মূল্যস্ফীতি ও নির্বাচন- আওয়ামী লীগের সামনে যতো চ্যালেঞ্জ

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এমন এক সময়ে তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে যখন দলটি আগামী নির্বাচন নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে বেশ চাপের মধ্যে রয়েছে।
আওয়ামী লীগ নেতারা চাপের বিষয়টি স্বীকার করতে না চাইলেও সম্প্রতি দলের সিনিয়র নেতাদের বিভিন্ন বক্তেব্য একটা বিষয় ফুটে উঠছে যে তাদের সামনে বেশ চ্যালেঞ্জ রয়েছে, বিশেষ করে নির্বাচন নিয়ে।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালের শুরুতে ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে গত ১৫ বছরে বেশ দাপটের সাথেই এগিয়েছে। ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পরেও দেশের ভেতরে বাইরে আওয়ামী লীগ পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে।
এতো দীর্ঘ সময় একটানা আওয়ামী লীগ যেমন এর আগে কখনো ক্ষমতায় ছিল না, অন্য কোনও দলেরও ক্ষমতায় থাকার নজির নেই।
তবে সামনে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে পুরোপুরি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে না দলটি। আছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও। এমন প্রেক্ষাপটে দলটি তাদের ৭৪ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে।
নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ

ছবির উৎস, Getty Images
আওয়ামী লীগের সামনে আসন্ন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করা। ইতোমধ্যে আমেরিকা বাংলাদেশের নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নির্বাচনে কোনও বাধা সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্টদের জন্য আমেরিকার ভিসা না দেয়ার নীতি ঘোষণা করেছে।
যদিও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ‘দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্র’ মোকাবেলাটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বিবিসি বাংলাকে বলেন, নির্বাচন বন্ধ করার জন্য একটা ‘চক্রান্ত’ হচ্ছে। এজন্য তিনি বিরোধী দল বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করেন।
“বিদেশি শক্তি বা ষড়যন্ত্রের মদদে এবং সেটিকে মোকাবেলা করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটা অংশগ্রহণমূলক অবাধ সুষ্ঠু করাটাই আওয়ামী লীগের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ,” বলেন মাহবুবউল আলম হানিফ।

ছবির উৎস, Getty Images
নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ‘দেশি-বিদেশি নানা শক্তির’ চেষ্টার কথা বলছেন দলটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নূহ উল আলম লেনিনও। তবে তিনি বিএনপির অংশগ্রহণ এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তাঁর মতে “সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে যদি বিএনপি নির্বাচনে আসে তখন তার পরিপ্রেক্ষিতে যদি প্রশ্নটা উত্থাপিত হয় যে ‘আমরা সংবিধান মেনেই নির্বাচন করবো তবে আমাদের কিছু কথা আছে’ তখন সে কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু আমার মৃত্যুর পরোয়ানায় স্বাক্ষর করানোর জন্য তাদের সাথে কথা বলার ক্ষমতা তো আমাদের নেই।”
সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা আওয়ামী লীগের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে, একথা মানছেন বিশ্লেষকরাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী বিবিসি বাংলাকে বলেন এজন্য তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের উপর জোর দেন। নির্বাচন ঘিরে আমেরিকার তৎপরতার দিকটাও নির্বাচনী বছর হিসেবে বেশ স্বাভাবিক মনে করছেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি

ছবির উৎস, Getty Images
সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্যের ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি আওয়ামী লীগের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এ বিষয়টি তাদের জন্য একটি চিন্তার বিষয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে মূল্যস্ফীতি সরকারি হিসেবেই আট শতাংশের উপরে, বাস্তবিক অর্থে বাজারের চিত্র দেখলে সেটা আরও বেশি। অর্থনৈতিক নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তির ছাপ এখনো তেমন নেই।
আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতা-কর্মী মনে করেন, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির লাগাম টানতে না পারলে তার জন্য রাজনৈতিক মূল্য দেয়া লাগতে পারে। তবে বিষয়টি তারা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করতে চান না।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এই পরিস্থিতির জন্য কোভিড মহামারি পরবর্তী পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করে আসছেন।
আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও একই কথা বলছেন। তবে পরিস্থিতি মোকবেলার জন্য সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন মাহবুবউল আলম হানিফ।
যদিও সুযোগসন্ধানী সিন্ডিকেটের কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে মুনাফা লোটার প্রবণতাকেও আমলে নিচ্ছেন মিঃ লেনিন।


ছবির উৎস, FACEBOOK/ NUH UL ALAM LENIN
দলীয় কোন্দল
বড় দল হিসেবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় এখন বিভিন্ন সময় দলের মধ্যেই নানা দ্বন্দ্ব দেখা যায়। প্রতি স্তরে একাধিক প্রার্থী থাকা এবং নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতার কারণে দ্বন্দ্বের জায়গা তৈরি করছে বলে মনে করছেন মাহবুবউল আলম হানিফ। এমন প্রতিযোগিতা ‘স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যকর’ হিসেবে দেখছেন সদস্য নূহ উল আলম লেনিনও।
তবে আওয়ামী লীগের মতাদর্শ ধারণ করে না এমন অনেকে আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়াটা একটা সমস্যা হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী।

“দলের মধ্যে যদি দলের মতাদর্শ ধারণকারী বা দলের মূল্যবোধ ধারণকারী লোকজন যারা আছেন নেতাকর্মী যারা আচেন, তারা যদি কোন না কোনোভাবে সাইড-লাইন হয়ে যান, তখন এই দলের পক্ষে নির্বাচনে ভালো করাটাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে,” বলছিলেন মিঃ চক্রবর্তী।
তবে দল থেকে প্রার্থী নির্ধারণ করা হয়ে গেলে এমন সমস্যার অনেকটাই অবসান হয়ে যায় বলে মনে করছেন মিঃ লেনিন। তাছাড়া বিশৃঙ্খলা যেন না হয় সেজন্য সাংগঠনিকভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ঐক্যবদ্ধভাবে সাধারণ নির্বাচনে যেতে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানাচ্ছেন মাহবুবউল আলম হানিফ।










