আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
জন্মকুন্ডলী দেখে মুঘল সাম্রাজ্য পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন আওরঙ্গজেব
- Author, রেহান ফজল
- Role, বিবিসি নিউজ হিন্দি, দিল্লি
বহু মানুষ আছেন, যাদের দিনটা শুরুই হয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত রাশিফল পড়ে। কিন্তু এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা জ্যোতিষে বিশ্বাস করেন না।
চাঁদ-তারার গতি বুঝতে মানুষের দীর্ঘকাল লেগেছে। প্রাচীন গ্রিস থেকে শুরু করে ভারত পর্যন্ত জ্যোতিষ চর্চা হয়েছে, অবশেষে মধ্যযুগে এসে গ্রহ-নক্ষত্রের গতি প্রকৃতির সঙ্গে ভবিষ্যতবাণীও জড়িয়ে গেছে।
ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে রাজত্ব চালানো মুঘলরাও জ্যোতিষে বিশ্বাস করতেন আর বড় কোনও কাজে নামার আগে জ্যোতিষীদের পরামর্শ নিতেন।
ইসলাম এবং খ্রিষ্ট ধর্মের মতো কয়েকটি ধর্মে জ্যোতিষবিদ্যাকে জাদু-টোনা হিসাবে দেখা হয়, এর থেকে দূরে থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়। ইসলামে তো এটাও বলা হয় যে শুধুমাত্র আল্লাহ-ই ভবিষ্যৎ জানার ক্ষমতা রাখেন।
প্রসিদ্ধ সাংবাদিক এমজে আকবর সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন 'আফটার মি. ক্যায়স : অ্যাস্ট্রোলজি ইন দ্য মুঘল এম্পায়ার' নামে। প্রত্যেক মুঘল সম্রাট কীভাবে জ্যোতিষ চর্চাকে দেখতেন, সে সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে বইটিতে।
মি. আকবর বিবিসিকে বলছিলেন, "তা সে হুমায়ুন হোন বা আকবর অথবা জাহাঙ্গীর কিংবা আওরঙ্গজেব – প্রত্যেকেই জ্যোতিষে খুব বিশ্বাস করতেন। আকবরের আমলে তো জ্যোতিষীরা সম্রাটের দরবারেরই অংশ ছিলেন। আওরঙ্গজেব তো প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে নিয়মিত জ্যোতিষীদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করতেন। প্রত্যেক মুঘল বাদশাহই মনে করতেন যে ধর্মভিত্তিক বিশুদ্ধতাবাদ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।"
বিশ্ব জুড়েই চলত জ্যোতিষ চর্চা
ইতিহাসবিদ ও লেখক বেনসন বব্রিক তার বই 'খলিফস্ স্প্লেন্ডার'-এ লিখেছিলেন, "আবু জাফর আল মনসুর ৩১শে জুলাই, ৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ শহরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ঠিক বেলা দুটো বেজে ৪০ মিনিটে, কারণ ওই সময়টা শুভ-মুহূর্ত ছিল।"
আরেক ইতিহাসবিদ, অধ্যাপক মুহাম্মদ মুজিব 'দ্য ইন্ডিয়ান মুসলিম' বইতে লিখেছেন, "ভারতে মুসলমান শাসন শুরু হওয়ার অনেক আগেই বিশ্বের মুসলমানরা চমৎকার, দামি পাথরের রহস্যময় গুণাগুণ আর শুভ-অশুভ ইত্যাদিতে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। ভারতে তো জ্যোতিষকে বিজ্ঞান হিসাবে মনে করা হতো এবং মুসলমানরাও এটা বিশ্বাস করতেন।"
