বাজেট প্রতিক্রিয়ায় ‘আজিজ-বেনজীর ও অলিগার্ক’ ইস্যুতে যা বললো বিএনপি

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের নেতারা

ছবির উৎস, BNP Media Cell

ছবির ক্যাপশান, সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের নেতারা

বিরোধী দল বিএনপি বলেছে ‘সরকারের আনুকূল্যে বেড়ে ওঠা আজিজ-বেনজীরদের মত দুর্নীতিবাজদের কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ সৃষ্টির জন্যই’ বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে।

জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের বাজেটের বিষয়ে দলের চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে রবিবার অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ মন্তব্য করেছেন।

“এই বাজেট কালো টাকা সাদা করার বাজেট। কালো টাকায় ঢালাও দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। সরকারের কোন সংস্থাই কালো টাকা সাদাকারীদের কোন প্রশ্ন করতে পারবে না। অর্থাৎ দায়মুক্তি বা আইনি ছাড় দেয়া হয়েছে। এর ফলে সৎ ও বৈধ আয়ের করদাতাদের নিরুৎসাহিত ও দুর্নীতিকে সরকারিভাবে উৎসাহিত করা হলো,” বলছিলেন মি. আলমগীর।

তবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ শেষ হওয়ার পর একজন সাংবাদিক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের উদ্ধৃতি করে মি. আলমগীরের কাছে জানতে চান যে বিএনপি আমলেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছিলো কি না।

জবাবে মি. আলমগীর বলেন, কালো টাকা ও অপ্রদর্শিত আয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে, তবে তখন কি হয়েছিলো সেটি এই মুহূর্তে তার মনে নেই। তবে তিনি দাবি করেন যে ‘সামস্টিক অর্থনীতি বিএনপির আমলেই সবচেয়ে ভালো ছিলো’।

প্রসঙ্গত, অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মোহাম্মদ আলী গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য প্রায় আট লাখ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি সেই বাজেট প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে দলটি যে ‘আজিজ-বেনজীর’ এর কথা উল্লেখ করেছে সেটি মূলত সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আজিজ আহমেদ ও সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদকে ইঙ্গিত করে।

দুর্নীতির অভিযোগে আজিজ আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের প্রেক্ষাপটে আদালতের আদেশের বেনজীর আহমেদের বিপুল সম্পদ কর্তৃপক্ষ জব্দ করেছে।

তবে এর আগে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় বেনজীর আহমেদ ও গণমাধ্যমে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় আজিজ আহমেদ তাদের বিরুদ্ধে আসা দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
বাজেটে কোন খাতে কত ব্যয়

ছবির উৎস, MINISTRY OF FINANCE, BD

ছবির ক্যাপশান, বাজেটে কোন খাতে কত ব্যয়

‘বাজেট অলিগার্কদের জন্য’

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ বাজেট দেশের গুটিকয়েক অলিগার্কদের জন্য, যারা শুধু চুরিই করছে না- তারা ব্যবসা করছে, তারাই পলিসি প্রণয়ন করছে, আবার তারাই পুরো দেশ চালাচ্ছে।

“দেশ আজ দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। এই বাজেট কল্পনার এক ফানুস। এই বাজেট ফোকলা অর্থনীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে। বাজেট প্রণয়নের জন্য যে সম্পদ প্রয়োজন সেটাই এ অলিগার্করা লুট করে নিয়েছে”।

প্রসঙ্গত, কিছু রাশিয়ান ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অলিগার্ক হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়, যাদের ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর উত্থান হয়েছে। তারা খুবই ধনাঢ্য, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এবং ক্ষমতাসীনদের সাথে ঘনিষ্ঠ থাকে, অলিগার্ক হিসেবে তাদের আখ্যা দেয়া হয়।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু অলিগার্ক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিবর্গের অর্থ লেনদেনের উপর অবরোধ আরোপ করেছে।

