার পানি মনিটরিং সিস্টেমে যেমন সমস্যা আছে এর পাশাপাশি বাসা-বাড়ির মালিকদেরও কিছুটা দায়বদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. তানভীর আহমেদ।
তিনি বলেন “পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত পানি সুপেয় বা বিশুদ্ধ পানি হওয়া উচিত। যেটা ফুটিয়ে খাওয়া যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের শহরগুলোতে এটা হচ্ছে না। বিশেষ করে ঢাকা শহরে । পানির লাইনগুলোতে কোনো ময়লা ঢুকে পড়লে সেই পানিকে আর সুপেয় বা বিশুদ্ধ বলা যাবে না। অনেক সময় ওয়াসার পুরনো লাইনে সমস্যা থাকে।
আবার অনেক সময় বাসার লাইনের ট্যাঙ্ক বা রিজার্ভ ট্যাঙ্কও কিন্তু অনেক বাড়ির মালিক পরিস্কার করান না। ফলে সেখান থেকে ময়লা পানি পেতে পারেন বাসিন্দারা।”
এছাড়া বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন, পাইপলাইনে সংস্কার কাজ চলার কারণে পানির লাইনে ময়লা ঢুকে যেতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “পাইপলাইনে কাজ করার সময় কনটামিনেশন হতে পারে। এছাড়া রিজার্ভ ট্যাঙ্কি ময়লা থাকার কারণে মানুষ ময়লা পানি পেতে পারে। নয়তো ওয়াসার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টগুলো আমি ঘুরে দেখেছি।পানি নিয়ে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে, সব ঠিক পাওয়া গেছে”।
ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ঢাকাসহ অন্যনা অঞ্চলে সুপেয় পানি সংকটের অন্যতম কারণ হলো ভূগর্ভস্থ স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ পানির চাহিদা বাড়ছে। আর যে হারে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নামছে, সে হারে পানির স্তর পূরণ হচ্ছে না।
বর্ষার মৌসুমে বাংলাদেশের বেশিরভাগ জায়গায় পানির ভূগর্ভস্থ স্তর স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসলেও ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল ও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক পর্যায়ে আসে না বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সে কারণে এসব অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট বেড়েই চলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে অতিদ্রুত কাজ করা উচিত।
পানি বিশেষজ্ঞ ড. তানভীর আহমেদ মনে করেন, পানি সরবরাহে ওয়াসার মনিটরিং সিস্টেম কার্যকর করতে হলে বিদেশি সফল মডেলগুলোকে অনুসরণ করতে হবে। এই সিস্টেমটা যেন ভালোভাবে কাজ করতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে সরকারের।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন , “সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা কিছুটা পিছিয়ে রয়েছি। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করতে সবাই মিলে কাজ করে যেতে হবে। পানির দামের ক্ষেত্রেও আমরা কাজ করছে। বিত্তবানদের জন্য এক ধরনের দাম আর নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আরেক ধরনের দাম নির্ধারণ করে দিবো। ভবিষ্যতে এই সংকট যেন না থাকে সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি”।