রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা এবং নতুন যে পরিকল্পনার কথা জানালেন অধ্যাপক ইউনূস

দায়িত্ব নেয়ার এক মাস পর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্তাকে প্রতিফলিত করতে সংবিধানসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কার প্রয়োজন।

ভাষণে তিনি গত পনেরো বছরেরও বেশি সময়ে দেশের প্রশাসন, অর্থনৈতিক খাত কিংবা বিভিন্ন জায়গায় যে সব সংকট তৈরি হয়েছে সেগুলোর কথা তুলে ধরেন।

পাশাপাশি সংকট নিরসনে সরকারের নেয়া নানা উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ সংস্কার পরিকল্পনার কথাও জানান নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ।

প্রধান উপদেষ্টা জানান, বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারে ছয়টি কমিশন গঠন করে ছয়জন বিশিষ্ট নাগরিককে এই কমিশনগুলি পরিচালনা করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত হওয়ার পর এসব কমিশন প্রধানরা আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী পহেলা অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করবেন এবং তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে পরামর্শসভার আয়োজন করবে।

ভাষণে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “ভবিষ্যতে দেশকে আর যেন কোনো স্বৈরাচারের হাতে পড়তে না হয়, আমরা যেন বলতে পারি একটি গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করি, আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।”

এই ভাষণে গত এক মাসে সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “আমাদের কাজ বড় কঠিন, কিন্তু জাতি হিসেবে এবার ব্যর্থ হওয়ার কোনো অবকাশ আমাদের নেই। আমাদের সফল হতেই হবে। এই সাফল্য আপনাদের কারণেই আসবে।”

ছয় কমিশনের দায়িত্বে ছয়জন

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা সংস্কারে ছয় বিশিষ্ট নাগরিককে দায়িত্ব দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বদিউল আলম মজুমদারকে, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনে সরফ রাজ হোসেন, বিচার বিভাগ সংস্কারের দায়িত্ব পালন করবেন বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে থাকছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। এছাড়া জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে থাকছেন আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের দায়িত্ব থাকছে ড. শাহদীন মালিকের হাতে।

এসব কমিশন প্রধানরা আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী পহেলা অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করবেন।এবং তিন মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে পরামর্শসভার আয়োজন করবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ছাত্র সমাজ, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সরকারের প্রতিনিধি নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক তিন থেকে সাত দিনব্যাপী একটি পরামর্শসভার ভিত্তিতে সংস্কার ভাবনার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে বলেও ভাষণে জানান প্রধান উপদেষ্টা।

গণঅভ্যুত্থানে নিহত-আহতদের জন্য নতুন ঘোষণা

গত জুলাই ও অগাস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত পরিবার ও আহতের পুনর্বাসনের ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস।

তিনি বলেন, “আমি আগেও জানিয়েছি, আবারো জানাচ্ছি, গণঅভ্যুত্থানের সকল শহীদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। সকল আহত শিক্ষার্থী শ্রমিক জনতার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে।”

অধ্যাপক ইউনূস জানান, আহতদের দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং শহীদদের পরিবারের দেখাশোনার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এখন নতুন তথ্য পাওয়ার ভিত্তিতে এই তালিকা হালনাগাদ করা হতে থাকবে।

এই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরই “জুলাই গণহত্যা স্মৃতি ফাউন্ডেশন” নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, “এখন সে ফাউন্ডেশন তৈরি হয়েছে। সব শহীদ পরিবার ও আহতদের সর্বোত্তম চিকিৎসাসহ তাদের পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এই ফাউন্ডেশন গ্রহণ করছে। এই ফাউন্ডেশনে দান করার জন্য দেশের সব মানুষ ও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।”

এক মাসে ১৯৮টি অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

অধ্যাপক ইউনূস তার ভাষণে জানান দায়িত্ব গ্রহণের একমাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ১৯৮টি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার সরকার।

তিনি জানান, খুব অল্প জনবল নিয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করা হলেও প্রথম দিকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে পাঠানো বিবিধ প্রস্তাব বিষয়ে দ্রুত গতিতে এবং আইনগত সব বাধ্যবাধকতা মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে গত এক মাসে জনপ্রশাসনের ১৩৫ জন অতিরিক্ত সচিব, ২২৭ জন যুগ্মসচিব ও ১২০ জন উপসচিবকে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে।

