ভারতের রাজদণ্ড 'সেঙ্গোল' কি ১৯৪৭-এর ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক?

জওহরলাল নেহরুর হাতে সেঙ্গোল তুলে দিয়েই প্রতীকী ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল বলে দাবী ভারত সরকারের

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, জওহরলাল নেহরুর হাতে সেঙ্গোল তুলে দিয়েই প্রতীকী ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল বলে দাবী ভারত সরকারের
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা

আগামী রবিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশটির নতুন পার্লামেন্ট ভবন উদ্বোধন করার সময়ে সেখানে একটি রাজদণ্ড স্থাপন করবেন, যেটিকে ১৯৪৭ এর ১৪-১৫ অগাস্ট মধ্যরাতে ব্রিটিশদের থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক বলে সরকারীভাবে বলা হচ্ছে।

কিন্তু ঐতিহাসিকরা বলছেন, ওই ‘রাজদণ্ড’ বা সেঙ্গোল দিয়ে যে প্রতীকী ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল, তার কোনও প্রমাণই নেই।

বুধবার ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “১৪ই অগাস্ট ১৯৪৭ এক ঐতিহাসিক ঘটনা হয়েছিল। তার ৭৫ বছর পরে আজ দেশের অনেকই জানেন না ঘটনাটি। সেদিন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক ছিল এই সেঙ্গোল।"

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিষয়টা জানার পরে খোঁজ খবর করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাই দেশের মানুষের সামনে সেটিকে রাখা হবে বলে জানান মি. শাহ।

জওহরলাল নেহরুর হাতে ধরা সেঙ্গোল কি আদৌ ১৯৪৭ এ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক?

ছবির উৎস, Govt. of India

ছবির ক্যাপশান, জওহরলাল নেহরুর হাতে ধরা সেঙ্গোল কি আদৌ ১৯৪৭ এ ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক?

তামিল পুরোহিতরা নেহরুর হাতে তুলে দেন সেঙ্গোল

প্রাচীন তামিল রাজবংশ চোলা শাসনকালে রাজার অভিষেকের সময়ে পুরোহিতরা একটি রাজদণ্ড বা 'সেঙ্গোল' তুলে দিতেন নতুন রাজার হাতে - যেটিকে সেই সময়ে সুশাসনের প্রতীক বলে মনে করা হত।

‘সেঙ্গোল’ সংক্রান্ত একটি সরকারী ওয়েবসাইট উদ্বোধন করা হয়েছে বুধবার।

সেখানে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী “১৪ অগাস্ট রাত বারোটার সামান্য আগে তামিলনাডুর থিরুভাদুথুরাই আথিনাম মঠের প্রধান পুরোহিত প্রথমে সেঙ্গোল বা রাজদণ্ডটি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের হাতে তুলে দেন, তার পরে আবার তা ফিরিয়ে নেন।

ওই সরকারী ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে “তারপরে সেটিকে পবিত্র জল দিয়ে শোধন করে ১৪ই অগাস্ট ১১টা ৪৫ মিনিটে জওহরলাল নেহরুর হাতে তুলে দেন সেই পুরোহিত।

“এই শক্তিশালী প্রতীকটি ১৯৪৭ সালের অগাস্টে ভারতের স্বাধীনতাকে চিহ্নিত করার জন্য গ্রহণ করা হয়েছিল,” লেখা হয়েছে ওই ওয়েবসাইটে।

'সেঙ্গোল গণতন্ত্রের নয়, রাজতন্ত্রের প্রতীক', বলছেন ডিএমকে নেতা এলানগোভান

ছবির উৎস, Govt. of India

ছবির ক্যাপশান, 'সেঙ্গোল গণতন্ত্রের নয়, রাজতন্ত্রের প্রতীক', বলছেন ডিএমকে নেতা এলানগোভান

‘সেঙ্গোল গণতন্ত্রের নয়, রাজতন্ত্রের প্রতীক’

তামিলনাডুতে অনেক নেতানেত্রীকে মঠের তরফ থেকে রূপোর সেঙ্গোল দেওয়া হয়ে থাকে বিশেষ কোনও অনুষ্ঠানে।

এই প্রথা প্রাচীন রাজাদের সময় থেকে চলে আসছে বলে এটিকে রাজতন্ত্রের প্রতীক হিসাবেই দেখা হয়।

তামিলনাডুর ক্ষমতাসীন ডিএমকের মুখপাত্র টিকেএস এলানগোভান সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, “সেঙ্গোল গণতন্ত্রের প্রতীক নয়, এটি রাজতন্ত্রের প্রতীক। কোনও রাজনৈতিক দল বা নেতা সেঙ্গোল দেন না, শুধুমাত্র মঠের তরফেই দেওয়া হয় সেঙ্গোল। আর মঠগুলিও তো রাজতন্ত্রেরই প্রতিষ্ঠান।“