মি. আলমগীর বলেছেন, “ব্যাংকগুলো খালি। সরকারের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে অলিগার্করা ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোকে শূন্য করে দিয়েছে। এ অর্থের সিংহভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। মানুষের মধ্যে নজিরবিহীন হাহাকার তৈরি হয়েছে”।

তিনি বলেন এই বাজেট দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দখলদার আওয়ামী সরকার ও তাদের মাফিয়া গুরুদের মাঝে ভাগাভাগির এক সুনির্দিষ্ট ইজারাপত্র। “এটি স্পষ্ট যে বাজেটটি এমন কতিপয় ব্যক্তির মুনাফার জন্য প্রণীত হয়েছে যারা এই অবৈধ সরকারকে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে সাহায্য করছে”।

দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে রয়েছে বিএনপি
ছবির ক্যাপশান, দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে রয়েছে বিএনপি

মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণ

বিএনপি মহাসচিব তার লিখিত বক্তৃতায় বলেছেন বাজারে চরম মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যও এখন বিলাসী পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

“সবকিছুর দামেই আগুন লেগেছে। মানুষের কেনার ক্ষমতা নেই। মানুষ সঞ্চয় ভেঙ্গে খাচ্ছে। অনেকের সঞ্চয়ও নেই। মাছ, মাংস, ডিম অর্থাৎ পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য কেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মানুষ আর এ বোঝা টানতে পারছে না,” বলছিলেন তিনি।

তার অভিযোগ সরকারের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে খেলাপি ঋণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৬ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা।

“অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন খেলাপি কমাতে সময় লাগবে। এটিও এক ধরনের প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। এদিকে মানুষের অবস্থা দিন দিন আরও শোচনীয় হচ্ছে। কারণ পরোক্ষভাবে এ খেলাপি ঋণের প্রভাব তাদের ঘাড়েই পড়ছে”।

তার দাবি, “দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিই আজ ঋণময়। মেগা প্রকল্পের অর্থনৈতিক ফিজিবিলিটিহীন এসব ঋণ সমগ্র অর্থনীতিকে দেশী-বিদেশী অলিগার্কদের কাছে জিম্মি করে ফেলেছে”।

ডলার ও রিজার্ভ সংকট

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ তের বিলিয়ন ডলারের নীচে নেমে গেছে এবং ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে পারছে না। মার্কিন কোম্পানিসহ বেশ কিছু বিদেশী কোম্পানি ও এয়ারলাইন্সের বকেয়া শোধ করা যাচ্ছে না।

“ধারাবাহিকভাবে ডলার রিজার্ভ দ্রুত কমে যাচ্ছে। দুঃখজনক হলো রিজার্ভ সংকট কাটিয়ে ওঠার কোন রোডম্যাপই এই বাজেটে দেয়া হয়নি। অথচ রিজার্ভ ও ডলার সংকট অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সংকট। অর্থ পাচার ও হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে ডলার বাজার বাগে আনার চেষ্টা বৃথা যেতে বাধ্য,” বলছিলেন তিনি।

তার অভিযোগ গত পনের বছরে ছয় বছরের সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে এবং পাচারের সঙ্গে জড়িতরা সিংহভাগই সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট বলে তিনি অভিযোগ করেন।

“আজিজ-বেনজীরের মতো শত শত দুর্নীতিগ্রস্ত ও পাচারকারী চিহ্নিত হলেও গত পনের বছরে তাদের বিচার করা হয়নি। অর্থ পাচার করে দেশ ও মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে ক্ষমতাসীনদের সহায়তায় তারা নিরাপদে পালিয়ে যাচ্ছে”।

মি. আলমগীর বলেন সর্বগ্রাসী দুর্নীতি দেশকে কব্জা করে ফেলেছে এবং দেশ এক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে নিপতিত, যার মূল কারণ হলো সুশাসনের অভাব।

“এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের একটিই উপায়। দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে, দুঃশাসন ও সীমাহীন দুর্নীতি থেকে জনগণকে উদ্ধার করতে হবে। অবিলম্বে একটি জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেটা একমাত্র সম্ভব সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে,” বলছিলেন তিনি।