ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ: মস্কোর যুদ্ধ কৌশলের সমালোচনায় সরব পুতিনের ঘনিষ্ঠ যে দুজন মিত্র

ছবির উৎস, GETTY IMAGES/REUTERS
- Author, ইলিয়া আবিশেভ এবং কাটেরিনা খিনকুলোভা
- Role, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়ার অভিযান যেভাবে থমকে গেছে সেজন্যে দেশটির সামরিক অধিনায়করা তীব্রভাবে সমালোচিত হচ্ছেন।
এই সমালোচনায় সবচেয়ে সরব ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে দুজনকে- চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ এবং ওয়াগনার মার্সেনারি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ইয়েভগেনি প্রিগোজিন।
রাশিয়ায় এই দুজনের সমালোচনার একটা অন্যরকম গুরুত্ব আছে।
এদের দুজনের কেউই কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার কোন সামরিক বা নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান ছিলেন না। কিন্তু তারপরও এদেরকে একযোগে রাশিয়ার সামরিক অধিনায়কদের সমালোচনা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। এরা দুজন আবার সামরিক বিষয়ে পরস্পরের মতামতের প্রশংসা করে থাকেন।
দক্ষ এবং সুচারুভাবে পরিচালিত একটি বাহিনী হিসেবে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর যে সুনাম ছিল- ইউক্রেন যুদ্ধে কিন্তু সেই ভাবমূর্তি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এমন প্রতিশ্রুতি শোনা গেছে যে কিয়েভ দখল করতে রুশদের তিনদিন লাগবে। সেটা তো ঘটেইনি, উল্টো সম্প্রতি ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে রুশ বাহিনীকে পিছু হটতে হয়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার বাহিনীর নতুন অধিনায়ক হয়েছেন জেনারেল সের্গেই সুরোভিকিন। এ পর্যন্ত ইউক্রেনের কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র উড়িয়ে দেয়া ছাড়া কোন সাফল্য তার ঝুলিতে নেই।
কিন্তু রাশিয়ায় রমজান কাদিরভ এবং ইয়েভগেনি প্রিগোজিন যেভাবে জেনারেলদের যুদ্ধ কৌশলের সমালোচনায় সরব থাকেন, সেটা বেশ বিস্ময়কর।
কারণ রাশিয়ায় প্রকাশ্যে এধরণের সমালোচনা বেশ বিরল ঘটনা, যে কোন সমালোচনাকে সরকারের প্রতি আনুগত্য-হীনতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এই দুজনের সমালোচনায় যে কোন বাধা দেয়া হয় না, তা থেকে ধারণা করা হয়, প্রেসিডেন্ট পুতিন তাদের মতামতকে বিবেচনায় নেন।
কর্নেল জেনারেল আলেক্সান্ডার লাপিনের ভাগ্যে যা ঘটেছে, সেটা দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী গত অক্টোবরে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
এই ঘটনার মাত্র দুদিন আগে রমজান কাদিরভ তাকে “মেধাহীন” বলে বর্ণনা করেছিলেন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাশিয়ার সাম্প্রতিক অনেক পরাজয় এবং অক্টোবরের শুরুতে লিম্যান শহরটি যে আবার ইউক্রেনের বাহিনী দখল করে নিল, এসব কিছুর জন্য রমজান কাদিরভ এই রুশ জেনারেলকে দোষারোপ করেছিলেন।
তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও বলেছিলেন, জেনারেল লাপিনের পদবী কেড়ে নেয়া উচিত এবং তাকে একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে সম্মুখ সমরে পাঠানো উচিৎ।

ছবির উৎস, RUSSIAN DEFENCE MINISTRY
“রক্ত দিয়ে তাকে এই লজ্জা ধুয়ে ফেলতে বাধ্য করা উচিৎ”, মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
এরপর ইয়েভগেনি প্রিগোজিনও এই সমালোচনায় যোগ দিলেন। তিনি রাশিয়ার কারাগারগুলো ঘুরে ঘুরে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীদের ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে পাঠানোর জন্য তালিকাভুক্ত করছিলেন।
কাজেই তার মতো একজন ব্যক্তির এরকম সমালোচনা করার সাহস থাকার কথা নয়, যদি না একেবারে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তার অনুমোদন থাকে।
তিনি তো এমনকি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রশংসা করেছেন। তাকে একজন “নিরেট, আত্মবিশ্বাসী, বাস্তববাদী এবং পছন্দ করার মতো মানুষ” বলে বর্ণনা করেছেন।
প্রিগোজিন এবং কাদিরভ কেন পুতিনের এত ঘনিষ্ঠ

ছবির উৎস, Reuters
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ইয়েভগেনি প্রিগোজিন প্রথম বিখ্যাত হয়েছিলেন “পুতিনের শেফ” পরিচয়ে। কারণ তিনি আসলে ক্রেমলিনের যে কোন সরকারী অনুষ্ঠানে খাদ্য এবং পানীয় সরবরাহ করতেন।
তিনি একজন ব্যবসায়ী। এসেছেন রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে। এরকম গুজব আছে যে প্রিগোজিন ১৯৯০ এর দশক হতে পুতিনকে চেনেন।
সেসময় ভ্লাদিমির পুতিন সেন্ট পিটার্সবার্গের মেয়রের অফিসে কাজ করতেন। সেন্ট পিটার্সবার্গে তখন প্রিগোজিনের একটি জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট ছিল। পুতিন নাকি নিয়মিত সেখানে যেতেন।
তবে গত দশকে কিছু অনুসন্ধানী সাংবাদিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে পরিচালিত কিছু ভুয়া সংবাদ পরিবেশনকারী সাইট বা “ট্রল ফ্যাক্টরির” সঙ্গে প্রিগোজিনের সম্পর্ক আছে।
এরা যেসব মিথ্যে প্রচারণা চালাতো, তার লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার বিরোধী রাজনীতিকদের হেয় করা, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এর বিপরীতে ক্রেমলিনকে বেশ ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হতো।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা রবার্ট মুলার ২০১৬ সালে একটি বিশেষ তদন্ত চালিয়েছিলেন। তাতে বলা হয়েছিল, এই ‘ট্রল ফ্যাক্টরি” চালানো হতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য।
মি. প্রিগোজিন অবশ্য ট্রল ফ্যাক্টরির সঙ্গে তার কোন সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন। তবে গত সোমবার তিনি নিজেই আবার প্রকাশ করে দিলেন তার ভূমিকা।
“আমরা (যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে) প্রভাবিত করেছি, এখনো করছি এবং ভবিষ্যতেও করবো। এই কাজ আমরা করবো সতর্কতার সঙ্গে, নির্ভুলভাবে এবং জায়গা মতো- আমাদের মতো করে। আমরা জানি এটা কিভাবে করতে হয়।”
তবে এর আগে বহু বছর ধরে তিনি ‘ওয়াগনার গ্রুপ’ নামে একটি মার্সেনারি বা ভাড়াটে সৈন্য সংগ্রহকারী কোম্পানির সঙ্গেও তার সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে গেছেন। ওয়াগনার গ্রুপের কথা প্রথম শোনা গিয়েছিল ২০১৪ সালে। এই কোম্পানির ভাড়াটে সৈন্যদের সিরিয়া এবং অনেক আফ্রিকান দেশে দেখা গেছে।
সম্প্রতি তিনি ওয়াগনার গ্রুপের নেপথ্যে থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ওয়াগনার গ্রুপের ইউনিটগুলো সবচেয়ে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি বহু বছর ধের সেন্ট পিটার্সবার্গের গভর্নর আলেক্সান্ডার বেগলভের সঙ্গে প্রকাশ্য বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি মি. বেলগভের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার অভিযোগ পর্যন্ত তুলেছিলেন।
তবে পুতিনের মিত্রদের মধ্যে বোধহয় আনুগত্যের প্রতিযোগিতায় চেচেন প্রেসিডেন্ট রমজান কাদিরভের মতো আর একজনও পাওয়া যাবে না। তিনি সাংঘাতিকভাবে পুতিনের অনুগত। প্রেসিডেন্ট পুতিন ২০০৭ সালে রমজান কাদিরভকে উত্তর ককেশাসের এই প্রজাতন্ত্রের নেতা নিযুক্ত করেছিলেন।
চেচনিয়া ১৯৯০র দশকে রাশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছিল। তবে রমজান কাদিরভ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর চেচনিয়ার স্বাধীনতা অর্জনের সব চেষ্টা থেমে গেছে। তবে তার বেসরকারি “কাদিরোভটস্কি” বাহিনীর বিরুদ্ধে সেখানে ব্যাপক নির্যাতন এবং মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ আছে।
রাশিয়া যখন ইউক্রেনে অভিযান শুরু করলো, তখন রমজান কাদিরভ তার এক সরব সমর্থক ছিলেন। তিনি এমনকি কাদিরোভটস্কি সামরিক ইউনিটগুলোকে ইউক্রেনে লড়াই করতে পাঠিয়েছেন।
তিনি দাবি করেন, রাশিয়ার দখলদার বাহিনীর মধ্যে তাদের ইউনিটগুলো সবচেয়ে সুপ্রশিক্ষিত, সবচেয়ে সাহসী এবং নির্মম।