'টাইম' পত্রিকার ২৫ অগাস্ট, ১৯৪৭ সালের সেই পৃষ্ঠা, যেখানে ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের বিস্তারিত প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল
ছবির ক্যাপশান, 'টাইম' পত্রিকার ২৫ অগাস্ট, ১৯৪৭ সালের সংখ্যাটির সেই পৃষ্ঠা, যেখানে ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের বিস্তারিত প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল

সেঙ্গোল দিয়ে প্রতীকী ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনও প্রমাণ নেই

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের রাতের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছিল যেসব দেশী-বিদেশী সংবাদমাধ্যমে, তাদের প্রতিবেদনের সঙ্গে এই সরকারী তথ্য মিলছে না।

‘টাইম’ম্যাগাজিন তাদের ২৫ অগাস্ট, ১৯৪৭ সালের সংখ্যায় বিস্তারিত বর্ণনা করেছিল ১৪ আর ১৫ই অগাস্টের ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনাবলি।

সেই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল যে তামিলনাডু থেকে আসা পুরোহিতরা জওহরলাল নেহরুর হাতে একটি সেঙ্গোল তুলে দেন।

একটি ফোর্ড গাড়িতে চেপে মি. নেহরুর বাসভবনে গিয়েছিলেন ওই পুরোহিতরা, তারা মন্ত্র পাঠ করেন, মি. নেহরুর কপালে ‘পবিত্র বিভূতি’ লেপে দেন, ইত্যাদি সবই বর্ণনা করা হয়েছিল ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের ওই প্রতিবেদনে।

কিন্তু সেখানে কোথাও উল্লেখ নেই যে ওই তামিল পুরোহিতরা মি. নেহরুর বাড়িতে আসার আগে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে গিয়েছিলেন এবং তাকে প্রথমে সেঙ্গোলটি দিয়েছিলেন, আর তারপরে সেটি তারা মি. নেহরুর হাতে তুলে দেন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক হিসাবে।

মি. নেহরুর হাতে একটি সেঙ্গোল ধরা আছে, এই ছবি থাকলেও লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে ওই তামিল পুরোহিতদের কোনও ছবি নেই।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাসের গার্ডিনার অধ্যাপক সুগত বসু ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস বিষয়ে পণ্ডিত।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “১৪ আর ১৫ই অগাস্ট মাঝরাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়ে দুটো ঘটনা হয়েছিল: একটি গণপরিষদে জওহরলাল নেহরুর বিখ্যাত ভাষণ আর দ্বিতীয়টি ছিল যুক্তরাজ্যের ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা নামিয়ে ভারতের তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন।"

"কোনও সেঙ্গোল বা রাজদণ্ড হাতবদল করে প্রতীকী ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছিল, এরকম কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ আমি কোথাও পাই নি।“

অমরেন্দ্রন উম্মিদি, ভাম্মুরি বঙ্গারু জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক
ছবির ক্যাপশান, অমরেন্দ্রন উম্মিদি, ভাম্মুরি বঙ্গারু জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক

সেঙ্গোল দিয়ে প্রতীকী ক্ষমতা হস্তান্তরের কাহিনী কীভাবে জানা গেল ?

বিবিসির তামিল বিভাগের সহকর্মী মুরলিথরন জানাচ্ছিলেন যে ২০১৭ সাল থেকে তামিল পত্রপত্রিকায় এই বিষয়টি নিয়ে লেখা শুরু হয়।

মি. নেহরুর হাতে থাকা একটি সেঙ্গোলের ছবিও পাওয়া যায়। সেটি যে চেন্নাইয়ের স্বর্ণশিল্পী ভাম্মুরি বঙ্গারু চেট্টিকে দিয়ে তৈরি করানো হয়েছিল, সেটাও জানা যায়।

ভাম্মুরি বঙ্গারু চেন্নাইয়ের একটি বিখ্যাত গহনার দোকান।

সংস্থার প্রধান অমরেন্দ্রন উম্মিদি বিবিসিকে বলেছেন, “পত্রিকায় বিষয়টি জানার পরে আমরা দেশের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় ছবি সহ চিঠি পাঠাই। বেশ কিছুদিন পরে এলাহাবাদের সংগ্রহশালা আমাদের জানায় যে তাদের কাছেই আছে ওই সেঙ্গোলটি।“