মধ্যযুগের ইতিহাসকার জিয়াউদ্দিন বর্নি 'তারিখ-এ-ফিরোজশাহি' বইতে লিখেছিলেন, "যে কোনও সম্মানীয় পরিবারে কোনও অনুষ্ঠান বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ জ্যোতিষীর পরামর্শ ছাড়া হতো না। এজন্য প্রতিটা রাস্তাতেই হিন্দু – মুসলমান দুই ধরনের জ্যোতিষী দেখা যেত।"
আকবরের জন্ম পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা
তৃতীয় মুঘল বাদশাহ আকবরের জন্ম হয়েছিল ১৫৪২ সালের ১৫ই অক্টোবর, রাত একটা বেজে ছয় মিনিটে। জ্যোতিষবিদ্যার ওপরে মুঘল বাদশাহদের কতটা বিশ্বাস ছিল, আকবরের জন্মের কাহিনিও তার একটি প্রমাণ।
সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে শের শাহ যখন তাকে সিন্ধ প্রদেশের মরুভূমির দিকে হটিয়ে দিলেন, তখন উমরকোটের কেল্লায় হুমায়ুনকে আশ্রয় দিয়েছিলেন সেখানকার রাজপুত রাজা। হুমায়ুনের স্ত্রী হামিদা বেগম সেই সময়ে গর্ভবতী ছিলেন।
এমজে আকবর বলছিলেন, "হামিদার যখন প্রসব বেদনা উঠল, সেই সময়ে হুমায়ুন ছিলেন প্রায় ৩০ মাইল দূরে থাট্টায়। ব্যক্তিগত জ্যোতিষী মৌলানা চাঁদকে স্ত্রীর কাছে রেখে গিয়েছিলেন হুমায়ুন, যাতে নবজাতকের জন্মের সঠিক সময়টা লিখে রাখা যায় আর তার জন্মকুন্ডলী সঠিকভাবে তৈরি করা যায়। যখন ১৪ই অক্টোবর রাতে হামিদা বেগমের প্রসববেদনা আরও বেড়ে গেল আর সন্তান প্রসবের প্রস্তুতি শুরু হল, তখন জ্যোতিষী মৌলানা চাঁদ ঘাবড়িয়ে গেলেন।"
রাজ-জ্যোতিষীর বিশ্বাস ছিল যে শিশুটির জন্ম শুভ-মুহূর্তের আগেই হতে চলেছে। যদি প্রসবটা আর সামান্য পরে হয়, তাহলে এক দুর্লভ নক্ষত্র-সংযোগ হবে – যা হাজার বছরে একবারই ঘটে থাকে। মৌলানা চাঁদ তখন ধাত্রীদের কাছে জানতে চান যে প্রসব কি আর সামান্য কিছুক্ষণের জন্য আটকিয়ে রাখা যায়?
প্রসব বেদনা আটকিয়ে দেওয়া হয়
প্রসবে সহায়তা করার জন্য যে নারীরা ছিলেন, তারা জ্যোতিষীর পরামর্শ শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন যে প্রকৃতির নিয়ম আসলে ঈশ্বরের নির্দেশ। এসব ব্যাপারে মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছা কাজ করে না।
আবুল ফজল 'আকবরনামা'য় লিখেছিলেন, "হঠাৎই মৌলানা চাঁদের মাথায় এক অদ্ভুত ভাবনা এসেছিল। একজন ধাত্রীকে ভয়াল চেহারায় সাজিয়ে অন্ধকার রাতে হামিদার পালঙ্কের পাশে নিয়ে গেলেন তিনি। একটা পাতলা পর্দার আড়াল থেকে সেই ভয়াবহ চেহারা হামিদাকে দেখালেন মৌলানা। অন্ধকারের মধ্যে সেই ভয়াল মুখ দেখে হামিদা এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে তার প্রসববেদনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তার ঘুম পেয়ে গিয়েছিল।"
'আকবরনামা'তেই লেখা হয়েছে, "এবারে মৌলানা চাঁদ ভাবতে শুরু করলেন যে যদি হামিদ বানো শুভ মুহূর্তেও ঘুমিয়েই থাকেন, তাহলে কী হবে? শুভ মুহূর্ত যখন এগিয়ে এল, তখন মৌলানা চাঁদ বললেন যে রানিকে দ্রুত ঘুম থেকে তুলে দিতে হবে। ঘুমন্ত রাণীকে জাগিয়ে দেওয়ার সাহস হয়নি ধাত্রীদের। হঠাৎই হামিদা বানোর চোখ খুলে যায়। তার প্রসববেদনা আবারও শুরু হয়, জন্ম হয় আকবরের।"
মৌলানা চাঁদ আকবরের জন্ম কুণ্ডলী হুমায়ুনের কাছে পাঠিয়ে এই বার্তা দিলেন যে, এই ছেলে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে রাজসিংহাসনে থাকবে।
জ্যোতিষীর পরামর্শে সিংহাসন পুনর্দখলের অভিযান হুমায়ুনের
জ্যোতিষীদের ঠিক করে দেওয়া সময়ে ২২শে নভেম্বর, ১৫৪২ সালে হুমায়ুনের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন হামিদা বেগম। হুমায়ুন আকবরকে যখন প্রথমবার দেখলেন, তখন নবজাতকের বয়স ৩৫ দিন। আকবরের দেখভালের প্রতিটা পদক্ষেপ নির্ধারিত হত নক্ষত্র গণনা করে।
আবুল ফজল লিখেছিলেন, "চারদিকে সবারই মন খারাপের মধ্যেও হুমায়ুনের বিশ্বাস ছিল যে তার পুত্রের সঙ্গে কোনো অপ্রিয় ঘটনা ঘটবে না কারণ ঈশ্বর তাকে আগলিয়ে রেখেছেন। তার বিশ্বাস ভুল প্রমাণিত হয়নি। হুমায়ুনের সঙ্গে তার ভাই আসকারির শত্রুতা থাকলেও হুমানের মৃত্যুর পরে আসকারিই কিন্তু আকবরের খেয়াল রেখেছিলেন। কান্দাহার কেল্লার ওপরের দিকে তাকে থাকার জন্য একটি ঘর দেওয়া হয়েছিল। আবার আসকারির স্ত্রী সুলতান বেগম ১৪ মাসের আকবরকে ভালবাসা দিয়ে ভরিয়ে রেখেছিলেন।"
জ্যোতিষীদের পরামর্শে ১৫৪৫ সালের ১৪ই মার্চের এক শুভ মুহূর্তে হুমায়ুন সিংহাসন আবারও দখল করার অভিযান শুরু করেন। আসকারি তেসরা সেপ্টেম্বর, ১৫৪৫ সালে পরাজয় মেনে নিলেন। আসকারির ঘাড়ে তলোয়ার ধরে রেখে তাকে হুমায়ুনের সামনে হাজির করলেন বৈরম খাঁ। পরিবারের কথা মেনে নিয়ে আসকারিকে প্রাণে মারেননি হুমায়ুন।
আকবরের বয়স যখন চার বছর চার মাস চার দিন ছিল, তখন মুল্লাহ ইসলামউদ্দিন ইব্রাহিমের তত্ত্বাবধানে তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পর্ব শুরু হয়।
জ্যোতিষীদেরই পরামর্শে হুমায়ুন পুত্রের শিক্ষা শুরু করার জন্য ১৫৪৭ সালের ২০শে নভেম্বর তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন। তবে শিক্ষাদীক্ষা শুরুর ওই বিশেষ মুহূর্তটা কাজে আসেনি, কারণ বেশিরভাগ ইতিহাসবিদই মনে করেন যে আকবর কখনো লেখাপড়া শিখতেই পারেননি।
নিজের মৃত্যুরও পূর্বাভাস দিয়েছিলেন হুমায়ুন
হুমায়ুন মনে করতেন যে সাত তার জন্য পয়মন্ত সংখ্যা। তার পরনের পোশাকের রং দিনের নক্ষত্র অনুযায়ী হত। রবিবার তিনি হলুদ আর সোমবার সবুজ রঙের পোশাক পরতেন।
এমজে আকবর বলছিলেন, "হুমায়ুনকে পরের ১৫ দিনের জন্য আফিম দেওয়া হলে তিনি সাত দিন সেবন করার মতো আফিম নিয়ে কাগজে মুড়ে রেখে দিয়েছিলেন। হুমায়ুন তার ভৃত্যদের বলেছিলেন যে তার সাত দিনের জন্যই আফিম দরকার। শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ১৫৫৬ সালে গোলাপ জলে মিশিয়ে আফিম সেবন করেন। দুপুরে তার চারপাশে থাকা যারা ছিলেন, তাদের তিনি বলেন 'আজ আমাদের সময়কার এক খুব বড় ব্যক্তি বড় আঘাত পাবেন আর তিনি চিরতরে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবেন।"
