'রাগ, হতাশা আর হারানোর অনুভূতি আমাদের সবার মধ্যে'- জিম্মিদের মুক্তি ও যুদ্ধবিরতির দাবিতে ইসরায়েলে বিক্ষোভ

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
মিছিল, অবরোধ এবং বিক্ষোভের জেরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইসরায়েল। অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং গাজায় বন্দি জিম্মিদের দাবিতে মঙ্গলবার সকাল থেকেই দফায় দফায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে।
হামাসের হেফাজতে থাকা জিম্মিদের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এই বিক্ষোভে সামিল হন সাধারণ মানুষও।
হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের মধ্যে ২০জন এখনো জীবিত আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ইসরায়েলি এবং অনেকের দ্বৈত নাগরিকত্বও রয়েছে।
জিম্মিদের নিরাপদে ফেরানোর বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিক্ষোভে সামিল ব্যক্তিরা।
পাশাপাশি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ চেয়ে আর্জিও জানিয়েছেন তারা।
সোমবার এই বিষয়ে মন্তব্য করতে শোনা গিয়েছিল মি. ট্রাম্পকে। তিনি বলেছিলেন, "দুই থেকে তিন সপাহের মধ্যে বন্ধ হতে পারে ওই সংঘাত।"
এদিকে, গাজার নাসের হাসপাতালে জোড়া ইসরায়েলি হামলায় পাঁচ সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ২০ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জোর দিয়ে বলেছে অবিলম্বে 'ন্যায়বিচার প্রয়োজন'।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে 'মর্মান্তিক দুর্ঘটনা' বলে আখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন, সামরিক কর্মকর্তারা এর 'পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত' করবেন।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
যে দাবিতে বিক্ষোভ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ইসরায়েলজুড়ে মঙ্গলবার মিছিল, সমাবেশ এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশজুড়ে এই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল 'হোস্টেজেস অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিস ফোরাম' নামক একটা গ্রুপ।
দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের কাছে জিম্মিদের মুক্তির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে আসছে তারা।
মঙ্গলবারের এই বিক্ষোভের লক্ষ্য ছিল জিম্মিদের মুক্তির জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা যাতে হামাসের সঙ্গে একটা চুক্তি নিশ্চিত করা যায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সোমবার বলতে শোনা গিয়েছিল, "আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যেই এই সংঘাতের অবসান হতে পারে।"
এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি যুদ্ধবিরতির বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আর্জি জানান বিক্ষোভে সামিলদের অনেকেই।
এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাজার অভ্যন্তরে ৫০ জন জিম্মি রয়েছেন, এদের মধ্যে ২০ জন এখনো জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদের বেশিরভাগকেই সাতই অক্টোবর ২০২৩ সালে আটক করা হয়েছিল।
জিম্মিদের মধ্যে একজনকে আগেই হেফাজতে নেওয়া হয় এবং তিনি মারা গেছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবারের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সামিলরা ২৮ জন জিম্মি যাদের মৃত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাদের দেহাবশেষ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতে গাজায় দু'জন জিম্মি রয়েছেন যাদের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, জিম্মিদের বেশিরভাগই ইসরায়েলি। এদের অনেকের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। এছাড়া জিম্মিদের মধ্যে থাইল্যান্ডের শ্রমিক ও নেপালের এক ব্যক্তিও রয়েছেন।

ছবির উৎস, Reuters
সড়ক অবরোধ, মিছিল
মঙ্গলবার সকাল থেকেই ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয়।
তেল আভিভে মার্কিন দূতাবাসের বাইরে হলুদ ব্যানার ওড়ানো হয়। উত্তোলন করা হয় ইসরায়েলি পতাকা।
সকাল থেকে প্রধান সড়কগুলোতে অবরোধ শুরু হয়। হামাসের হেফাজতে থাকা জিম্মিদের ছবি হাতে নিয়ে তাদের মুক্তির দাবি জানান তাদের প্রতিবাদে সামিল ব্যক্তিরা।
জিম্মিদের পরিস্থিতি বোঝাতে নিজেদের হাত এবং মুখ বেঁধে প্রতীকী বিক্ষোভ দেখান কেউ কেউ।
কোথাও সড়ক অবরোধের জেরে বেশ যানজট দেখা দেয়। কোথাও কোথাও গাড়ির টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা যায়।
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন অবশ্য বিবৃতি দিয়ে জানায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, "দেশের সব রাস্তা যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত।"
"সকাল থেকে বেশ কয়েকটা স্থান অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। তবে সমস্ত প্রধান সড়কে মোতায়েন পুলিশ কর্মকর্তারা অল্প সময়ের মধ্যেই যান চলাচলের জন্য তা পুনরায় খুলে দেয়।"

