উপকূলে আঘাত হানল ঘূর্ণিঝড় রিমালের মূল অংশটি

বাংলাদেশের সাতক্ষীরা ও পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপের মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে বঙ্গোপসাগর উপকূলে আঘাত হেনেছে প্রবল ঘূর্ণিঝড় রিমালের ‘আই’ (চোখ) বা মূল কেন্দ্রটি। রোববার বাংলাদেশ সময় রাত আটটা নাগাদ এটি আঘাত হানে, যদিও সে সময় সাগরে ভাঁটা থাকায় তেমন বড় কোনও জলোচ্ছ্বাস দেখা যায়নি।
মধ্যরাতের পরে পুরো ঝড়টি উপকূল অতিক্রম করবে বলে বলা হচ্ছে। রিমালের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে বিকেল থেকেই ঝোড়ো বাতাস-সহ বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, মোটামুটিভাবে বাংলাদেশ সময় রাত এগারোটার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের মূল অংশ অর্থাৎ চোখের অংশটি উপকূলীয় এলাকা অতিক্রম করে যাবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রধান ড. শামীম হাসান ভূঁইয়া জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে তীব্র বাতাস, জলোচ্ছ্বাস, ঝোড়ো হাওয়া-সহ ভারি ও অতিভারি বৃষ্টি এবং বন্যা পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়টির মূল কেন্দ্র বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দুটি জায়গা দিয়েই অতিক্রম করছে বলেও জানাচ্ছে বাংলাদেশের আবহাওয়া অফিস।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “মোংলা থেকে দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চল দিয়ে সাতক্ষীরা ও পশ্চিম বঙ্গের সাগর আইল্যান্ডের মাঝখান দিয়ে ঢুকেছে ঘূর্ণিঝড়ের মূল কেন্দ্রটি। মূল কেন্দ্রের ব্যাসার্ধ অনেক বড় থাকায় এটির প্রভাব আশপাশের এলাকাগুলোতেও পড়তে শুরু করেছে।"

ছবির উৎস, Kamol Das
আবহাওয়া অফিস বলছে, ঝড়টির মূল অংশ যখন উপকূলে আঘাত হানতে শুরু করে তখন নদী ও সাগরে ভাঁটা থাকার কারণে জলোচ্ছ্বাস কম হয়েছে। তবে, রাত পৌনে দশটার দিকে উপকূলীয় এলাকায় জোয়ার শুরু হবে।
ঝড়ের শেষ ভাগটি যখন উপকূল অতিক্রম করবে, তখন সাগরে জোয়ার থাকার কারণে উপকূলীয় জেলাগুলোতে জলোচ্ছ্বাস বাড়বে।
রিমালের প্রভাবে কাল সোমবার রাজধানী ঢাকা-সহ সারাদেশে বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিচ্ছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আর ঝড়টি এখনও উপকূল অতিক্রম করছে বলে মোংলা ও পায়রা বন্দরকে ১০ নম্বর, এবং কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে ৯ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
ঝড়ের প্রভাবে কুয়াকাটায় জলোচ্ছ্বাসে ১জন ও সাতক্ষীরায় আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার পথে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। আর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় মোংলাতে দুপুরে নৌকাডুবিতে মারা গেছে তিনজন।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা নাগিব বাহার রোববার সন্ধ্যায় জানিয়েছেন, এরই মধ্যে ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছে। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে বেশ কিছু এলাকা।