সন্ধ্যায় কয়েকজন গণিতজ্ঞকে নিয়ে হুমায়ুন কেল্লার ছাদে উঠেছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল যে সেই রাতে শুক্র গ্রহটিকে স্পষ্ট দেখা যাবে আকাশে। তিনি নিজের চোখে সেটা দেখতে চেয়েছিলেন। হুমায়ুন যখন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলেন, তখনই আজান শুরু হয়। তিনি সেজদা শুরু করেন।
আবুল ফজল লিখেছেন, "কেল্লার খাড়া সিঁড়িগুলো পিচ্ছিল ছিল। যখন হুমায়ুন সেজদা করতে বসেন, তখন তার মাথাটা পায়ে বেঁধে যায় আর তিনি পা পিছলিয়ে নিচে গড়িয়ে পড়েন। মাথায় গভীর চোট লাগে, ডান কান থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করে। গোড়ায় বলা হয়েছিল যে সম্রাটের চোট সেরকম গুরুতর নয়। কিন্তু তার দরবারের সদস্যরা জেনে বুঝেই এটা করেছিলেন যাতে পরবর্তী সম্রাটের নাম ঘোষণার জন্য কিছুটা সময় পাওয়া যায়।"
হুমায়ুন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ২৭শে জানুয়ারি। তিনি সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার ১৭ দিন পরে, অর্থাৎ ১০ই ফেব্রুয়ারি, ১৫৫৬ সালে সাধারণ মানুষকে তার মৃত্যুর খবর জানানো হয়। সেদিনই তার পুত্র আকবরের নাম নিয়ে প্রথমবার খুতবা পড়া হয়েছিল। ইমাম গজনবীর নেতৃত্বে জ্যোতিষীরা আকবরের রাজ্যাভিষেকের সময় নির্ধারণ করেছিলেন।
আকবর নিয়োগ করলেন রাজ-জ্যোতিষী।
জ্যোতিষীদের পরামর্শ মেনে আকবর হেমুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ নামলেন। লড়াইয়ের ময়দানে একটি তীর হেমুর চোখে বিঁধে মাথা দিয়ে বেরিয়ে গেল। এই দৃশ্য দেখেই হেমুর সৈন্যদের মনোবল ভেঙে গেল আর তারা আকবরের বাহিনীর সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে আত্মসমর্পণ করলো।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আকবর কখন দিল্লি ফিরবেন, সেটাও জ্যোতিষীরাই ঠিক করে দিয়েছিলেন। সম্রাট হিসাবে আকবর 'জ্যোতিক রায়' বা জ্যোতিষরাজ নামে নতুন পদ সৃষ্টি করেছিলেন।
আকবরের আমলে প্রখ্যাত জ্যোতিষী আজদুদৌলা শিরাজি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে 'আকবর বৈবাহিক সূত্রে নিজের শাসনতন্ত্র মজবুত করবেন'।
আকবরের কোষাগারে এক হাজার পোশাক রাখা থাকত, যার মধ্যে ১২০টি পোষাক পরিধানের জন্য সবসময়ে তৈরি রাখা হত। হুমায়ুনের মতোই আকবরও প্রতিদিনের নক্ষত্র অনুযায়ী হিসাব কষে পোশাক পরতেন।
আবুল ফজল লিখেছেন, "আকবর প্রতি শুক্রবার, রবিবার আর প্রতি মাসের প্রথম দিন এবং সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের দিন মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন।"
জাহাঙ্গীর ও তার নাতনি