“আমরা সেখানে গিয়ে স্বচক্ষে দেখি যে ছবির সেঙ্গোলটিই ওখানে রাখা আছে। আমরা একটি ভিডিও বানাই। সেটি ভাইরাল হয়ে যায়,” জানাচ্ছিলেন মি. উম্মিদি।

এখন তারা পুরনো সেঙ্গোলের আদলে আরেকটি রাজদণ্ড তৈরি করে দিল্লিতে পাঠিয়েছেন।

তামিল পত্রিকা ‘তুঘলক’এও বিষয়টি নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় ২০২১ সালে।

নৃত্যশিল্পী পদ্মা সুব্রহ্মনিয়াম সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানিয়েছেন যে তিনিই ‘তুঘলক’ পত্রিকার প্রতিবেদনটি অনুবাদ করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠিয়েছিলেন।

“এরকম একটি ঐতিহাসিক ব্যাপার, আমি মনে করেছিলাম যে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতে বিষয়টি দেশের মানুষের সামনে আসা উচিত। তাই আমি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছিলাম। দীর্ঘদিন কোনও জবাব না পেয়ে আমি ভেবেছিলাম চিঠিটাকে কেউ বোধহয় গুরুত্বই দেয় নি। কিন্তু এখন জানলাম যে ওই সেঙ্গোলটি ভারতের নতুন সংসদ ভবনে স্থাপন করা হবে। দারুণ আনন্দিত আমি,“ জানিয়েছেন ওই নৃত্যশিল্পী।

ওই চিঠির ভিত্তিতে সরকারী প্রতিষ্ঠান ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্টস সেঙ্গোল নিয়ে গবেষণা শুরু করে ।

সংস্থাটির সদস্য সচিব সচ্চিদানন্দ যোশী দ্য হিন্দু পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, “সেই সময়ে দেশে দাঙ্গা এবং দেশভাগের মধ্যেই ওই অনুষ্ঠানটি করতে হয়েছিল কম সময়ের মধ্যে। যেহেতু এটি কোনও সরকারী বা আইনি অনুষ্ঠান নয়, তাই তার কোনও রেকর্ড কোথাও নেই। সম্ভবত সেই জন্যই পবিত্র সেঙ্গোল এবং সেটি হস্তান্তরের ঘটনাটাই প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছিল।“

দ্য মাউন্টব্যাটেন পেপার্স

ছবির উৎস, University of Southampton website

ছবির ক্যাপশান, দ্য মাউন্টব্যাটেন পেপার্স

‘দ্য মাউন্টব্যাটেন পেপার্স’

ভারত সরকারের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, "ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে শেষ ব্রিটিশ বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন জওহরলাল নেহরুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে প্রতীকী ক্ষমতা হস্তান্তরটা কীভাবে করা যায়।

"মি. নেহরু ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারীর কাছে পরামর্শ চান। তিনিই পরামর্শ দেন যে তামিলনাডুতে এরকম একটি প্রাচীন রীতি আছে যে মঠের প্রধান পুরোহিত নতুন রাজার হাতে এই রাজদণ্ড তুলে দেন,” জানাচ্ছে ওই সরকারী ওয়েবসাইট।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তৎকালীন ম্যাড্রাসের এক স্বর্ণ শিল্পীকে দিয়ে সেঙ্গোলটি তৈরি করিয়ে ১৪ – ১৫ অগাস্টের মধ্যরাতের পনেরো মিনিট আগে সেটি প্রথমে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের হাতে এবং তার হাত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে শোধন করে তা তুলে দেওয়া হয় জওহরলাল নেহরুর হাতে। সেটাই নাকি প্রতীকী ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল।

তবে যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে রাখা ‘দ্য মাউন্টব্যাটেন পেপার্স-এ এই ঘটনার উল্লেখ নেই।

১৩ তারিখ দুপুরে তিনি দিল্লি থেকে করাচী যান পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। ১৯৪৭ সালের ১৩, ১৪ অগাস্ট লর্ড মাউন্টব্যাটেন প্রথমে পাকিস্তানের করাচীতে আর তারপরে ১৪ তারিখ দুপুরে দিল্লিতে ফিরে এসে পরের দিন ১৫ অগাস্ট ভারতের হাতে ঠিক কিভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, তার খুঁটিনাটি কার্যক্রম স্থির করা হয়েছিল ২৮ জুলাইয়ের একটি বৈঠকে।

