রাম মন্দিরে 'প্রাণ প্রতিষ্ঠা'র আগে-পরে ভারতে যেসব সাম্প্রদায়িক অশান্তি হয়েছে

    • Author, অভিনব গোয়েল
    • Role, বিবিসি নিউজ হিন্দি, দিল্লি

অযোধ্যায় রাম মন্দির উদ্বোধন আর রামচন্দ্রের মূর্তিতে 'প্রাণ প্রতিষ্ঠা' হয় ২২শে জানুয়ারি। তার আগে-পরে উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ, তেলেঙ্গানাসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে সাম্প্রদায়িক অশান্তির ঘটনা ঘটেছে।

ওইসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এইসব অশান্তির মধ্যে ধর্মের নামে মারামারি, স্লোগান দেওয়া আর পরিস্থিতি অশান্ত করার নানা প্রচেষ্টা হয়েছে।

গত কয়েক দিনে কোথায় এ ধরনের ঘটনা কীভাবে হয়েছে, তারই ধারাবিবরণী রয়েছে এই প্রতিবেদনে।

প্রথমেই উল্লেখ করা যাক মুম্বাইয়ের মীরা রোডে সহিংসতার ঘটনাটি।

অযোধ্যায় রামচন্দ্রের মূর্তিতে 'প্রাণ প্রতিষ্ঠার' একদিন আগে মুম্বাইয়ের মীরা রোডের নয়া নগর এলাকায় 'রাম রাজ রথ যাত্রা' নামের একটি মিছিল বেরিয়েছিল।

এই মিছিলের ওপরে পাথর ছোঁড়া হয় বলে জানা গেছে, আর তার পরেই সেখানে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

পরের দিন পৌর নিগম ওই এলাকার কিছু দোকান বুলডোজার চালিয়ে ভেঙ্গে দেয়। পৌর নিগমের বক্তব্য ছিল অবৈধ নির্মাণ ভাঙ্গার জন্যই ওই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সমস্যা ওখানেই থেমে থাকেনি। সন্ধ্যার সময়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের কয়েকজনের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনায় আহত আব্দুল হক দাবি করছেন যে তার ওপরে হামলা করার সময়ে তার ধর্ম কী, সেটি জানতে চাওয়া হচ্ছিল।

পুলিশের ডেপুটি কমিশনার জয়ন্ত বজবালে জানিয়েছেন যে ওই ঘটনায় ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গির্জার ওপরে গেরুয়া পতাকা

অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের আগের দিন, ২১শে জানুয়ারি মধ্য প্রদেশের ঝাবুয়াতে কয়েকজন ব্যক্তি ধর্মীয় স্লোগান দিতে দিতে একটা গির্জার ওপরে চড়ে যায় আর সেখানে একটা গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে দেয়।

সামাজিক মাধ্যমে ওই ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে। ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে কীভাবে ওই ভবনটির ওপরে দুজন ব্যক্তি চড়ে গিয়ে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় ক্রস চিহ্নের পাশে গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে দিয়েছে।

এই ঘটনা যখন ঘটছে, পিছনে জোরেশোরে ধর্মীয় স্লোগানের আওয়াজও শোনা যাচ্ছে ওই ভিডিওতে।

রাণাপুর থানা এলাকার দবতলাই গ্রামের ওই বাড়িটি টরবু অমলিয়ার নামের এক ব্যক্তির, যিনি ঘটনার ব্যাপারে থানায় অভিযোগ জানাতে চাননি।

সংবাদ পোর্টাল দ্য ওয়ারের খবর অনুযায়ী, মি. অমলিয়ার বলেছেন, যারা ধর্মীয় স্লোগান দিতে দিতে এসেছিল, তারা সংখ্যায় প্রায় ২৫ জন ছিল। পাশের গ্রামের বাসিন্দা বলে তাদের সবাইকেই তিনি চেনেন।

