পাকিস্তানের বনাম নিউজিল্যান্ডের ম্যাচের পাঁচটি দেখার বিষয়

    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা

প্রায় ২০ দিন ধরে চলতে থাকা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এখন শেষের পথে, চারটি দল এখন পর্যন্ত টিকে আছে- যাদের মধ্যে নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তান আগামীকাল বুধবার প্রথম সেমিফাইনাল ম্যাচে মুখোমুখি হবে।

সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ সময় দুপুর দুইটায় শুরু হবে এই ম্যাচটি।

এই ম্যাচের আগে বিবিসি উর্দুর ক্রিকেট সাংবাদিক আব্দুল রশিদ শাকুর লিখেছেন, “পাকিস্তানের ক্রিকেটে স্বাগত। এখানে যেকোনও দিন যে কোনও কিছু ঘটে যেতে পারে।”

সত্যিই তাই, এই পাকিস্তান দল প্রথম দুই ম্যাচে ভারত ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ বলে হেরে গিয়ে টুর্নামেন্টে বাদ পড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ও বাংলাদেশকে হারিয়ে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসের স্মরণীয় এক জয়ের সহায়তায় পাকিস্তান এখন সেমিফাইনালে।

প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড, প্রথম ম্যাচ থেকেই দলটি দাপটের সাথে ক্রিকেট খেলেছে ব্যাটে বলে।

বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শুরু করে পাঁচ ম্যাচের তিনটিতেই জয় দিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে কেইন উইলিয়ামসনের অধীনে নিউজিল্যান্ড।

‘বাবর আজমের পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দেবেন’

পাকিস্তানের অধিনায়ক বাবর আজম চলতি বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে ভালো করতে পারছেন না।

বল খরচ করে টিকেও তেমন রান যোগ না করেই আউট হয়ে যাচ্ছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ৪১ গড়ে ব্যাট করা এই ব্যাটসম্যান চলতি বিশ্বকাপে মাত্র একবারই ১০ রান পার করতে পেরেছেন।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২২ এ বাবর আজম:

বাংলাদেশের বিপক্ষে ২৫ রান

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৬ রান

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৪ রান

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৪ রান

ভারতের বিপক্ষে ০ রান।

বাবর আজম গত দুই বছরের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন যার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে স্ট্রাইক রেট এবং খেলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন ছিল কিন্তু ব্যাটিংয়ের মান নিয়ে কখনোই প্রশ্ন ওঠেনি।

এবার বাবর আজম বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে নাসুম আহমেদের বল যেভাবে খেলেছেন তাতে মনে হয়েছে তিনি কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছেন, নড়বড়ে এবং দ্বিধায় মনে হয়েছে তাকে।

মাত্র ৬৬ শতাংশ বল বাবর নিজের নিয়ন্ত্রণে খেলতে পারছেন। তবে পাকিস্তানের ব্যাটিং কোচ ম্যাথু হেইডেন একেবারেই ভাবিত নন এই বিষয়ে।

মঙ্গলবার তিনি গণমাধ্যমে বলেছেন, “পুরো বিশ্ব দেখবে বাবর এমন বিশেষ কিছু করে দেখাবে।”

হেইডেন তার সতীর্থ ও ওপেনিং পার্টনার অ্যাডাম গিলক্রিস্টের কথা উদাহরণ হিসেবে টানলেন, “২০০৭ বিশ্বকাপে গিলক্রিস্ট তেমন রান পাচ্ছিলেন না কিন্তু আমরা তার ওপর ভরসা রেখেছি এবং গিলি ফাইনালে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিল।”

বাবর আজমের ওপরও ভরসা না রাখার কোনও কারণ নেই টিম ম্যানেজমেন্টের, একে তো বাবর অধিনায়ক দ্বিতীয়ত গত বিশ্বকাপ থেকে হিসেব করলে বাবর এই ফরম্যাটের চতুর্থ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক।

এই সময়ে তিনি তার ক্যারিয়ার স্ট্রাইক রেটের চেয়ে দ্রুত গতিতে রান করেছেন।

কিন্তু ক্রিকেট পরিসংখ্যানবিদ মাজহার আরশাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বাবর যখন মোহাম্মদ রিজওয়ানের সাথে ব্যাট করতে নামেন তখন তার গড় থাকে ৩২। যখন অন্য ওপেনাররা নামেন তার গড় হয়ে যায় ৫৭।

তার মতে, “রিজওয়ান ক্রিজে থাকলে বাবর ঝুঁকি নিতে বাধ্য হন।”

বাবর নিজেও ব্যাটিং নিয়ে কাজ করছেন। জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফোর প্রতিবেদক অ্যান্ড্রু ম্যাকগ্লাশান টুইট করে জানিয়েছেন, “বাবর আজম আজ সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে একাই নেটে প্র্যাকটিস করেছেন।”

দুই দলের ফাস্ট বোলারদের লড়াই

নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের ফাস্ট বোলাররা দুই দলের খেলার টোন সেট করে দেন।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ট্রেন্ট বোল্ট ও টিম সাউদি যেভাবে আক্রমণাত্মক শুরু করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা আর দাঁড়াতেই পারেননি।

পাকিস্তানের শাহীন শাহ আফ্রিদি, নাসিম শাহ, হারিস রওফের সাথে যোগ দিয়েছেন মোহাম্মদ ওয়াসিম - ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ৩১ রানে চার উইকেট নিয়ে নিয়েছিলেন এই বোলাররা।

