বিএনপির ডাকা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল চলছে, ট্রেনে-বাসে আগুন, সুনামগঞ্জে সংঘর্ষ

ছবির উৎস, Bangladesh Fire Service & Civil Defence
তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে সারাদেশে বিএনপির ডাকা ৪৮ ঘণ্টা হরতাল চলছে। এর আগে শনিবার রাতে বাসে ও ট্রেনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিএনপি ৪৮ ঘণ্টার হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।
এর আগে, গত ২৮শে অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর বিএনপি একদিনের জন্য হরতালের ডাক দিয়েছিল। এরপর থেকে পাঁচ দফায় মোট ১০দিন অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে দলটি।
রোববার ভোর ছয়টা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হরতাল শুরু হলেও আগের রাতেই জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে যমুনা এক্সপ্রেস নামের একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে দু’টি ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটলো।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুনে যমুনা এক্সপ্রেসের তিনটি বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া আগুন লাগার পর হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অন্তত ৪জন যাত্রী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সরিষাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুশফিকুর রহমান।
এদিকে, ঢাকা, কুমিল্লা এবং জয়পুরহাট জেলায় অন্তত পাঁচটি বাসে আগুন এবং একটি সিএনজি অটোরিক্সায় ককটেল হামলার খবর পাওয়া গেছে।
তবে এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত হতাহতের কোন খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, রোববার সকালে ঢাকার রাস্তায় যান চলাচল তুলনামূলক কম দেখা গেছে। এ অবস্থায় গণপরিবহন সংকটে কর্মজীবী মানুষদের অনেকেই দুর্ভোগে পড়েন।
এছাড়া রোববার সকালে ঢাকার গাবতলী, মহাখালী এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে দূরপাল্লার কোন বাস ছাড়তে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন বিবিসি সংবাদদাতারা। পর্যাপ্ত সংখ্যক যাত্রী না পাওয়ায় দূরপাল্লার বাস ছাড়ছেন না বলে জানিয়েছেন বাসের টিকিট বিক্রেতারা।
আর সড়কে দূরপাল্লার বাস না ছাড়ায় যাত্রীর চাপ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে।
সুনামগঞ্জে বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষ
সুনামগঞ্জ শহরে পুলিশ এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যাচ্ছে। এতে পুলিশের অন্তত সাত জন সদস্য আহত হয়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস।
তিনি বলেন, রোববার সকাল ১১টার দিকে সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় হরতালে সমর্থনে মিছিল বের করে বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়।
এসময় দু’পক্ষের মধ্যে কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এতে ইট-পাটকেলের আঘাতে পুলিশের সাত সদস্য আহত হয়। পরে টিয়ারশেষ নিক্ষেপ করে হরতাল সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয় বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।

ছবির উৎস, Bangladesh Fire Service & Civil Defence
জামালপুরে ট্রেনে আগুন
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, হরতালের আগে শনিবার রাতে জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে যমুনা এক্সপ্রেস নামের একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়েছে। এতে ট্রেনটির তিনটি বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া আগুন লাগার পর হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অন্তত ৪জন যাত্রী আহত হয়েছেন বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন সরিষাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুশফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা যমুনা এক্সপ্রেস শনিবার রাত একটার দিকে সরিষাবাড়ী রেলস্টেশনে এসে দাঁড়ায়। এর কিছুক্ষণ ট্রেনটি তারাকান্দির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলে তাতে আগুন দেওয়া হয়।
পরে ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টায় রাত সাড়ে তিনটার দিকে আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়।
এ ঘটনায় আহত যাত্রীদের সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান সরিষাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
এর আগে, বিএনপির পঞ্চম দফা অবরোধ চলাকালে গত বুধবার রাতে টাঙ্গাইল রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কমিউটার ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

