ভারতের শক্তিমত্তা গোটা স্কোয়াড, কিন্তু দলটা 'ভয় পায়' কেন?

ছবির উৎস, Getty Images
এমন কোনও বিশ্লেষক চোখে পড়েনি যারা অন্তত সেমিফাইনালের চার দল নেয়ার সময় ভারতের নাম বাদ দিয়েছে। একে তো ঘরের মাটিতে বিশ্বকাপ, তার ওপর শেষ তিনটি বিশ্বকাপই স্বাগতিক দল জিতেছে।
শেষ পাঁচ ওয়ানডে বিশ্বকাপের চারটিই জিতেছে আইসিসির ওয়ানডে র্যাংকিং-এ এক নম্বরে থাকা ক্রিকেট দল।
এই বিশ্বকাপের স্বাগতিক দলও ভারত, বিশ্বকাপ শুরুর সময় ওয়ানডে র্যাংকিংয়ের এক নম্বরে থাকা দলও ভারত।
সাদা বলের ক্রিকেটে বিশ্বের সেরা দুই ব্যাটার আছেন ভারতের ক্রিকেট দলে, রোহিত শর্মা ও ভিরাট কোহলি।
আছেন শুভমন গিল, যাকে মনে করা হয় বিশ্ব ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ।
এই বছর বিশ্বকাপ শুরুর আগ পর্যন্ত ভারতীয় ফাস্ট বোলারদের গড় ছিল সবচেয়ে ভালো।
তবে আইসিসি ইভেন্টে এর আগেও ভারত দাপুটে পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, এর আগেও শক্তিশালী দল নিয়েই মাঠে নেমেছে।
সেখানে এবারে ভারতের ওপর একটা চাপ খুব স্পষ্টই থাকবে এবং ভারতের দল সেই চাপ কীভাবে সামলাবে সেটাই হবে দেখার বিষয়।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
স্কাই স্পোর্টসে বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে এক আলোচনায় ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইন বলেন, "২০১১ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর ভারত একটা চাপের মধ্যে থেকেই বিশ্বকাপে খেলছে। গত বছর অ্যাডেলেইডে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আমরা দেখেছি ইংল্যান্ড কোনও উইকেট না হারিয়ে ভারতের মাঝারি মানের রান তাড়া করলো। এর আগে ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আমরা দেখেছি ভারতের টপ অর্ডারে ধ্বস নেমেছিল"।
২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারত ১০ উইকেটে হেরে যায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারতের শক্তিশালী টপ অর্ডারের অবস্থা দাঁড়ায় ৩ রানে ৩ উইকেট। শেষ পর্যন্ত ঐ অবস্থান থেকে আর ঘুরে দাঁড়ানো হয়নি ভারতের।
নিউজিল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার সাইমন ডুলও নাসেরের সাথে একমত। তিনি মনে করেন ভারত ঠিক ভয়ডরহীন ক্রিকেটটা খেলতে পারে না, বিশেষত নক আউট পর্বে।
ডুলের মতে, "ভারতের সব আছে, এখন তারা সেগুলোর সমন্বয় কতোটা করে, সেটাই হবে দেখার বিষয়"।
“অনেক সময়ই ভারতের ক্রিকেটাররা পরিসংখ্যানের কথা ভাবেন, পত্রিকায় কী লেখা হবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের নিয়ে কী লেখা হচ্ছে এসব ভাবনাকে ভয় পায় ভারতের দলটি”, এমনটাই মনে করেন ডুল।
বিশ্লেষকদের মতে ভারত মানসিকভাবে পিছিয়ে থাকে প্রত্যাশার চাপ এবং অতি আলোচনার কারণে।
তবে এই জায়গাটায় বড় নামগুলোর ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে করেন ইয়ন মরগান। তার মতে, “রাহুল দ্রাবিড়ের মতো ব্যক্তিত্ব আছেন আপনার দলের সাথে, কোহলি আছেন। যাতে বাইরের আওয়াজ ড্রেসিংরুমের পরিবেশে প্রভাব না ফেলে সেটা নিশ্চিত করতে এই ধরনের ব্যক্তিত্বের ভূমিকা থাকতে হবে”।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post
হার্দিক পান্ডিয়া, ভারতের প্লাস পয়েন্ট
পঞ্চাশ ওভারের খেলা, পাঁচজন জেনুইন বোলার থাকার পরেও একজন অধিনায়কের এদিক সেদিক তাকাতে হয়, যেখানে ভারতের আস্থা হয়েছিলেন দীর্ঘদিন যুবরাজ সিং, ভিরেন্দর সেহওয়াগ, সুরেশ রাইনার মতো পার্ট টাইমাররা।
ভারত বছরের পর বছর কপিল দেবের মতো একজন জেনুইন পেশ বোলিং অলরাউন্ডারের খোঁজে ছিল, কখনো ইরফান পাঠানে সেই ছায়া দেখেছে কেউ কেউ কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
হার্দিক পান্ডিয়া, এমন একজন অলরাউন্ডার যিনি টপ অর্ডার থেকে লোয়ার মিডল অর্ডার যেকোনো জায়গায় ব্যাট করতে পারেন ১-৫০ যেকোনো সময় বোলিং করতে পারেন, তাও আবার ১৪০ ছুঁইছুঁই গতিতে।
তাকেই ভারতের পরবর্তী অধিনায়ক ভাবা হচ্ছে।
ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ী সাবেক অধিনায়ক ইয়ন মরগান বলেন, "হার্দিক পান্ডিয়া অন্যান্য বড় দলের সাথে ভারতের পার্থক্য গড়ে তোলে, যেমন অস্ট্রেলিয়ায় আছেন স্টোইনিস বা মিচেল মার্শ। এদের দায়িত্ব ঠিক করে দেয়া, ইংল্যান্ডে স্টোক্স এখন বল করেন না, হার্দিক পান্ডিয়া এদিক থেকে আলাদা, দুটো ভূমিকাতেই তিনি ম্যাচ উইনার হতে পারেন এবং সদ্য শেষ হওয়া এশিয়া কাপে সেটার প্রমাণ দিয়েছেন।"
হার্দিক পান্ডিয়া ফাস্ট বোলিং সহায়ক পিচে বাড়তি শক্তি হিসেবে কাজ করেন, স্পিন সহায়ক উইকেটে তিনি 'হিট দ্য ডেক' বোলার হিসেবে বল করেন, জোরের ওপর স্ট্যাম্প লাইনে বল করে উইকেট থেকে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন।
হার্দিক পান্ডিয়ার বোলিং-এ গত দুই বছরে উল্লেখ করার মতো উন্নতি এসেছে, তার ক্যারিয়ার গড় ৩৬ এর মতো, গত দুই বছরের গড় ২১।
রোহিত শর্মা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, "হার্দিক পান্ডিয়া থাকার কারণে ভারত চাইলেই তিনজন স্পিনার ও তিনজন ফাস্ট বোলার নিয়ে খেলতে পারে, এটা একটা বিলাসিতা অনেক দলের জন্য"।
পান্ডিয়া নেতৃত্ব দিয়ে গুজরাট টাইটান্সকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ জিতিয়েছেন, নিয়মিত পারফর্ম করছেন। ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের মূল ক্রিকেটারদের একজন এখন তিনি।
সবকিছু মিলিয়ে চলমান সময়টা হার্দিক পান্ডিয়ার কাছে স্বপ্নের মতো বলছেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতের ব্যাটিং কতোটা শক্তিশালী?
ভারতের ব্যাটিং লাইন আপ নিয়ে সব বিশ্বকাপের আগেই বিস্তর আলোচনা হয়ে থাকে। কিন্তু কখনো মোহাম্মদ আমির (২০১৭), শাহিন শাহ আফ্রিদি (২০২১) , কখনো ম্যাট হেনরি (২০১৯) বা কখনো সাকিব আল হাসানের (২০২২) বলে টপ ভারতের টপ অর্ডার ব্যর্থ হয়েছে।
পরে হাল ধরতে হয়েছে মিডল অর্ডারকে।
এইতো এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচেও পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫০ রানের মধ্যে চার উইকেট হারিয়েছিল ভারত।
এরপরও ২৬৬ রান তুলেছে দলটি, আর এখানেই ভারতের বিশেষত্ব।
ইশান কিশান, হার্দিক পান্ডিয়ার মতো ছয় ও সাত নম্বর অপশন থাকায় ভারত একাদশের কোনও একটা জায়গায় সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ নামের জুয়া খেলতেই পারে।
রোহিত শর্মা নিজের ব্যাটিং চরিত্রে খানিকটা বদল এনেছেন, এই বছর তিনি ১১০ এর মতো স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করছেন, শুভমন গিল তো আছেনই। ভিরাট কোহলি এই বছর দারুণ ফর্মে আছেন।
দলে আছেন শ্রেয়াস আইয়ার যাকে মনে করা হয় ভারতের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো যোগ্য ব্যাটার।
ভারতীয় ক্রিকেটার ও ধারাভাষ্যকার দিনেশ কার্তিক মনে করেন এই লাইন আপের একটাই দুর্বলতা যে অনেক বেশি ডান হাতি ব্যাটার। এটা প্রতিপক্ষকে পরিকল্পনা করতে সুবিধা করে দেবে।

ছবির উৎস, Getty Images
স্পিন আক্রমণ
ভারতের কুলদীপ ইয়াদাভ সময়ের অন্যতম সেরা রিস্ট স্পিনার। এই বাহাতি স্পিনারের বলে সম্প্রতি কুপোকাত হয়েছে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। এশিয়া কাপে তার পারফরম্যান্স ভারতকে ফাইনালে উঠতে সাহায্য করেছে।
কুলদীপ প্রায় স্ট্যাম্প বরাবর বল করে দুই দিকে বল ঘোরাতে পারেন এবং সোজা থাকা বলটাই সবচেয়ে বেশি বিপদ ডেকে আনে ব্যাটারের জন্য।
কুলদীপ ছাড়াও ভারতের স্কোয়াডে আছেন রাভিচান্দ্রান আশ্বিন। তিনি শেষ মুহূর্তে দলে ঢুকেছেন, আকশার প্যাটেলের চোট এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঠিক বিশ্বকাপ শুরুর আগের সিরিজে আশ্বিনের বোলিংটা এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
শুধু বোলিং নয়, আশ্বিন একজন দারুণ ক্রিকেট চিন্তকও যেটা ভারতের দলে বোনাস।
এছাড়া আছেন রাভিন্দ্রা জাডেজা, এই অলরাউন্ডারও দশ ওভার কার্যকরী স্পিন বোলিং করতে পারেন ওয়ানডে ম্যাচে।
জসপ্রিত বুমরাহ, মোহাম্মদ সিরাজ, মোহাম্মদ শামিকে নিয়ে শক্তিশালী ফাস্ট বোলিং লাইন আপ, হার্দিক পান্ডিয়ার মতো অলরাউন্ডার, রাভিচান্দ্রান আশ্বিনের মতো স্পিনার এবং বিশ্ব ক্রিকেটের এক ঝাঁক ব্যাটার নিয়ে যদি ভারত শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয় সেটাই হবে অঘটন, আর এই চাপটাই ভারতের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ।