মি. অমলিয়ারকে উদ্ধৃত করে দ্য ওয়ার লিখেছে, যেখানে পতাকা লাগানো হয়েছিল, সেটা একটা গির্জা। তিনি ২০১৬ সালে ওই গির্জা নির্মাণ করে এবং প্রতি রবিবার ৩০-৪০ সেখানে প্রার্থনা করতে আসেন।

জামা মসজিদের সামনে রাম ভজন

মধ্য প্রদেশের ইন্দোরে বেটমা এলাকা থেকেও সাম্প্রদায়িক অশান্তির খবর পাওয়া গেছে।

সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে বেটমা এলাকায় জামা মসজিদের সামনে প্রচুর মানুষ সমবেত হয়েছেন।

ভিডিওতে শোনা যাচ্ছে যে মসজিদের সামনে রাস্তায় বসে হনুমান-চালিশা বাজানো হচ্ছে।

সেখানে গেরুয়া পতাকাও উড়ছিল। মধ্য প্রদেশে বিবিসির সহযোগী সংবাদদাতা সুরেইয়া নিয়াজি নিশ্চিত করেছেন যে ওই ভিডিওটি বেটমা এলাকার জামা মসজিদের সামনেই তোলা হয়েছে।

মি. নিয়াজি এটাও জানিয়েছেন যে স্থানীয় মুসলমানরা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন না, কারণ তাদের মনে ভয় ধরে গেছে।

মসজিদের ফটকে গেরুয়া পতাকা

উত্তরপ্রদেশের সন্ত কবীরনগরে এক শোভাযাত্রা বের করা হয়েছিল। সেটির চলার পথেই একটা মসজিদের ফটকে চড়ার চেষ্টা করা হয়।

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে যে বেশ কিছু ব্যক্তি একটা মসজিদের সামনে গেরুয়া পতাকা ওড়াচ্ছেন।

এক ব্যক্তিকে দেখা যায় মসজিদের ফটকে ওঠার চেষ্টা করছেন।

এই মসজিদটি মেহদাবল নগর পঞ্চায়েত এলাকার।

মেহদাবল থানার অফিসার বিজয় কুমার দুবে বিবিসিকে জানিয়েছেন যে শান্তি ভঙ্গ করার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

তিনি এটাও জানিয়েছেন, "এখন পরিস্থিতি শান্ত আছে। মসজিদের তরফ থেকে কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।"

তার কথায়, "এলাকায় যে কোনও মিছিল বা শোভাযাত্রা বের হলে যেখানে মসজিদটি অবস্থিত, সেই রাস্তা দিয়েই যায়। সেভাবেই ২২শে জানুয়ারি ওই রাস্তা দিয়ে শোভাযাত্রা যাচ্ছিল। সেখান থেকেই কিছু ব্যক্তি পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে।"

শোভাযাত্রার আগেই পুলিশ ওই পথের সব মন্দির-মসজিদের ফটক বন্ধ করে দিয়েছিল।

লক্ষ্ণৌয়ের রাস্তায় অশ্লীল গান

লক্ষ্ণৌয়ের হজরতগঞ্জ থানা এলাকায় ২২শে জানুয়ারি সন্ধ্যায় অশ্লীল ও গালাগালিতে ভরা গান বাজানো হয়েছে সর্বসমক্ষেই।

সামাজিক মাধ্যমে ওই গানটির ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরে অনেকেই পুলিশের হস্তক্ষেপ চেয়ে সরব হয়েছেন। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

লক্ষ্ণৌয়ের অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ সুপারিন্টেডেন্ট মনীষা সিং বিবিসিকে বলেছেন, "এখন ওই তিনজন বিচার বিভাগীয় হেফাজতে আছে। এরা স্থানীয় ব্যবসায়ী। এরা বলছে অনুষ্ঠানের জন্য তারা একজন ডিজে ভাড়া করে এনেছিল। তিনি ইউটিউব খুঁজে একের পর এক গান বাজাচ্ছিলেন। জেনেশুনে অশ্লীল গান চালানো হয়নি বলেই এরা দাবি করছে।"