আকবরের মতোই তার পুত্র জাহাঙ্গীরও জ্যোতিষের খুব বিশ্বাস করতেন। বাবার মতো জাহাঙ্গীরের শিক্ষা দানও শুরু হয়েছিল যখন তার বয়স চার বছর, চার মাস চার দিন হয়।
জাহাঙ্গীরের রাজ্যাভিষেক হয় ১৬০৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে মার্চ। সেই দিনটাও বেছে দিয়েছিলেন জ্যোতিষীরাই। আবার সেই জ্যোতিষীদের পরামর্শেই পুত্র খুসরুর কন্যা, অর্থাৎ তার নাতনির বয়স তিন বছর না হওয়া পর্যন্ত তার মুখ দেখেননি জাহাঙ্গীর।
নিজের আত্মকথা 'তুজুক-এ-জাহাঙ্গীরি'তে তিনি লিখেছিলেন, "আমি ১৩ তারিখে আমার নাতনি – খুসরুর কন্যাকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। জ্যোতিষীরা বলেছিলেন ওর জন্মটা ওর বাবার জন্য তো শুভ হবে না, তবে দাদা, অর্থাৎ আমার পক্ষে শুভ হবে। তারা আরও বলেছে ওর তিন বছর বয়স হওয়ার পরেই যেন আমি প্রথমবার ওর চেহারা দেখি। ওই বয়সটা হওয়ার পরেই আমি ওকে প্রথমবার দেখলাম।"
জাহাঙ্গীরের রাজ জ্যোতিষীর নাম ছিল কেশব শর্মা। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে তার চার বছর বয়সি নাতি শাহ সুজার জীবনে বিপদ আসবে।
জাহাঙ্গীর লিখেছিলেন, "১৭ তারিখ, রবিবার শাহ সুজা একটা জানালার পাশে খেলছিল। সেদিন জানালা বন্ধ করা হয়নি। খেলতে খেলতেই যখন ও জানালা দিয়ে বাইরে ঝুঁকেছিল, টাল সামলাতে না পেরে ও নিচে পরে যায়। মাটিতে পরেই ও অজ্ঞান হয়ে যায়। আমি যখনই এ খবর পাই, সব কাজ ফেলে রেখে নিচে দৌড়িয়ে যাই। যতক্ষণ না ওর জ্ঞান ফিরে আসে, ততক্ষণ আমি বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম। যেই জ্ঞান ফিরল, আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য সেজদা করি।"
মুঘল বাদশাহদের মধ্যে জাহাঙ্গীরই প্রথম, যিনি মুদ্রার এক পিঠে রাশিচক্রের ছবি ছাপিয়েছিলেন।
আওরঙ্গজেব বানিয়েছিলেন নিজের জন্মকুন্ডলী
লাহোরের কেল্লায় শাহজাহানের জন্ম হয় ১৫৯২ সালের পাঁচই জানুয়ারি। এর তিন দিন পরে তার দাদু, সম্রাট আকবর নাতির মুখ দেখতে সেখানে পৌঁছানো। আকবর নবজাতকের নাম রাখেন খুর্রম, কারণ জ্যোতিষীরা পরামর্শ দিয়েছিলেন যে শিশুটির নাম 'খ' দিয়ে শুরু হতে হবে।
আকবরের নাতি আওরঙ্গজেবেরও জন্মকুন্ডলীতে সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। দরবারের জ্যোতিষীরা তার রাজ্যাভিষেকের সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার তার 'দ্য হিস্ট্রি অফ আওরঙ্গজেব' বইতে লিখেছেন, "জ্যোতিষীরা বলেছিলেন যে রবিবার, পাঁচই জুন সূর্যোদয়ের তিন ঘণ্টা ১৫ মিনিট পরে আওরঙ্গজেবের রাজ্যাভিষেকের জন্য সব থেকে উপযুক্ত সময়। সঠিক সময় উপস্থিত হলে জ্যোতিষীরা ইশারা করেন আর একটি পর্দার পিছনে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষমাণ সম্রাট আওরঙ্গজেব বাইরে বেরিয়ে এসে সিংহাসনে আরোহণ করেন।"
আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ভারত ভ্রমণে আসা ফরাসি পর্যটক ফ্রাসুঁয়া বার্নিয়েরও আরওরঙ্গজেবের জ্যোতিষ চর্চায় বিশ্বাস নিয়ে লিখেছেন।