ছবির উৎস, Adi
'সংঘাতে জড়ানোটা আমাদের নিত্যদিনের রুটিন'
"কোনো না কোনো সংঘাতে জড়ানোটা আমাদের নিত্যদিনের রুটিন," তেল আভিভে বিক্ষোভরত ২৭ বছর বয়সী আদি ইসরায়েলি এভাবে নিজের ক্ষোভের কথা জানান।
"আমি এখানেই জন্ম নিয়েছি, সময় ছিল দ্বিতীয় ইন্তিফাদার" নিউজবিটের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গিয়ে জানান এই নারী।
২০০০ সালের দিকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কিছু ফিলিস্তিনিদের একটি বড় বিদ্রোহ, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে।
আদি বিবিসিকে বলেন যে তিনি বিশ্বাস করেন, ইসরায়েলের 'অধিকাংশ' মানুষ শান্তি চায় এবং তিনি মনে করেন যুদ্ধবিরতিতেই এর সূচনা হবে।
"(এর পরে) জিম্মিদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে এবং এই বর্তমান যুদ্ধের অবসান ঘটবে," যোগ করেন তিনি।
আজকের বিক্ষোভের কথা বলেতে গিয়ে আদি 'ক্ষোভ', 'হতাশা' এবং "আমাদের সবার ক্ষতি" এরকম অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
তিনি মনে করেন, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ মানুষ গাজায় ইসরায়েলি সরকার যেভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করছে তার বিরুদ্ধে এবং ব্যাখ্যা করেন যে তিনি প্রতিবাদ করছেন কারণ "আমরা মানুষকে পেছনে ফেলে রাখি না"।

'আমরা শুধু ওদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই'
হামাসের হাতে যারা আটক হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন ডালিয়া কুসনির পরিবারের দুই সদস্য- আইয়ার হর্ন এবং ইতান হর্ন। ২০২৩ সালের সাতই অক্টোবর হামাসের বন্দুকধারীরা কিব্বুটজ নীর ওজ থেকে ওই দুই ভাইকে তুলে নিয়ে যায়।
ফেব্রুয়ারি মাসে আইয়ার হর্ন মুক্তি পেলেও ইতান এখনো বন্দি রয়েছেন।
মঙ্গলবার সকালে বিবিসি রেডিও ৪-এর টুডে প্রোগ্রামে ডালিয়া কুসনির জানিয়েছেন তিনি এবং বিক্ষোভে সামিল অন্যান্য চান যাতে ইসরায়েলের সঙ্গে হামাসের একটা প্রাথমিক চুক্তি অন্তত স্বাক্ষর হোক।
তাদের মতে, আংশিক হলেও ক্ষতি নেই, কারণ বিস্তৃত চুক্তি পেতে গেলে এটাই "একমাত্র উপায়"।
"আমরা শুধু ৫০ জন জিম্মিকে বাড়ি রিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই, ব্যস।"
প্রসঙ্গত, গাজায় এখনো আটক ৫০জন জিম্মিদের মধ্যে ২০জন এখনো জীবিত রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুযোগ পেলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কী বলতে চান জ্যানতে চাওয়া হলে ডালিয়া কুসনির বলেন, "বলব আমি জানি যে এর জন্য তাকে কী করতে হবে, সেটা তার জানা আছে।"
"তিনিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যিনি জীবিত জিম্মিদের ফিরিয়ে এনেছেন- তাদের মধ্যে একজন ছিল আইয়ার। তাকে এখন সঠিক কাজটা করতে হবে।"

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
নাসের হাসপাতালে হামলাকে ঘিরে নিন্দার ঝড়
দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ২০ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছে। নিহতদের মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কর্মরত পাঁচজন সাংবাদিকও রয়েছেন।
এই জোড়া হামলার প্রতিবাদ দেখা গিয়েছে গাজাতেও। 'গাজা সাংবাদিক সিন্ডিকেট' আয়োজিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে গাজা সিটিতে সমবেত হয়েছিলেন নাগরিকরা।
ঘটনার তীব্র নিন্দা করে অবিলম্বে ন্যায়বিচারের আর্জি জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিলেও তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
তার এই পদক্ষেপের বিষয়ে জাতিসংঘের কর্মকর্তা থামিন আল-খিতান সাংবাদিকদের বলেছেন, "এই তদন্তের ফলাফল পাওয়াটা দরকার।"
"এই সাংবাদিকরা সারা বিশ্বের চোখ ও কান। তাদের অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে। ন্যায়বিচার হওয়া দরকার। আমরা এখনো কাউকে জবাবদিহি করতে বা (তদন্তের) কোনো ফলাফল প্রকাশিত হতে দেখা যায়নি।"
এদিকে, হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অপুষ্টি ও অনাহারে মারা যাওয়া তিন জনও রয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত মৃতদের সংখ্যা ৬২ হাজার ৮১৯ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানানো হয়েছে।