রমজান কাদিরভের বাহিনী হয়তো আসলেই নির্মম। তবে কোন কোন বিশ্লেষক কাদিরভের সৈন্যদের ‘টিকটক বাহিনী’ বলে তির্যক মন্তব্য করে থাকেন। কারণ এরা নাকি সত্যিকার লড়াইয়ের চাইতে সেখান থেকে টিকটকে ভিডিও পোস্ট করতে বেশি ব্যস্ত থাকে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, চেচেন সৈন্যদের একটা বিরাট অংশকে তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের কাছে অর্থ দাবি করে বা শারীরিক হামলার হুমকি দিয়ে এই সৈন্যদের বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।
রমজান কাদিরভের এই আনুগত্যকে পুরস্কৃত করেছে ক্রেমলিন। তাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থেকে কর্নেল জেনারেলের পদমর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে।

ছবির উৎস, KADYROV_95/TELEGRAM
এই দুজন কেন পুতিনের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ
মি. কাদিরভ এবং মি. প্রিগোজিন সম্প্রতি প্রায় একই সুরে কথা বলছেন। যদিও তাদের দুজনকে কখনো মিত্র বলে ভাবা হয়নি।
চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ সেন্ট পিটার্সবার্গের ব্যবসায়ী মি. প্রিগোজিনকে “জন্ম থেকেই যোদ্ধা” বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি ওয়াগনার গ্রুপের ভাড়াটে সৈন্যদের “রাশিয়ার নির্ভীক দেশপ্রেমিক” বলে বর্ণনা করেন।
এর পাল্টা রমজান কাদিরভের প্রশংসা করে মি. প্রিগোজিন সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেন, “রমজান, তুমি একটা সাংঘাতিক লোক।”
এরা দুজনেই রাশিয়ার সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের সমালোচনা করেন, যেটির নেতৃত্বে আছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু এবং তার ডেপুটি, সামরিক বাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ, জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ।
ইউক্রেনের যুদ্ধে ব্যর্থতার জন্য যখন রাশিয়ায় সমালোচনা বাড়ছে, নানা জনের নাম উল্লেখ করে তাদেরকে লজ্জায় ফেলা হচ্ছে, সেরকম একটা পরিবেশে এই দুজন ক্রেমলিনের শীর্ষ পর্যায়ে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আলাদা আলাদাভাবে চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ বা ওয়াগনারের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিন- কারোরই আসলে সেরকম প্রভাব-প্রতিপত্তি নেই। কারণ রাশিয়ার রাজনৈতিক এলিটদের কাছে তারা মোটেই জনপ্রিয় নন, তাদেরকে বহিরাগত বলে বিবেচনা করা হয়। তবে এই দুজন যদি হাত মেলান, তাহলে পুতিনের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা লোকজনকে তারা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন, যখন কিনা সেখানে বিভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
রাশিয়ার একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্বাস গালিয়ামভ বলেন, মি. কাদিরভ এবং মি. প্রিগোজিন যেরকম আচরণ করেন, সেটা যুদ্ধে লিপ্ত একটা দেশে বেশ ব্যতিক্রমী ঘটনা।
“প্রেসিডেন্ট পুতিন উপর থেকে ফেডারেল কর্তৃত্বের যে ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছিলেন, মনে হচ্ছে সেটা যেখানে সবচেয়ে বেশি কাজ করা দরকার ছিল, সেই সামরিক বাহিনীতেই হচ্ছে না।”
তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে একটা নৈরাজ্য বলে বর্ণনা করেন। কারণ সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কমান্ডাররা এক জোট হয়ে কাজ করার পরিবর্তে পরস্পরের বিরুদ্ধে কলহ-বিবাদে লিপ্ত।
‘আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব দ্য ওয়ারের’ বিশেষজ্ঞদের ধারণা প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যে দুটি বড় উপদল আছে।
এদের একটি অংশ চায় যুদ্ধ থামাতে, যাতে করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার যে সম্পদ জব্দ হয়ে আছে সেগুলো উদ্ধার করা যায়। আরেকটি দল চায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে।
রমজান কাদিরভ এবং ইয়েভগেনি প্রিগোজিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন হয়তো এই কথাটাই শুনতে চান। কাজেই তিনি এই দুজনকে তার কাছাকাছিই রাখতে চাইতে পারেন।
অতিরিক্ত রিপোর্টিং: আন্দ্রে যাখারভ এবং ইলিয়া বারাবানোভ