"জ্যোতিষীদের পরামর্শ মেনে আওরঙ্গজেব ১৬৬৪ সালের ছয়ই ডিসেম্বর দুপুর তিনটের সময়ে দাক্ষিণাত্যের দিকে রওয়ানা হন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সেটাই দীর্ঘ যাত্রার জন্য সব থেকে উপযুক্ত সময়," লিখেছেন বার্নিয়ের।
এমজে আকবর বলছেন, "আওরঙ্গজেব তার পুত্রকে বলেছিলেন যে জ্যোতিষী ফজিল আহমেদ তার যে জন্মকুন্ডলী তৈরি করে দিয়েছেন, তার প্রতিটা ভবিষ্যদ্বাণী তখনও পর্যন্ত মিলে গেছে। আমার জন্মকুন্ডলীতে এটাও লেখা আছে যে আমার মৃত্যুর পরে কী হবে। আওরঙ্গজেব জানিয়েছিলেন, আমি চলে যাওয়ার পরে চারদিকে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়বে। আমার পরে এমন একজন সম্রাট আসবেন, যিনি অজ্ঞানী হবে এবং তার চিন্তাভাবনা হবে সংকীর্ণ। তবে আমি দক্ষ উজির আসাদ খাঁকে রেখে যাব কিন্তু আমার চার পুত্র তাকে নিজের কাজ করতে দেবে না।"
জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী যখন ভুল প্রমাণিত হয়েছিল
জ্যোতিষীদের সব কথাই যে মিলে গেছে, তা নয়। মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া ভবিষ্যদ্বাণী হয় ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, অথবা সেগুলোর কথা কেউ লিখেই রাখেনি।
এরকমই একটি ভুল প্রমাণিত হওয়া ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে জড়িয়েছিলেন বাবরের কন্যা গুলবদন বেগম।
'হুমায়ুন-নামা'তে লেখা হয়েছিল, "জ্যোতিষী মুহাম্মদ শরিফ বলেছিলেন যে খানওয়ার যুদ্ধে যাওয়া বাবরের উচিত হবে না, কারণ নক্ষত্র তার পক্ষে নেই। এটা শুনে সৈন্যরা অস্থির হয়ে পড়েছিল, তাদের সবারই মন খারাপ। কিন্তু বাবর ওই ভবিষ্যদ্বাণী শুনেও নিজের পরিকল্পনায় কোনও অদল-বদল করেনি। "
নিজের সৈন্যদের জড়ো করে তিনি বলেন, "আগ্রা থেকে কাবুল যেতে কয়েক মাস সময় লাগবে। যদি এই লড়াইতে তিনি নিহত হন, তাহলে শহীদের মর্যাদা পাবেন, যদি জীবিত থাকেন তাহলে তার যশ আর প্রতিপত্তি বেড়ে যাবে।"
যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই দিন আগে থেকে বাবর মদ্যপান ছেড়ে দিয়েছিলেন। ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত করে ওই ঐতিহাসিক যুদ্ধে বাবর জয়ী হন, পরাজিত হন রানা সাঙ্গা এবং ভারতকে মুসলমান শাসনাধীন রাখতে সমর্থ হন। ওই যুদ্ধেই ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বারুদ ব্যবহৃত হয়েছিল, যা ওই যুদ্ধে নির্ণায়ক হয়ে উঠেছিল।
লড়াইতে পরাজিত হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে জ্যোতিষী, সেই মুহাম্মদ শরিফকে বাবর দোষ দিয়েছিলেন যে তিনি জেনে বুঝেই ভুল পথে চালিত করেছিলেন। জ্যোতিষীর শাস্তি যদিও হয়নি, তবে তাকে পদচ্যুত করে কাবুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।