তেলেঙ্গানায় যুবককে নগ্ন করে ঘোরানোর ঘটনা

তেলেঙ্গানার সাঙ্গারেড্ডি জেলায় এক যুবককে নগ্ন করে ঘোরানো আর তার গোপনাঙ্গে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই ঘটনাটির ভিডিও-ও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে এক যুবককে নগ্ন করে কয়েকজন ধরে রেখেছে, পিছনে ধর্মীয় স্লোগান শোনা যাচ্ছে।

এরই মধ্যে এক ব্যক্ত ওই যুবকের গোপনাঙ্গে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, এমনটাও ভিডিওতে দেখা গেছে।

সাঙ্গারেড্ডি জেলার পুলিশ সুপার সিএইচ রূপেশ বিবিসিকে বলেছেন, "যুবকের সঙ্গে যে ঘটনা হয়েছে, সেটা ২২শে জানুয়ারির।"

তিনি বলছেন, যে যুবককে নগ্ন করে ঘোরানো হয়েছে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তিনি ধর্মীয় পতাকার অবমাননা করেছেন। দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

ওই যুবকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার আর অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে যুবককে মারধর করা অভিযোগ দায়ের করেছে পুলিশ।

মি. রূপেশের কথায়, "ওই যুবক এখন জেলে আছেন আর যারা তাকে নগ্ন করে ঘুরিয়েছিল, তারা পলাতক।"

সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা হচ্ছে, এরকম একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে যে ওই যুবক গেরুয়া পতাকার অবমাননা করছেন।

কবরস্থানে আগুন ধরানো

বিহারের দারভাঙ্গা জেলার একটি কবরস্থানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় ২২শে জানুয়ারি।

কেওটি থানার অধীন খিরমা গ্রামের ঘটনা এটি।

থানার ওসি রাণী কুমারী বিবিসিকে বলেছেন, "প্রাণ প্রতিষ্ঠার দিন একশোরও বেশি মিছিল বেরিয়েছিল। সেখান থেকেই কেউ কবরস্থানে পটকা ছুঁড়ে দেয়। তা থেকেই আগুন ধরে যায়।"

"আগুন লেগে যাওয়ার পরে হিন্দু আর মুসলমান দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু মারামারি হয়নি," জানান মিজ কুমারী।

পুলিশ নিজে থেকেই ওই ঘটনায় এফআইআর দায়ের করেছে। কিন্তু রাণী কুমারী বলছেন অভিযুক্ত পলাতক।

পাঞ্জাবে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাতের মামলা

ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার দুটি পৃথক মামলা দায়ের করেছে পাঞ্জাবের পুলিশ।

দুটি ঘটনাতেই অভিযোগকারীরা বলেছেন যে রামচন্দ্রকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছে। একটি ঘটনা বারনালা আর অন্যটি ভাটিণ্ডা জেলার।

বারনালা পুলিশ ইকবাল ধানৌলা নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে আর ভাটিণ্ডায় সাইনা নামের এক যুবতীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিবিসির সহযোগী সংবাদদাতা নওকিরণ সিং জানিয়েছেন ৫৩ বছর বয়সী ইকবাল ধানৌলা একটা ছোট ছাপাখানা চালান, যেখানে বিয়ে শাদি আর অন্যান্য অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণপত্র ছাপা হয়। তিনি সামাজিক মাধ্যমে যথেষ্ট সক্রিয় এবং নিজেকে তিনি নাস্তিক বলে দাবি করেন।

ভাটিণ্ডা থেকে বিবিসির আরেক সহযোগী সাংবাদিক সুরিন্দর মান বলছেন সাইনা একটি সেলুন চালান।

ভাটিণ্ডার সিনিয়র পুলিশ সুপারিন্টেডেন্ট হরমনভির সিং গিল বলছেন, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কয়েকজন প্রতিনিধি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন যে এক যুবতী সামাজিক মাধ্যমে রামচন্দ্র এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে খারাপ মন্তব্য করছেন।

সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই মিজ সাইনাকে গ্রেফতার করা হয়।