দ্য মাউন্টব্যাটেন পেপার্সের এমএস৬২/এমবি/১/ডি/২৯/১৪ রেফারেন্স নম্বরের দলিলে লেখা আছে ১৩ তারিখ দুপুরে লাঞ্চের পরে দুপুর দেড়টায় তিনি দিল্লির পালাম থেকে করাচীর বিমান ধরবেন, তারপরে রাত সাড়ে আটটায় মুহম্মদ আলি জিন্নাহ এবং অন্যান্য ভিআইপিদের সঙ্গে ডিনার করবেন, পরের দিন ১৪ অগাস্ট সকাল নয়টার সময়ে করাচীর গভর্নমেন্ট হাউস থেকে বেরিয়ে পাকিস্তান গণ পরিষদে পৌঁছবেন।

সেখানে পর পর কী কী কর্মসূচী থাকবে – সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল ২৮ জুলাইয়ের বৈঠকে।

পাকিস্তানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে কোন বাহিনী কোন জায়গায় তাকে গার্ড অফ অনার দেবে, তারপরে তিনি কখন বিমানবন্দরে যাবেন এবং তিনি যে বিমানেই লাঞ্চ সারবেন, এতটাই বিস্তারিত সিদ্ধান্ত হয়েছিল ওই বৈঠকে।

দিল্লিতে তার বিমান নামবে বিকেল সাড়ে তিনটের সময়ে এটাও লেখা আছে ওই বৈঠকের বিবরণীতে। সেদিনের কর্মসূচী সেখানেই শেষ।

আবার ১৫ তারিখ সকাল থেকে ভারতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কর্মসূচী সাজানো হয়েছিল এভাবে : সকাল নয়টা দশ মিনিটে গভর্নর হাউসের দরবার সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামবেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন, ‘স্টেট ক্যারেজে চেপে লর্ড এবং লেডি মাউন্টব্যাটেন গণ পরিষদের দিকে রওনা হবেন। মি. নেহরু এবং মি. প্যাটেল (বল্লভভাই প্যাটেল) আধা ‘স্টেট ক্যারেজ’এ চেপে পিছনে আসতে পারেন, যদি তারা চান।

এত বিস্তারিত পরিকল্পনার উল্লেখ আছে ‘দ্য মাউন্টব্যাটেন পেপার্স’-এর নথিতে, অথচ ‘ভারতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছিল জওহরলাল নেহরুর হাতে একটি সেঙ্গোল বা রাজদণ্ড তুলে দিয়ে’, এই বিষয়টা না থাকা সেটা বেশ আশ্চর্যের।

পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে করাচীতে বাঁদিক থেকে ফতিমা জিন্না, মুহম্মদ আলি জিন্না লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও লেডি মাউন্টব্যাটেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে করাচীতে বাঁদিক থেকে ফতিমা জিন্না, মুহম্মদ আলি জিন্না লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও লেডি মাউন্টব্যাটেন

সেঙ্গোল আসলে একটি স্বর্ণ অলঙ্কার মাত্র?

ইতিহাসবিদ সুগত বসু বলছেন, “ক্ষমতা হস্তান্তরের দিন ১৪-১৫ অগাস্টের মাঝরাতে মি. রাজাগোপালাচারী দিল্লিতেই ছিলেন না। তার আগেই দাঙ্গা-বিধ্বস্ত কলকাতায় তাকে গভর্নর করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন জওহরলাল নেহরু।“

তার কথায়, “এলাহাবাদে মি. নেহরুর পৈত্রিক বাড়ি আনন্দ ভবন। সেখানকার সংগ্রহশালায় ওই সেঙ্গোলটি রাখা ছিল, এটা খুবই সম্ভব। কিন্তু সেটা যে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতীক, এটা সঠিক নয়।"

"সেটি একটি স্বর্ণ অলঙ্কার বড়জোর, যা তামিল পুরোহিতরা মি. নেহরুকে উপহার স্বরূপ দিয়েছিলেন। এটা তেমন কোনও ঐতিহাসিক ঘটনাও নয় যে নতুন সংসদ ভবনে সেটিকে এত গুরুত্ব দিয়ে রাখতে হবে। সেই সময়ে স্বাধীনতা, দেশ ভাগ, দাঙ্গা এগুলোই ছিল সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা।“

তাহলে কী শুধুমাত্র জওহরলাল নেহরুর হাতে ধরা সেঙ্গোলের একটা ছবি দিয়ে, - কোনও আনুষ্ঠানিক রেকর্ড, এমনকি কোনও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ ছাড়াই - একটা সাধারণ স্বর্ণালঙ্কারকে অতি গুরুত্ব সহকারে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঐতিহাসিক প্রতীক হিসাবে তুলে ধরে সেটিকে নতুন সংসদ ভবনে স্থাপন করা হচ্ছে?