ছবির উৎস, Bangladesh Fire Service & Civil Defence

সড়কে যান কম, যাত্রীদের দুর্ভোগ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
সকাল থেকে বিবিসি সংবাদদাতারা ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ঘুরে হরতালের পরিস্থিতি দেখেছেন।
সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, ঢাকার ধানমণ্ডি, কলাবাগান, গ্রিনরোড, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, মিরপুর, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, মহাখালী, বনানী, গুলশানসহ বিভিন্ন সড়কে সীমিত সংখ্যক বাস, ট্রাক, পিকআপ ভ্যান এবং ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করছে।
যদিও প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিবহন থাকায় অফিস ও স্কুলগামী যাত্রীরা বিপাকে পড়েছেন।
এছাড়া সিএনজি অটোরিক্সা ও রিক্সার সংখ্যা স্বাভাবিক দিনের মতই দেখা গেছে।
তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে।
অন্যদিকে, আগের হরতাল-অবরোধের মত রোববারেও বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লার যান চলাচল।
রোববার সকালে ঢাকার গাবতলী, মহাখালী এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে দূরপাল্লার কোন বাস ছাড়তে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন বিবিসি সংবাদদাতারা। পর্যাপ্ত সংখ্যক যাত্রী না পাওয়ায় দূরপাল্লার বাস ছাড়ছেন না বলে জানিয়েছেন বাসের টিকিট বিক্রেতারা।
গাবতলী বাস টার্মিনালের একজন বাস টিকিট বিক্রেতা চুন্নু সর্দার বলেন, "ভোর পাঁচটায় কাউন্টার খুলে বসে আছি। গাড়িও রেডি, কিন্তু যাত্রীর দেখা নাই।"
হরতাল-অবরোধের কারণে গত তিন সপ্তাহ ধরে রুটিরুজির ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, "গাড়ি না ছাড়তে পারলে মালিক টাকা দেয় না। সংসার চালামু কেমনে? খুব কষ্টে আছি।"
এদিকে, দূরপাল্লার বাস না ছাড়ায় যাত্রীরাও দুর্ভোগে পড়েন। গাবতলী বাস টার্মিনালে অপেক্ষারত একজন যাত্রী বুলবুল আহমেদ বলেন, "গত রাতে আমি কক্সবাজার থেকে ঢাকায় আসছি। ভোর থেকে এখানে বসে আছি রাজশাহী যাবার জন্য। কিন্তু যাত্রী কম থাকায় বাস ছাড়ছে না। কতক্ষল এভাবে বসে থাকতে হবে তারও ঠিক নাই।"
সুজন রানা নামে আরেক জন যাত্রী বলেন, "আমি রংপুরে থাকি। অফিসের কাজে আমি ঢাকা আসছিলাম। এখন বাড়ি ফেরার বাস পাচ্ছি না। খুব ভোগান্তি হচ্ছে।"
এর আগেও বিএনপির পাঁচ দফায় মোট ১০দিন অবরোধ একং একদিনের হরতাল চলাকালে দূরপাল্লার কোন বাস চলেনি বলে জানিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা।

লঞ্চে যাত্রীদের ভিড়
হরতালে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ থাকায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের চাপ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন লঞ্চ শ্রমিকরা। রোববার সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অন্তত ১০টি লঞ্চ বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে সদরঘাট ছেড়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
পটুয়াখালীগামী প্রিন্স আওলাদ-৭ লঞ্চের কেবিন ইনচার্জ নিয়াজ মোহাম্মদ বশির বিবিসি বাংলাকে বলেন, "পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পর আমাদের যাত্রীর সংখ্যা কমে গিয়েছিল। এখন হরতালের কারণে বাস বন্ধ থাকায় যাত্রীর চাপ অনেক বেড়েছে।"
মোম্মদ নূর আলী নামের একজন লঞ্চযাত্রী বলেন, "জামালপুর থেকে বাসে করে ঢাকায় আসছি। কুয়াকাটা যাবো। কিন্তু কুয়াকাটার বাস পাওয়া যাচ্ছে না। তাই লঞ্চে করে যাচ্ছি।"
সরদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বরিশাল এবং চাঁদপুর রুটে লঞ্চ ছেড়ে যায়। হরতালের কারণে উভয় রুটে যাত্রীদের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানা গেছে।

বাসে আগুন
ঢাকা, কুমিল্লা এবং জয়পুরহাট জেলায় অন্তত পাঁচটি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এছাড়া রোবার সকালে পুরান ঢাকায় ককটেল হামলায় একটি সিএনজি অটোরিক্সায় আগুন লাগে বলেও জানান তারা।
তবে এসব ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, শনিবার রাত ১০টা থেকে ১২টার মধ্যে ঢাকার ধানমণ্ডি ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে এবং মিরপুরের কালশীতে দু'টি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
প্রায় একই সময়ে কুমিল্লা সদর উপজেলাতেও আরও একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়।
এছাড়া শনিবার রাত নয়টার দিকে ঢাকার গুলিস্তান এবং জয়পুরহাট জেলায় দু'টি বাসে আগুন দেওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস।
গত ২৮ অক্টোবরের পর রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত বাস, ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, মোটরসাইকেল সহ অন্তত ১৬০টি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

ছবির উৎস, Bangladesh Fire Service & Civil Defence
তফসিল নিয়ে বিএনপির প্রতিক্রিয়া
বুধবার ১৫ই নভেম্বর বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।
তফসিল ঘোষণার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভেতরে স্বস্তির প্রকাশ দেখা গেলেও, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপির মধ্যে পাওয়া গেছে নানামুখী প্রতিক্রিয়া।
দলটির নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন তফসিল ঘোষণা হলেও বৈশ্বিক চাপে সরকারকে নির্বাচনের আগেই একটি সমঝোতায় আসতে হবে।
তবে তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বুধবার সন্ধ্যায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী তফসিল প্রত্যাখ্যান করেন। পরদিন ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ঘোষণা করে বিএনপি।
এক ভার্চুয়াল ব্রিফিংয়ে মি. রিজভী বলেন, “প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার ভাষণে বলেছেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করবেন। এটা ডাহা মিথ্যা, ভন্ডামিপূর্ণ ও মেকি। শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন বিশ্বাস করা চোরাবালিতে পড়ার সামিল।”
আগামী বছরের সাতই জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং মনোনয়ন জমা দেয়ার শেষ তারিখ ৩০শে নভেম্বর।
বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। এই সাথে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হবে বলেও তিনি বলেছেন।
মি. রিজভী তার বক্তব্যে আরও বলেন শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ কেয়ারটেকার সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে।











