ইমরান খানের রাজনীতিতে ফেরার আন্দোলন গুলির ঘটনায় ব্যাহত

    • Author, ইভেট ট্যান
    • Role, বিবিসি নিউজ

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে গুলি করার অভিযোগে আটক ব্যক্তি মি. খানকে গুলি করার কারণ হিসেবে বলেছেন যে সাবেক এই ক্রিকেটার মানুষকে "বিপথগামী" করছিলেন এবং সে কারণে তিনি "তাকে খুন করতে চেয়েছেন"।

পুলিশ কর্তৃক প্রকাশ করা একটি ভিডিওতে তার এই স্বীকারোক্তি দেখা যাচ্ছে। তবে এটা পরিষ্কার নয় যে কোন পরিস্থিতিতে তার এই সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিলো।

মি. খান অবশ্য বলেছেন জনগণ তার সাথেই আছে এবং তিনি একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন যার গন্তব্য ছিলো রাজধানী ইসলামাবাদ। এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার সময়ই তিনি হামলার শিকার হয়েছেন।

“এস্টাব্লিশমেন্ট (শাসক) আমাদের বিপক্ষে,” মঙ্গলবার বিবিসিকে বলেছেন তিনি।

ক্ষমতা থেকে মি. খানের বিদায় এবং এরপর বিদ্রোহী রূপে রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা কিছুটা হলেও ঝাঁকি দিয়েছিলো দেশটির রাজনীতিকে।

আর্মির সাথে মতবিরোধ এবং ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত

ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ২০১৮ সালের জুলাইতে। তিনি দুর্নীতি মোকাবেলা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কথা বলেছিলেন।

সে সময় তার জনসমর্থনও ছিল ব্যাপক। আর একই সাথে পেছন থেকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল- পাকিস্তানে যেটাকে ‘এস্টাব্লিশমেন্ট’ বলা হয় মূলত সেই সামরিক বাহিনীর। “তারাই তাকে তৈরি করেছে,” ইমরান খানের দলত্যাগী একজন বলছিলেন বিবিসিকে। “তারাই তাকে ক্ষমতায় এনেছিল”।

কিন্তু ব্যাপক মূল্যস্ফীতি আর বৈদেশিক ঋণের চাপে জনসমর্থন দ্রুতই কমতে থাকে এবং অভিযোগ ওঠে যে ইমরান খান অর্থনীতিকে সঠিকভাবে সামলাতে পারেননি।

একই সাথে পাকিস্তানের আর্মির সাথে তার যে সম্পর্ক সেটিও পরিবর্তন হতে শুরু করে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন যে এটা শুরু হয়েছে দেশটির একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের নিয়োগ নিয়ে। মি. খান গত বছর অক্টোবরে ওই প্রধানের নিয়োগ অনুমোদন করে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি।

তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এটিকেই আঁকড়ে ধরে। ২০২২ সালের মার্চের মধ্যে তিনি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান ও বিরোধী দলগুলো অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আসে।

ইমরান খান সংসদ ভেঙ্গে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এটিকে সংবিধান লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে তা বাতিল করে দেয়।

শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের এপ্রিলে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয় ইমরান খানকে।

সোচ্চার সমালোচকে পরিণত হওয়া

কিন্তু তিনি নীরব হয়ে যাননি।

বরং তিনি আর্মি ও সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক সমাবেশ করেছেন এবং আগুন ঝরানো বক্তব্য দিয়েছেন নতুন নির্বাচন চেয়ে।

গত জুলাইয়ে তার দল তেহেরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই গুরুত্বপূর্ণ পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সবাইকে অবাক করে দেয়। তিনি ওই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের দল পিএমএল-এন-কে পরাজিত করেন।

অনেকেই মনে করেন দ্রুত জাতীয় নির্বাচন হলে কী হতে পারে এটি ছিল তারই ইঙ্গিত। অক্টোবরে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন মি. খানকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার অযোগ্য ঘোষণা করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাওয়া উপহার তিনি বিক্রি করেছেন।

এসব উপহারের মধ্যে রোলেক্স ব্র্যান্ডের ঘড়ি, চেইন ও জামার বোতাম আছে। ইমরান খান কমিশনের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যায়িত করে তার সমর্থকদের জড়ো করতে শুরু করেন।

এরপর তিনি শুরু করেন সপ্তাহব্যাপী লংমার্চ, যার গন্তব্য ইসলামাবাদ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন নির্বাচনের জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা। এগারই নভেম্বর তার রাজধানীতে পৌঁছানোর কথা। এই লংমার্চে মোটরসাইকেল ও ভ্যানের বহরে থেকে তিনি ছাদ খোলা বিশেষ গাড়িতে করে বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য দিতে দিতে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ পাঞ্জাবের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

“ছয় মাস ধরে আমি দেশে একটি বিপ্লব দেখতে পাচ্ছি,” মি. খান লিখেছিলেন এক টুইট বার্তায়।

“এখন প্রশ্ন হলো এটা কি ব্যালট বক্সের মাধ্যমে সহজ কিছু হবে নাকি রক্তপাতের মাধ্যমে ধ্বংসাত্মক কিছু হবে?”

বৃহস্পতিবার লং মার্চের একটি ট্রাকে যখন তিনি ছিলেন, তখন তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। গুলি তার পায়ে লাগে।

বিদ্রোহী সমর্থকরা লড়াইয়ের পক্ষে সোচ্চার

মি. খানের অবস্থা এখন স্থিতিশীল। বুলেট তার পায়ের মাংসপেশিতে লেগেছে। সাবেক তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী ইমরান খানের সাথেই ছিলেন। তিনি এএফপিকে বলেছেন সমর্থকরা হামলাকারীর কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নিতে চেয়েছিল।

“এই ধস্তাধস্তির সময় হামলাকারী টার্গেট মিস করে,” তিনি বলেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে মি. খানের ঘনিষ্ঠ রউফ হাসান এই হামলার জন্য পাকিস্তান সরকারই "সরাসরি জড়িত ছিল" বলে অভিযোগ করেছেন।

তিনি বলেছেন ভিডিও স্বীকারোক্তি দিয়ে সেটিই ঢাকার চেষ্টা করা হচ্ছে। শুক্রবার সারাদেশে প্রতিবাদের কর্মসূচি দেয় পিটিআই।

বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রতিবাদের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডন খবর দিচ্ছে, পিটিআইয়ের শত শত সমর্থক একজন সামরিক কর্মকর্তার বাসার সামনে প্রতিবাদ করছে, এমন ফুটেজ দেখা গেছে।

প্রতিবাদকারীদের একজন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন যে তারা হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান এবং এর পেছনে যারাই থাকুক তাদের শাস্তি দিতে হবে।

আরেকজন বলেন তারা মি. খানের লংমার্চকে ইসলামাবাদ নিয়ে যাবেন। “এই পদযাত্রা স্থগিত হয়ে যাবে না,” তিনি বলেন।