'তারা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা রোগীদের ওপরও গুলি চালিয়েছে'

ছবির উৎস, BBC / Jon Donnison
- Author, জন ডনিসন
- Role, বিবিসি নিউজ, সিরিয়া
এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে সিরিয়ায় শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সময় দেশটির সরকারি বাহিনী স্থানীয় একটি হাসপাতালে গণহত্যা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সুওয়েইদা শহরের ওই জাতীয় হাসপাতালটিতে গিয়ে সেখানকার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। তারা দাবি করেছেন যে, সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর সদস্যরা ওই হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে থাকা রোগীদের গুলি করে হত্যা করেছে।
সতর্কতা: খবরটিতে সহিংসতার বর্ণনা রয়েছে।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পা রাখতেই একটা উৎকট দুর্গন্ধ এসে নাকে ধাক্কা দিলো।
সুওয়েইদার প্রধান ওই হাসপাতালের গাড়ি পার্কিংয়ে গিয়ে দেখা গেল প্লাস্টিকের সাদা ব্যাগে কয়েক ডজন পঁচা মরদেহ সারিবদ্ধভাবে রাখা রয়েছে।
কিছু মরদেহ ছিল খোলা অবস্থায়, যেগুলো পঁচন ধরে ফুলে উঠেছে।
রক্ত পড়ে পায়ের নিচের পিচঢালা মাটিও পিচ্ছিল হয়ে উঠেছে।
বাইরে প্রচণ্ড রোদে, বাতাসে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ।
"এটি গণহত্যা ছিল," বিবিসিকে বলেন হাসপাতালের একজন চিকিৎসক ডা. ওয়াসেম মাসুদ।
"সৈন্যরা এখানে এসে বলেছিল, তারা শান্তি ফিরিয়ে আনতে চায়। কিন্তু পরে তারা শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত অনেক রোগীকে হত্যা করে," বলেন ডা. মাসুদ।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে এই চিকিৎসক বিবিসিকে একটি ভিডিও পাঠিয়েছিলেন, যেটি ধারণ করা হয়েছিল সরকারি বাহিনীর অভিযানের ঠিক পরে। ওই ভিডিওতে একজন নারী হাসপাতালটির চারপাশে ঘুরে সেখানকার পরিস্থিতি দেখান।
হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোর মেঝেতে চাদর দিয়ে ঢাকা কয়েক ডজন রোগীর মরদেহ পড়ে রয়েছে। চাদরগুলো রক্তে ভিজে গেছে।
এখানকার ডাক্তার, নার্স, স্বেচ্ছাসেবক- সবার কাছ থেকে একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে।

ছবির উৎস, BBC / Jon Donnison
গত বুধবার সন্ধ্যায় সিরিয়ার সরকারি সৈন্যরা হাসপাতালে ঢুকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু দ্রুজদের ওপর হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে।
"তাদের অপরাধটা কী? একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংখ্যালঘু হওয়া?," বলেন হাসপাতালের একজন স্বেচ্ছাসেবক কিনেস আবু মোতাব।
শহরের একজন ইংরেজি শিক্ষক ওসামা মালাক, যিনি হাসপাতালের ফটকের বাইরে অবস্থান করছিলেন, তিনি বিবিসিকে বলেন, "ওরা (হত্যাকারীরা) অপরাধী। ওরা দানব। আমরা ওদের মোটেও বিশ্বাস করি না,"।
"তারা আট বছর বয়সী একটি প্রতিবন্ধী ছেলের মাথায় গুলি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, হাসপাতাল সবার জন্য নিরাপদ স্থান হওয়া উচিৎ। কিন্তু তারা হাসপাতালেও আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে," বলেন মি. মালাক ।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি আরও বলেন, "তারা হাসপাতালে ঢুকে সবাইকে গুলি করতে শুরু করে। হাসপাতালের বিছানায় ঘুমন্ত রোগীদের ওপরও তারা গুলি চালিয়েছে।"
সিরিয়ায় সাম্প্রদায়িক সহিসংতা শুরু হওয়ার পর থেকেই পক্ষগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে নৃশংসতার অভিযোগ করে আসছে।

ছবির উৎস, Reuters
বেদুইন এবং দ্রুজ যোদ্ধাদের পাশাপাশি সিরিয়ার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও বেসামরিক নাগরিক হত্যাদের বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
সুওয়েইদার ওই হাসপাতালটিতে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
কেউ কেউ অনুমান করছেন যে, গত বুধবারের ওই ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৩০০ জনেরও বেশি। যদিও নিহতদের সংখ্যাটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মঙ্গলবার রাতে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশটির দ্রুজ অধ্যুষিত সুওয়েইদা শহরে সামরিক পোশাক পরিহিত ব্যক্তিদের দ্বারা "আতঙ্কজনক" মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সম্পর্কে তারা জানতে পেরেছেন।
এর আগে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে সিরিয়ার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী রায়েদ সালেহ বিবিসিকে বলেছিলেন যে, দেশটিতে সংঘটিত নৃশংসতার প্রতিটি অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হবে।
সুওয়েইদা শহরে মানুষের আসা-যাওয়া এখন ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়েছে। এর ফলে হত্যাকাণ্ডটির বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।

ছবির উৎস, Reuters
শহরটি বর্তমানে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে বলা যায়। কারা সেখানে ঢুকতে পারবেন, আর কারা বের হবেন, সেটি ঠিক করে দিচ্ছে দেশটির সরকারি বাহিনী। এমনকি, শহরটিতে প্রবেশের জন্য বিবিসিকেও একাধিক চেকপয়েন্টের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
শহরে ঢোকার সময় রাস্তার দু'পাশে পুড়ে যাওয়া অসংখ্য দোকানপাট, ভবন এবং ট্যাঙ্কের আঘাতে বিধ্বস্ত গাড়ি দেখতে পেয়েছে বিবিসি।
সিরিয়ার সুওয়েইদা শহরে সম্প্রতি দ্রুজ এবং বেদুইন যোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর সিরিয়ার সরকার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা দিয়ে সেটি কার্যকর করার চেষ্টা করে।
দেশটির সরকারি বাহিনী ইতোমধ্যেই সুওয়েইদার অনেক গ্রামে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। তারপরও সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষের শহরটি এখনও কার্যত দ্রুজ সম্প্রদায়ের লোকেদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ছবির উৎস, AFP
হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার আগে আট বছর বয়সী মেয়ে শিশু হালা আল-খতিবকে তার খালার সঙ্গে একটি বেঞ্চে বসে থাকতে দেখা গেল।
শিশুটির মুখে ব্যান্ডেজ এবং রক্তের দাগ রয়েছে। মনে হচ্ছে তার একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।
সে বিবিসিকে জানিয়েছে যে, বন্দুকধারীরা যখন আক্রমণ চালিয়েছিল, তখন সে তাদের ঘরের একটি আলমারিতে গিয়ে লুকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হামলাকারীরা সেখানেই তার মাথায় গুলি করে।
তারপরও ভাগ্যক্রমে সে প্রাণে বেঁচে গেলেও হামলায় হালা'র বাবা এবং মা- দু'জনেই নিহত হয়েছেন। যদিও শিশুটি এখনও সে খবর জানে না।