এছাড়া এখন পর্যন্ত ৫৯টি জেলার জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং নতুন ৫৯ জন জেলা প্রশাসককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৬৭ জন কর্মকর্তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। ১০ জন যুগ্ম সচিব, ৮ জন অতিরিক্ত সচিব এবং ৬ জন সচিবকে ওএসডি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের ৮০ জন ডিআইজি, ৩০ জন পুলিশ সুপারসহ ১১০ জনকে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। একজন ডিআইজি, একজন অ্যাডিশনাল ডিআইজি এবং চারজন পুলিশ সুপারকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এর পাশাপাশি আইজিপিসহ ১০ জন অতিরিক্ত আইজি, ৮৮ জন ডিআইজি, ২১ জন অ্যাডিশনাল ডিআইজি এবং ১৭৭ জন পুলিশ সুপারসহ মোট ২৯৭ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে।

লুটপাট-দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কার

ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময় নেওয়া কোটি কোটি টাকার অনেক প্রকল্পই দেশের মানুষের জন্য ছিল না বলে ভাষণে জানান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

লুটপাট ও পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটা ব্যাংকিং কমিশনও গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে এই একমাসে বিরাট পরিবর্তন এসেছে।

শেখ হাসিনা সরকারের লুটপাটের তথ্য তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “ফ্যাসিবাদী সরকার লুটপাট করার জন্য নতুন করে ষাট হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে বাজার ছাড়ার কারণে মুদ্রাস্ফীতির শিকার হয়েছে দেশের মানুষ। এই অতুলনীয় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।”

কালো টাকা সাদা করার অনুমতি বাতিল করা হয়েছে বলে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করা হয়েছে।”

বিগত সরকারের অহেতুক কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “সেগুলো কখনোই দেশের মানুষের জন্যে ছিল না, বরং এর সাথে জড়িত ছিল কুৎসিত আমিত্ব এবং বিশাল আকারের চুরি।”

এ সময় প্রয়োজনে যে সব প্রকল্প দরকার নেই সেগুলো বাতিল বিবেচনা করা হতে পারে বলেও জানান তিনি।

আয়নাঘর ও গুম খুন বন্ধে পদক্ষেপ

গত তিন মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকারের বিভিন্ন স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের উদাহরণ তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব পরিবার তাদের নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের অপেক্ষায় আছেন তাদের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “আয়নাঘরগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এবং সেই সাথে বের হয়ে আসছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের গুমের শিকার ভাইবোনদের কষ্ট ও যন্ত্রণা গাঁথা।”

বিগত সরকারের সময় সন্ত্রাস দমন আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে দায়েরকৃত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তিনি জানান, বাংলাদেশে বিদ্যমান সকল কালো আইনের তালিকা করা হয়েছে। অতি সত্বর এ সকল কালো আইন বাতিল ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশোধন করা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ বহুল আলোচিত ৫টি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ও দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তির জন্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “সম্প্রতি আমরা বলপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন সনদে স্বাক্ষর করেছি। আমরা ফ্যাসিবাদী শাসনের ১৫ বছরে গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করার জন্য পৃথক একটি কমিশন গঠন করছি।”

শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে যা বললেন

দেশের শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করতে সরকারের উদ্যোগের কথা জানান প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চ প্রশাসনিক পদগুলো পূরণ করে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা বোর্ডে দখলদারিত্বের রাজনীতি বন্ধ করার ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা জানান, প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বর্তমানের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা হয়েছে। বই সংশোধন এবং পরিমার্জনের কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। এ সংস্কারের কাজ অব্যাহত থাকবে।

উচ্চ শিক্ষায় বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “আমরা ক্রমাগতভাবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এমন উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্য নিয়োগ দেয়ার কাজ শুরু করেছি। এর ফলে সব সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।”

বিগত পনেরো বছরে আওয়ামী লীগ মতাদর্শী না হওয়ার কারণে ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত বিপিএসসি কর্তৃক সুপারিশকৃত অনেক প্রার্থী নিয়োগ বঞ্চিত হয়েছিলো যারা তাদেরকে গত মাসেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধান উপদেষ্টা।

দেশের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা মন খুলে আমাদের সমালোচনা করেন। আমরা সবার মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মিডিয়া যাতে কোনো রকম বাধা বিপত্তি ছাড়া নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করতে পারি।”

এজন্য একটি মিডিয়া কমিশন গঠন করা সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি জানান, আরো যে-সব কমিশন করা হচ্ছে তা সরকারসহ অন্য সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবে।