শেখ হাসিনার পতনের পর জেলে থেকে পালানো ৫৩ ফাঁসির আসামি নিখোঁজ

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছিল

ছবির উৎস, ABRAR FAHAD/FACEBOOK

ছবির ক্যাপশান, বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছিল
    • Author, রাকিব হাসনাত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

বাংলাদেশের গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৫৩ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তসহ ১৫১ জন আসামির খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। গত বছর পাঁচই অগাস্টে আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কারা বিদ্রোহ করে তারা পালিয়ে গিয়েছিলো।

পালিয়ে বেড়ানো এসব আসামির মধ্যে বুয়েটের বহুল আলোচিত আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও আছে। এ কারণেই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

কাশিমপুর কারাগার কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন ছয়ই অগাস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে থেকে মোট ২০২ জন আসামি পালিয়ে গিয়েছিলো। এদের মধ্যে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলো ৮৮ জন।

"ওই সময়ে যারা পালিয়ে গিয়েছিলো তাদের মধ্যে ৫১ জনকে আমরা ফেরত পেয়েছি। এদের মধ্যে ৩৫ জন বিভিন্ন মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি," বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-মামুন।

তবে এখনো যারা পালিয়ে আছে তাদের মধ্যে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি ছাড়া আলোচিত আর কোন মামলার আসামি নেই বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।

মুনতাসির আল জেমির পালিয়ে যাওয়ার খবর সোমবার গণমাধ্যমে আসার পর রাতে বুয়েটে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে একদল শিক্ষার্থী। রাতেই এক সংবাদ সম্মেলনে তারা পালিয়ে যাওয়া আসামিকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছে।

২০১৯ সালের ৬ই অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মীর নির্মম নির্যাতনে নিহত হন আবরার ফাহাদ। তখন ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় বুয়েটসহ সারাদেশে তুমুল অসন্তোষ তৈরি হয়েছিলো।

ওই ঘটনায় ২০২১ সালের ৮ই ডিসেম্বর ২০জনকে মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলো বিচারিক আদালত।

বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মুনতাসির আল জেমিসহ আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত সবাই বর্তমান সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলো।

আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনের সময় যে কয়েকটি ঘটনায় দলটির সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলো আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডকে তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অনেকে।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
আবরার হত্যার পর বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো
ছবির ক্যাপশান, আবরার হত্যার পর বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো

আবরার খুনের আসামি পালানোর খবর কীভাবে জানা গেলো

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন),আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি সোমবার শেষ হয়েছে। এখন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছে হাইকোর্ট।

এর মধ্যেই সোমবার ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামির কারাগার থেকে পালানোর খবর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যার জের ধরে রাতে বুয়েটে বিক্ষোভে নামে একদল শিক্ষার্থী।

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরদিন গত ছয়ই অগাস্ট ওই আসামি জেল থেকে পালিয়েছে বলে সোমবার বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ এবং ওই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জসিম উদ্দিন।

আবরারের বাবা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "সোমবার শুনানির শেষ পর্যায়ে বিচারপতি জানতে চান, কোন কোন আসামির পক্ষে কোন কোন আইনজীবী আছেন। তখন সেখানেই জানানো হয় যে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুনতাসির আল জেমি পালিয়েছে।"

তিনি জানান, গত ছয়ই অগাস্ট ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি কারাগার থেকে পালালেও সোমবারই প্রথম তিনি তা জানতে পারেন আদালতে মামলার শুনানির সময়।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জসীমউদ্দিন জানিয়েছেন, জেমির সাথে জেলে থাকা আরেক আসামির মাধ্যমেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে গত অগাস্টে পালিয়েছেন তিনি। আইনজীবী জসীমউদ্দিন বলেন, একই সময় আসামি পক্ষের আইনজীবী ও কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেও বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন তিনি।

সোমবার সন্ধ্যায় এ নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আবরার ফাহাদের ছোট ভাই বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাইয়াজ লিখেন, ''আবরার ফাহাদ হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি জেমি জেলখানা থেকে পালিয়ে গেছে ৫ই আগস্টের পরে।

অথচ আমাদের জানানো হচ্ছে আজকে, যখন ওর আইনজীবী কোনো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে আসেনি তখন। ফাঁসির আসামির তো কনডেম সেলে থাকার কথা ছিল, সে পালায় কীভাবে!"

আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ
ছবির ক্যাপশান, আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ

ফাঁসির আসামি জেল থেকে কীভাবে পালালো

কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-মামুন জানিয়েছেন, ছয়ই অগাস্ট ওই কারাগার থেকে যে ২০২ জন কয়েদি পালিয়েছিলো।

ওই ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষ গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানায় যে মামলা দায়ের করে সেখানে বলা হয়, 'কারাগারের দেয়াল ভেঙ্গে ও বিদ্যুতের পোল উপড়ে ফেলে মই বানিয়ে কারাগারের দেয়াল টপকে ২০৩ জন পালিয়ে যায়'।

যদিও এখন কারা কর্তৃপক্ষ বলছেন এই সংখ্যা আসলে ২০২ জন।

ওই দিনের এ ঘটনায় যারা পালিয়েছিলেন তাদেরই একজন হলেন আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার আসামি মুনতাসির আল জেমি।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেল পালানো কয়েদিদের মধ্যে ৮৮ জন ফাঁসির আসামি এবং ১১ জন বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ছিলো। আর বাকী ১০৩ জন বিভিন্ন মামলায় বিচারাধীন ছিলো।

কারা কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ওই কারাগার কমপ্লেক্সের ভেতরে মোট চারটি কারাগার আছে, যার একটি নারী আসামিদের জন্য।

এর মধ্যে হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বিডিআর বিদ্রোহ মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি, জঙ্গি, ফাঁসি ও যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া আসামিদের পাশাপাশি কিছু রাজনৈতিক মামলার আসামিদেরও রাখা হয়।

আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন ৬ই অগাস্ট এই হাই সিকিউরিটি কারাগারের কারারক্ষীদের জিম্মি করে একদল কয়েদী তাদের মুক্তি দাবি করে।

তখন কারাগারের নিরাপত্তায় সেনাসদস্যরাও নিয়োজিত ছিলেন। তারাও বন্দিদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।

এক পর্যায়ে বিদ্রোহী বন্দিরা একটি দেয়াল ভেঙ্গে ফেলে এবং মই ব্যবহার করে দেয়ালের ভাঙ্গা অংশ নিয়ে বেরিয়ে যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারারক্ষীরা গুলি করে। পরে হেলিকপ্টারে করে আরও সেনা সদস্য সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন।

ওই ঘটনার সময় গুলিতে হোলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ডের মামলার দুজন আসামিসহ মোট ছয় জন নিহত হয়।

জেল সুপার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলছেন এখনো যারা পালিয়ে আছে তাদের ধরতে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে।

আরো পড়তে পারেন:
জুলাই অগাস্টের আন্দোলনের সময় কাশিমপুর ও নরসিংদী কারাগারসহ পাঁচটি কারাগার থেকে বন্দিদের পালানোর ঘটনা ঘটেছিলো
ছবির ক্যাপশান, জুলাই অগাস্টের আন্দোলনের সময় কাশিমপুর ও নরসিংদী কারাগারসহ পাঁচটি কারাগার থেকে বন্দিদের পালানোর ঘটনা ঘটেছিলো

প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনা সরকার বিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে এবং ওই সরকারের পতনের আগে পরে সারাদেশে অন্তত ১৭টি কারাগারে হামলা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির ঘটনা ঘটেছিলো।

তখন আটটি কারাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো বলে জানিয়েছিলো কারা কর্তৃপক্ষ।

এছাড়া তখন কাশিমপুর ও নরসিংদী কারাগারসহ পাঁচটি কারাগার থেকে বন্দিদের পালানোর ঘটনা ঘটেছিলো।

উনিশে জুলাই নরসিংদী কারাগারে হামলার ঘটনার পর সেখানে থাকা সব বন্দির পালানো ও অস্ত্র লুটের ঘটনা তখন ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিলো।

ওই ঘটনার পর গত বছরের ১৭ই সেপ্টেম্বর কারা অধিদফতরে এক মতবিনিময় সভায় কারা মহাপরিদর্শক জানিয়েছিলেন যে, কারাগার থেকে তখন জঙ্গি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯৮ জন পালিয়ে গিয়েছিল। এরমধ্যে সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি ছিল নয় জন।