ছবির উৎস, AZAD KABIR
আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে অনীহা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
খুলনা ও বরিশালের উপকূলীয় এলাকায় শনিবার সন্ধ্যায় সাত নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা করে আবহাওয়া অফিস। এর আগে থেকেই দূর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় উপকূলীয় জেলাসমূহের আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়। রোববার সকালের দিকে এসব এলাকায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণা করা হয়।
এসব এলাকার উপজেলা প্রশাসন মাইকিং করে সতর্কতা জারি করে শনিবার সন্ধ্যা থেকেই। কিন্তু রবিবার বিকেল পর্যন্ত বেশিরভাগ আশ্রয় কেন্দ্রই দেখা অনেকটা ফাঁকা।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বেশ কিছু ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে ঘুরেছেন বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা। গাবুরা ইউনিয়নের দাতিনাখালীর একটি আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে তিনি দেখতে পান, সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনা খাবার, পানি, চার্জার বাতিসহ কিছু আয়োজন করা হলেও তারপরও বাড়িঘড় কিংবা বসত ভিটা ছাড়ছেন না সাধারণ মানুষ।
একদিকে মহাবিপদ সংকেত অন্যদিকে পানি বাড়তে শুরু পরও মানুষজন বাড়িঘর ছাড়তে না চাওয়ার কারণ হিসেবে জানান, তাদের অনেকেরই বাড়িতে গবাদি পশু ও আসবাবপত্র রয়েছে। সেগুলো হারানোর ভয়েও অনেকে বাড়ি ছাড়ছেন না।
বাগেরহাটের মোংলার স্থানীয় সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন জানান, “মোংলা উপজেলায় এখন পর্যন্ত ১০৩টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। সে সব আশ্রয় কেন্দ্রে বিকেল পর্যন্ত মাত্র ৭-৮ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।
এই এলাকায় মাইকিং করা হলেও তাতে খুব একটা আমলে নিচ্ছে না সাধারণ মানুষ।
ঘূর্ণিঝড় সিডরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা। রবিবার স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, শরণখোলা উপজেলার বলেশ্বর নদীর রায়েন্দা বেড়িবাঁধ এলাকায় মাইকিং করে উপকূলবাসীকে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন স্বেচ্ছাসেবকরা।
তবে, অনেকে জানান আগেও এমন মহাবিপদ সংকেত দেয়ার পরও খুব একটা ক্ষয় ক্ষতি না হওয়া তারা বাড়ি ঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী না।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ৬৭৩ টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং সেখানে তিন লাখেরও বেশি মানুষ এখানে আশ্রয় নিতে পারবে।

বেরিবাঁধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় লাখো মানুষ
ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে রবিবার সকাল থেকে দমকা হাওয়াসহ থেমে থেমে বৃষ্টিপাত শুরু হয়।
এর প্রভাবে খুলনার কয়রা, দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর, তালা, বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জসহ বরিশাল ও খুলনা বিভাগের বেশিরভাগ উপকূলীয় এলাকা।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে বিবিসি সংবাদদাতা নাগিব বাহার জানান, বুড়ি গোয়ালিনি, গাবুরা, দাতিনাখালীর বেশিরভাগ নদী ও খালের পানি বাড়তে শুরু করে সকাল থেকে। এসব এলাকার নিম্নাঞ্চলের বেশিরভাগ বাঁধই ঝুকিপূর্ণ।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রিমালের মূলভাগ উপকূলীয় এলাকা অতিক্রম করার সময় ৮-১২ ফুট জলোচ্ছ্বাস হতে পারে।
কয়রার সাংবাদিক সম্রাট কবির জানান, উপকূলীয় এলাকার কয়রার বেশিরভাগ বাঁধই আগে থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন করে জোয়ারের পানি বাড়তে শুরু করে সকাল থেকে।
সুন্দরবনের কর্মকর্তা আজাদ কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, জোয়ারের পানিতে বেড়িবাঁধগুলো সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বরগুনায় জেলায় ২৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এই সব বেড়িবাঁধ বেশিরভাগ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডও নানা প্রস্তুতি রেখেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, বাধ ভেঙ্গে পানি উঠতে পারে এমন আশঙ্কার জায়গা থেকে ৮০০ র মতো জিও ব্যাগ প্রস্তুত রেখেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

ছবির উৎস, AZAD KABIR
তলিয়ে গেছে সুন্দরবন
ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে রবিবার সকাল থেকে হালকা বৃষ্টিসহ দমকা বাতাস শুরু হয়। এর প্রভাবে সকাল থেকেই পানি বাড়তে শুরু করে সুন্দরবন।
সকাল ৮টা থেকে জোয়ার শুরু হয়ে দুপুর দুইটা পর্যন্ত জোয়ার হওয়ার কথা থাকলেও বিকেল ৫টা পর্যন্ত পানি বাড়তে শুরু করে।
দুপুরে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজননকেন্দ্র ও পর্যটন স্পটের ওসি আজাদ কবির জানান, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ ফুট পানি বেড়ে সুন্দরবন তলিয়ে গেছে। পানির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি জানান, ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পুরো সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। বন বিভাগের ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে থাকা বনরক্ষীদের এরই মধ্যে নিরাপদে সরিয়ে আনা হয়েছে।’
সুন্দরবনের এই কর্মকর্তা জানান, করমজল বন্যপ্রাণী কেন্দ্রে এরই মধ্যে যে সব প্রাণী রয়েছে সেগুলো কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এরই মধ্যে মোংলা বন্দরে পন্য ওঠানামা বন্ধ রেখেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পণ্যবাহী ৬টি জাহাজকে রাখা হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে।