শাহীন শাহ আফ্রিদি ৫ ম্যাচে ইতোমধ্যে আট উইকেট নিয়েছেন। এই ফাস্ট বোলার চোট কাটিয়েই বিশ্বকাপ দিয়ে মাঠে ফিরেছেন।

তিনি ওভারপ্রতি ছয়ের একটু বেশি রান দিচ্ছেন।

পাকিস্তানের বোলাররা ভারতকে ১৬০ রানে, জিম্বাবুয়েকে ১৩০ রানে, নেদারল্যান্ডসকে ৯১ রানে, দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১০৮ রানে ও আজ বাংলাদেশকে ১২৭ রানে আটকে রেখেছে।

ট্রেন্ট বোল্ট ও টিম সাউদি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেরই সেরা ফাস্ট বোলারদের তালিকায় আছেন।

সাউদি এখন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক।

খানিকটা খরুচে হলেও লকি ফারগুসনও উইকেট নিচ্ছেন নিয়মিত, ৪ ম্যাচে সাত উইকেট নিয়েছেন তিনি।

এই দুই দলের ফাস্ট বোলাররা ম্যাচে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।

পাকিস্তানের ব্যাটিং কোচ ম্যাথু হেইডেনের মতেও, নিউজিল্যান্ডের পেস অ্যাটাক ভয়ংকর এবং অভিজ্ঞ। টিম সাউদি হেইডেন যখন ক্রিকেট খেলতেন তখন থেকেই মাঠে আছেন।

নিউজিল্যান্ডের ওপেনাররা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন

বিবিসি উর্দুতে একটি কলামে পাকিস্তানের ক্রিকেট বিশ্লেষক সামি চৌধুরী লিখেছেন, “পাকিস্তানের উচিৎ নিজেদের ওপেনারদের কথা বাদ দিয়ে প্রতিপক্ষের ওপেনারদের নিয়ে ভাবা।”

যেমন ফিন অ্যালেন। নিউজিল্যান্ডের এই ওপেনার সুপার টুয়েলভ পর্বে প্রথম ম্যাচে খেলতে নেমেই ১৬ বলে ৪২ রান তুলে নিউজিল্যান্ড দলের শারীরিক ভাষায় একটা ইতিবাচকতা নিয়ে এসেছিলেন।

ফিন অ্যালেন শাহীন শাহ আফ্রিদির বল কেমন মোকাবেলা করেন সেটা হবে দেখার মতো একটি বিষয়।

শুরু থেকেই বল পিটিয়ে দ্রুত রান তোলার জন্য পরিচিত ফিন অ্যালেন।

ফিন অ্যালেনের সাথে নামেন ডেভন কনওয়ে যিনি প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৯২ রানের অপরাজিত একটি ইনিংস খেলেছিলেন।

পাকিস্তানের সেরা পারফর্মার শাদাব খান

শাদাব খান ছিলেন অসাধারণ।

এখনও পর্যন্ত পাকিস্তানের সেরা পারফর্মার শাদাব খান।

তিনি পাঁচ ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়েছেন চলতি টুর্নামেন্টে।

এগা গড় এবং ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন ছয়ের একটু বেশি।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচটিতে ব্যাট হাতেও ফিফটি তুলে নিয়েছিলেন।

শাদাবকে যথাযথ ইমপ্যাক্ট ক্রিকেটার মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শাদাব খানকে নিয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেট পরিসংখ্যানবিদ মাজহার আরশাদ শুরু থেকেই আশাবাদী ছিলেন, তিনি পাকিস্তানের এই ক্রিকেটারকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য যথাযথ মনে করেন।

ধারাভাষ্যকার সঞ্জয় মানজ্রেকার মনে করেন, শাদাব খান যে কোনও দলে 'ভ্যালু অ্যাড করেন'।

পাকিস্তানের হয়ে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি উইকেটের মালিকের তালিকায় এখন শহীদ আফ্রিদির সাথে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন শাদাব খান।

শাদাব ৯৭ উইকেট নিয়েছেন ৮২ ম্যাচে, শহীদ আফ্রিদি ৯৮ ম্যাচে।

নিউজিল্যান্ডের সেরা পারফর্মার গ্লেন ফিলিপস

চলতি বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দলকে প্রায় খাদের কিনার থেকে তুলে একটি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান গ্লেন ফিলিপস।

ফিলিপস একজন ‘জ্যাক অফ অল ট্রেডস’ ক্রিকেটার, যিনি দুর্দান্ত ফিল্ডার, উইকেট কিপিং পারেন, বল হাতেও প্রভাব রাখতে পারেন।

গত এক বছরে নিউজিল্যান্ডের হয় আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে গ্লেন ফিলিপসের চেয়ে বেশি ছক্কা কেউই হাঁকাননি।

সুপার টুয়েলভ পর্বের প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মার্কাস স্টয়নিসকে আউট করতে গিয়ে গ্লেন ফিলিপস শরীর শূণ্যে ভাসিয়ে একটি ক্যাচ ধরেছিলেন, যেটা বিশ্বকাপের হাইলাইটসে শতবার দেখানো হলেও পুরনো হবে না।

এই ক্যাচ ম্যাচে প্রভাব তো ফেলেছিলই একই সাথে নিউজিল্যান্ডের গোটা টুর্নামেন্টের সুর ঠিক করে দিয়েছে, যে কোনও কিছু সম্ভব, চেষ্টা করতে হবে কেবল এমন একটা মোমেন্টাম তৈরি করে দিয়েছেন গ্লেন ফিলিপস।