সিকিমের তিস্তায় আকস্মিক বন্যা: যেভাবে নিখোঁজ হলেন ২২ সেনা সদস্য

ছবির উৎস, D R THAPA
হিমালয়ার ছোট রাজ্য সিকিমে ব্যাপক বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা যা স্থানীয়ভাবে হড়পা বান নামে পরিচিত, তাতে এ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ২২ জন সদস্য সহ ৮২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সেনাবাহিনীর ২৩ জন ভেসে গিয়েছিলেন, একজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেছে। মোট মৃতের সংখ্যা রাতে বেড়ে হয়েছে ১০।
একই সাথে সেনাবাহিনী ও ভারত তিব্বত সীমা পুলিশের অনেকগুলি ছাউনি, গাড়ি এবং বহু বসতবাড়ি নদীর জলে ভেসে গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সিকিমের তিস্তা নদীতে এমন ভয়াবহ জলের তোড় আর ধ্বংসলীলা তারা কখনও দেখেছেন বলে মনে করতে পারছেন না।
সিকিম থেকে বানের জলে ভেসে আসা দুটি মৃতদেহ এবং সাতটি সেনাবাহিনীর গাড়ি তিস্তা নদীর ওপরে তৈরি গাজোলডোবা ব্যারেজে আটকে যাওয়ার পরে উদ্ধার করা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুধবার মানে আজকের রাত খুবই উদ্বেগজনক হতে চলেছে।
তাদের কথায় সিকিমে এখনও বৃষ্টি হয়ে চলেছে, সঙ্গে তিস্তার ওপরে তৈরি একাধিক বাঁধ থেকে জল ছাড়া হয়েছে।
সেই জল সমতলে নামছে এবং এরপরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকবে। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যেভাবে নিখোঁজ হলেন সেনা সদস্যরা
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আকস্মিক বন্যায় সেনাবাহিনী এবং ভারত-তিব্বত সীমান্তে পুলিশের বেশ কয়েকটি ছাউনি, গাড়ি এবং বহু বসতবাড়ি নদীর জলে ভেসে গেছে।
উত্তর সিকিম জেলার মাঙ্গনের সবথেকে উঁচু এলাকা বলে পরিচিত চুংথাম বাঁধ। এই বাঁধটি ১২শো মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তিস্তা স্টেজ ৩ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।
চীন সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থান হওয়ার কারণে সিকিমের এ অঞ্চলটি কৌশলগত কারণে ভারতের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এবং কাছাকাছি দূরত্বে বেশ অনেকগুলি সেনা ছাউনি রয়েছে ওই অঞ্চলটিতে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্ব কমাণ্ড থেকে জানানো হয়, চুংথাম বাঁধ থেকে ছাড়া জলের তোড়ে সিংথামের একটি সেনা ছাউনিতে কর্তব্যরত ২৩ জন সেনা সদস্য ভেসে গেছেন। রাতে সেনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে একজন সেনা সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করা গেছে।
সাথে সেখানে যেসব গাড়ি সিংথামের কাছে সেনাবাহিনীর বারদাং-এ দাঁড় করানো ছিল সেগুলো ভেসে যায়।
এছাড়া পার্বত্য ওই উপত্যকার অন্য সামরিক স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, D R THAPA
সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তর সিকিম
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
লাচেন উপত্যকার লোনাক হ্রদের ওপরে একটা মেঘভাঙ্গা বৃষ্টি হয় মঙ্গল ও বুধবার মাঝরাতের পরে। তার সঙ্গে গত কয়েকদিনের একটানা বৃষ্টিপাতও ছিল।
মেঘভাঙা বৃষ্টি বলতে সাধারণত অতি ভারী বৃষ্টি, যা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় হয় তাকে বোঝায়।
আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, এক ঘন্টায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১০ সেন্টিমিটার অথবা আধঘন্টায় পাঁচ সেন্টিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টি হলে সেটাকেই মেঘভাঙ্গা বৃষ্টি বা ক্লাউড বার্স্ট বলা হয়।
লোনাক হ্রদের ওপর ওই মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টিতে তিস্তায় জলের পরিমাণ হঠাৎই খুব বেড়ে যাওয়ায় চুংথাম বাঁধ খুলে দিতে হয়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাঁধটির কয়েকটি জায়গা ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে।
সিংথাম থেকে রাজধানী গ্যাংটকে ফিরে এসে রাজ্য বিজেপির সভাপতি ডিআর থাপা বলেছেন, সিকিমে অনেক হড়পা বান মানে আকস্মিক বন্যা এবং অতিবৃষ্টি দেখেছেন তিনি, কিন্তু এমন বিধ্বংসী তিস্তা তিনি আগে দেখেন নি।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “নদীর আশপাশে যত এলাকা আছে, বসতবাড়ি ও সেনা ছাউনি, গাড়ি, সব ভেসে গেছে।
"সব থেকে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সিংথাম অঞ্চলে। ওখানে আজ সকালে পৌঁছে দেখতে পাই তিনতলা বাড়ি পর্যন্ত জল উঠে গিয়েছিল। অন্তত ২০-২৫ ফুট জল বয়ে গেছে সেখানে।”
তিস্তায় জলের পরিমাণ হঠাৎই খুব বেড়ে যাওয়ায় চুংথাম বাঁধ খুলে দিতে হয়।
এদিকে, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী জানাচ্ছে কয়েকজন ট্রেকার, সেনা এবং ভারত-তিব্বত সীমা পুলিশের কয়েকজন সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন।
এর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার পর্যটক আটকে পড়েছেন সিকিমে।

ছবির উৎস, D R THAPA
'সেনাবাহিনীর স্যাটফোনই যোগাযোগের একমাত্র উপায়'
হিমালয়ের পাদদেশের শহর শিলিগুড়ি থেকে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানালেন, চুংথাম বাঁধে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া ১৪টি সেতু, সিকিমের সঙ্গে বাকি দেশের যোগাযোগ রক্ষাকারী মূল রাস্তা ১০ নম্বর জাতীয় মহাসড়ক একাধিক জায়গায় ভেঙ্গে গেছে জলের তোড়ে।
“যোগাযোগটাই সবথেকে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে উদ্ধার কাজের ক্ষেত্রে।
সেনাবাহিনীর স্যাটেলাইট ফোনই দুর্গম এলাকায় যোগাযোগের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে,” বলছিলেন ওই কর্মকর্তা।
তার বাহিনীর উদ্ধারকারী দলগুলি উত্তর সিকিম এবং রংপো এবং উত্তরবঙ্গের সমতলের অঞ্চলগুলিতে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে অন্য জায়গা থেকে আরও তিনটি বাহিনী নিয়ে আসা হচ্ছে।
এবং যেহেতু মূল সংযোগকারী রাস্তাটি অনেক জায়গায় ভেঙ্গে গেছে, তাই আকাশপথে তাদের নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।

ছবির উৎস, INDIAN ARMY
কীভাবে এত বাড়ি, রাস্তা ধ্বংস?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকস্মিক বন্যায় এত বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে।
উত্তরবঙ্গের নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুবীর সরকার বলছেন, “মেঘভাঙ্গা বৃষ্টির ফলে লোনাক হ্রদের জল বেড়ে গেছে আবার তিস্তার অববাহিকা অঞ্চলে সমানে বৃষ্টি হয়ে চলেছে।
আর তিস্তা নদীর ঢাল খুবই খাড়া, তাই ওই বিপুল জলরাশি প্রচণ্ড স্রোতে নেমে আসে নীচের দিকে। দুপাশের এলাকায় ধ্বংসলীলা চালায় ওই জলস্রোত।
তিনি আরো বলছেন যে, অনেক বছর ধরেই পাহাড়ি নদীগুলির পাশে মানুষের বসতি বাড়ছে।
“ওখানে যেহেতু সমতল জমি পাওয়া যায় না, নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেই কিছুটা জমি থাকে। মানুষ সেই জায়গাগুলোই দখল করে বাড়ি, শহর বানাচ্ছে।”
মি. সরকার বলেছেন, এ কারণে নদীর জল বেড়ে গেলে পাশের এলাকাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
তবে এ সমস্যা শুধু সিকিমের নয়, উত্তরাখণ্ডেও একই সমস্যা আছে।

ছবির উৎস, INDIAN ARMY
'বুধবার রাত উদ্বেগের'
যদিও সিকিমে এখনও বৃষ্টি হয়ে চলেছে, তবে তিস্তার জল বুধবার দিনের বেলায় সমতলের দিকে নামতে শুরু করেছে।
ইতিমধ্যেই গাজোলডোবা সহ জলপাইগুড়ি জেলার নানা জায়গায় জলের স্তর বেড়ে গেছে।
জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, চারটি ব্লকে ১৭টি আশ্রয় শিবির খোলা হয়েছে, যাতে তিন হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।
ভারতীয় আবহাওয়া বিজ্ঞান দপ্তর সতর্কতা জারি করে বলছে, “গাজোলডেবা, দোমহনীর মতো নিচু অঞ্চলগুলি প্রভাবিত হতে পারে বাড়তি জলস্তরের কারনে।“
তবে মি. সরকার বলছেন, “জল পাহাড় থেকে নেমে এলে সেটা ছড়িয়ে পড়বে অববাহিকা অঞ্চলে। তাই বন্যা হবেই।
এখন গাজলডোবা দিয়ে যে বাড়তি জল যাচ্ছে বাংলাদেশের দিকে, সেগুলো তিস্তার ওপরে বিভিন্ন বাঁধ থেকে ছেড়ে দেওয়া জল। মেঘভাঙ্গা বৃষ্টির জল বুধবার রাতের দিকে নামবে। সমতল অঞ্চলে সেই জল ছড়িয়ে পড়ার ফলে খুব বড় বন্যা হয়তো হবে না।“
তিনি বলছেন এখনও পর্যন্ত যে জলস্তর আছে, সেরকম আগেও হয়েছে, কিন্তু পাহাড়ে যদি বৃষ্টি যদি না থামে, তাহলে তিস্তা দিয়ে নামা জলের পরিমাণ অনেকটা বেড়ে যাবে।
সেক্ষেত্রে বড় বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেটা স্পষ্ট হবে বুধবার রাতের দিকে।
সে কারণে বুধবারের রাত হবে উদ্বেগের।











