মধ্যরাতে পরীক্ষা পেছানোর সিদ্ধান্ত কেন, কী বলছে সরকার?

শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে মঙ্গলবার বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা

ছবির উৎস, TV Screen Grab

ছবির ক্যাপশান, শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা
    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

"দুপুর থেকেই অপেক্ষা করেছি এটা দেখার জন্য যে সরকারের পক্ষ থেকে পরীক্ষা পেছানোর কোনো ঘোষণা দেওয়া হয় কি-না। কিন্তু রাত ১২টা পর্যন্ত তেমন কোনো খবর পাইনি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন এইচএসসি পরীক্ষার্থী সামিউর রহমান।

মঙ্গলবার সামিউর রহমানের রসায়ন দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। সকালে উঠে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার কেন্দ্রেও যান তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, পরীক্ষা পেছানো হয়েছে।

"পরীক্ষা যদি পেছাবেই, তাহলে আগেভাগে কেন সেটা জানানো হলো না? কেন আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হলো?" ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন তিনি।

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণহানির ঘটনার পর সোমবার রাত পৌনে তিনটার দিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে পরদিনের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানায় সরকার, যা নিয়ে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার পর শিক্ষা উপদেষ্টা এবং শিক্ষা সচিবের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

দাবি আদায়ে মঙ্গলবার ঢাকার সচিবালয়ে ঢুকে বিক্ষোভ করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে।

"বিমান দুর্ঘটনার পর সরকার যখন শোক ঘোষণা করলো তখন কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো না? আমাদের নিয়ে কেন ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে? এর জবাব প্রশাসনকে দিতে হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন আরেক শিক্ষার্থী আবির মাহমুদ।

এমন পরিস্থিতির জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন সাবেক আমলারা।

"রাত তিনটায় ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে পরীক্ষা পেছানো নজিরবিহীন একটা ঘটনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা সরকারের অব্যবস্থাপনার একটা রেকর্ড হয়ে থাকবে," বিবিসি বাংলাকে বলেন সাবেক সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান।

মঙ্গলবার বিক্ষোভের একপর্যায়ে সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েন বিক্ষোভকারীরা

ছবির উৎস, TV Screen Grab

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবার বিক্ষোভের একপর্যায়ে সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েন বিক্ষোভকারীরা

সরকারের ব্যাখ্যা কী?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মাঝরাতে পরীক্ষা পেছানোর সিদ্ধান্তকে ঘিরে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠলেও শিক্ষা উপদেষ্টা অবশ্য সেটি মানতে রাজি নন।

"এখানে কোনো রকমের অব্যবস্থাপনা হয়নি...এটা এমন একটা সিদ্ধান্ত, যেটা হুট করে নেওয়া যায় না," বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার।

উপদেষ্টার দাবি করেছেন, সোমবারের বিমান দুর্ঘটনার পর থেকে তারা হতাহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

"দুর্ঘটনার পর প্রথমে ঘটনাস্থল, তারপর রাত ১০টা পর্যন্ত আমরা বার্ন ইউনিটেই ছিলাম। পরে আমি যখন বাসায় ফিরছিলাম, তখন এই পরীক্ষার বিষয়টা সামনে আসলো। অনেকে জানতে চাচ্ছিলেন, পরীক্ষাটা পেছানো হবে কি-না? আবার কেউ কেউ চাচ্ছিলেন পরীক্ষাটা হোক। এরপর কয়েকজন উপদেষ্টার সঙ্গেও কথা হয়," বলেন অধ্যাপক আবরার।

উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা করার পাশাপাশি পরীক্ষা আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বলে জানান শিক্ষা উপদেষ্টা। বৈঠক শেষ হয় সোমবার রাত আড়াইটার পর।

এরপর রাত পৌনে তিনটার দিকে মঙ্গলবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্তের কথা প্রথম জানিয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় পোস্ট দেন তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।

এরপর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াও তার ফেসবুক পাতায় জানান, মঙ্গলবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

"সিদ্ধান্ত যখন হলো যে এটা আমরা পেছাবো, সেটা নির্দিষ্ট সময়ে হয়েছে। পরবর্তীকালে সেটা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে," বলেন অধ্যাপক আবরার।

সচিবালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

ছবির উৎস, TV Screen Grab

ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবার সচিবালয়ের সামনে হওয়া বিক্ষোভের ছবি

বৈঠক শেষে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলেও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে পরীক্ষা স্থগিতের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় আরও পরে, মঙ্গলবার সকালে।

কিন্তু দুর্ঘটনার পরপরই কেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো না?

"এটা এমন একটা সিদ্ধান্ত, যেটা হুট করে নেওয়া যায় না। হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ারও কারও নেই এককভাবে। এছাড়া পরীক্ষা নেওয়ার জন্য যেমন সময় লাগে, আবার পরীক্ষা পেছাতে গেলেও সময় লাগে," বলেন অধ্যাপক সি আর আবরার।

"এছাড়া একটা ধারণা হয়তো রয়েছে যে একক সিদ্ধান্তে অনেক আগে দ্রুতই এটা নেওয়া যেতে পারতো। ধারণাটা একেবারেই সঠিক না।"

"এটি করতে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় এবং সেটি করতে গিয়েই সময় লেগেছে। কিন্তু এটা যদি আগে নেওয়া যেত, ভালো হতো। কিন্তু সঙ্গত কারণেই আগে নেওয়া সম্ভব হয়নি," বলেন অধ্যাপক আবরার।

শিক্ষা উপদেষ্টা দাবি করছেন, পরীক্ষা পেছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে "কোনো রকমের অব্যবস্থাপনা হয়নি"।

তাহলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব সিদ্দিক জুবায়েরকে তার পদ থেকে প্রত্যাহার করা হলো কেন?

"সচিবকে যে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেটা উচ্চতর একটি কমিটির সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম না। কেন দেওয়া হয়েছে, সেটার উত্তর আমি দিতে পারবো না," বলেন শিক্ষা উপদেষ্টা।

মঙ্গলবার ছয় দফা দাবিতে বিক্ষোভ করে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা
ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবার ছয় দফা দাবিতে বিক্ষোভ করেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা, তারা আইন ও শিক্ষা উপদেষ্টাকে দিনভর অবরুদ্ধও করে রাখেন

পদত্যাগ করবেন উপদেষ্টা?

শিক্ষা সচিবকে সরিয়ে দেওয়ার পরও উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি থেকে সরে দাঁড়ায়নি বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

"আমরা কেবল শিক্ষা সচিবের পদত্যাগ চাইনি। শিক্ষা উপদেষ্টাকেও পদত্যাগ করতে হবে"––মঙ্গলবার সচিবালয়ে বিক্ষোভের সময় সাংবাদিকদের বলেন বিক্ষোভকারীরা।

কিন্তু শিক্ষা উপদেষ্টা কি পদত্যাগের কথা ভাবছেন?

"আমি নিজে থেকে করার কোনো অভিপ্রায় নেই। কারণ এখানে আমার কাজের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে বলে আমি মনে করি না," বলেন অধ্যাপক আবরার।

তবে সরকার চাইলে পদত্যাগ করতে রাজি আছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

"আমার নিয়োগকর্তারা যদি মনে করেন এখানে ব্যত্যয় ঘটেছিল, তো আমাকে যেতে বললে আমি অবশ্যই চলে যাবো। এখানে আঁকড়ে ধরার, নিজেকে জাস্টিফাই করার কোনো কিছু নাই," সাংবাদিকদের বলেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার।