মৃত ব্যক্তির নাম ব্যবহার থেকে শুরু করে খুনখারাপি- বিমার টাকা যেভাবে হাতিয়ে নিতো চক্রগুলো

ছবির উৎস, Prabhat Kumar/BBC
- Author, দিলনাওয়াজ পাশা
- Role, বিবিসি সংবাদদাতা, সম্ভল
বিমার অর্থ হাতানোর জন্য জালিয়াতি করত এমন বেশ কয়েকটা চক্রের কথা প্রকাশ্যে এনেছে ভারতের উত্তর প্রদেশের পুলিশ।
ওই রাজ্যের সম্ভল জেলা পুলিশের দাবি, বিমার টাকা হাতাতে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করত ওই চক্রগুলো। এই তালিকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিশানা করা, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত বলে দাবি করা ছাড়াও বিমার টাকা হাতাতে খুন করার মতো ঘটনাও রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া এই তদন্তে পুলিশ এখনো পর্যন্ত ৬০ জনকে গ্রেফতার করেছে।
তদন্তের নেতৃত্বে রয়েছেন সম্ভলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) অনুকৃতি শর্মা।
তিনি জানিয়েছেন, ধৃতদের মধ্যে আশা কর্মী, ব্যাঙ্ক কর্মী, বিমার দাবি যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মী এবং আরও অনেকে রয়েছেন।
এসব জালিয়াতির জন্য আধার কার্ডের তথ্যেও রদবদল করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। শুধু বিমা দাবির টাকা তোলা হয়েছে।
যে সমস্ত সংস্থার সঙ্গে এই জালিয়াত চক্রের যোগ রয়েছে বলে পুলিশ অভিযোগ তুলেছে, সেই সংস্থাগুলোর বক্তব্য জানতে কথা বলার চেষ্টা করেছিল বিবিসি। কিন্তু তাদের তরফে কোনো জবাব মেলেনি।

ছবির উৎস, Prabhat Kumar/BBC
যেভাবে বিষয়টা প্রকাশ্যে এল
বিমা জালিয়াতির এই তদন্ত শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে। ঘটনার সূত্রপাত হয় একটা 'রোড চেজ'-এর হাত ধরে। রাস্তায় ধাওয়া করে দু'জন অভিযুক্তকে আটক করেছিল পুলিশ। তাদের (অভিযুক্তদের) মোবাইল ফোন ঘেঁটে এবং গাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া নথির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করার পর, বিষয়টা প্রকাশ্যে আসে।
তদন্তে জালিয়াতির জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন উপায় সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ্যে আসতে থাকে এবং একের পর এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়।
অনুকৃতি শর্মা বলেন, "আমরা একাধিক রাজ্য থেকে অভিযোগ পেয়েছি। ভুক্তভুগীর সংখ্যা হাজার হাজার মানুষ হতে পারে। এই বিমা কেলেঙ্কারির মূল্য সহজেই ১০০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।"
গুরুতর অসুস্থদের জন্য বীমা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
বুলন্দশহরের ভীমপুর গ্রামের বাসিন্দা সুনীতা দেবীর স্বামী সুভাষ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এই অবস্থায় একজন বিমা কর্মী মারফত ওই চক্র তার সঙ্গে যোগাযোগ করে।
পুলিশ জানিয়েছে, সুনীতা দেবীর স্বামীর বিমা করা হয়েছিল। কিন্তু সুভাষের মৃত্যুর পর ওই চক্র তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে থাকা (বিমার) টাকা তুলে নেয়।
প্রসঙ্গত, সম্ভল পুলিশ সুনীতা দেবীকে এই বিষয়ে জানানোর আগে পর্যন্ত তিনি কিছুই জানতেন না।
বুলন্দশহরের ভীমপুর গ্রামের বাসিন্দা সুনীতা দেবীর অসুস্থ স্বামীর মৃত্যু হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে।
যে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাদের ফোন থেকেই সুনীতা দেবীর নথি উদ্ধার করে সম্ভল থানার পুলিশ।
এএসপি অনুকৃতি শর্মা বলেন, "অভিযুক্তদের ফোন থেকে আমরা কয়েকশো মানুষের বিমার নথি পেয়েছি। তদন্তের জন্য আমরা আমাদের আশপাশে থাকা কেসগুলো বেছে নিয়েছিলাম।"
"পুলিশের টিম সুনীতার কাছে পৌঁছে দেখে, তিনি জানতেনই না যে তার স্বামীর নামে বিমা করা হয়েছে এবং একটা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে যেখান থেকে টাকা তোলা হয়েছে।"
সুনীতা দেবী নিরক্ষর। তার পরিবার খুবই দরিদ্র। ভীমপুর গ্রামে এক প্রতিবেশীর বাড়ির একটা ছোট্ট ঘরে থাকেন তিনি।
তার কথায়, "এর আগে আমার কাছে একজন আশা কর্মী এসেছিলেন। তিনি একটা ফর্ম ভর্তি করেন, আধার কার্ড ও অন্যান্য নথি নেন এবং সই করিয়ে নেন।"
"তিনি আমাকে বলেছিলেন, আপনি সরকার থেকে বিমার টাকা পাবেন এবং আপনার স্বামীর চিকিৎসাও হবে।"
বুলন্দশহরের অনুপশহরস্থিত 'ইয়েস ব্যাঙ্ক' শাখাতে সুনীতা দেবীর নামে একটা অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। সেই অ্যাকাউন্টে বিমার টাকা এসেছিল, যা অন্য এক মহিলা নিজ নামের চেকের মাধ্যমে তুলে নিয়েছিলেন বলে পুলিশের তদন্তে জানা গেছে।
এএসপি অনুকৃতি শর্মা বলেন, "এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে আশা কর্মী থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কের কর্মচারী- এমন অনেকের যোগ পাওয়া গিয়েছে। সুনীতা কখনো ব্যাঙ্কে যাননি, কিন্তু ওই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল এবং তার কেওয়াইসি (পরিচয়পত্র) করা হয়েছিল।"
"তাকে ব্যাঙ্কে যেতে হয়নি সেল্ফ চেকের মাধ্যমে ওই টাকা তুলে নেওয়া হয়। এই ঘটনায় ইয়েস ব্যাঙ্কের দু'জন ডেপুটি ম্যানেজারকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।"
এ জাতীয় ঘটনা বন্ধ করার জন্য ব্যাঙ্ক কী করছে, তা ইয়েস ব্যাঙ্কের কাছে জানতে চেয়েছে বিবিসি। কিন্তু ব্যাঙ্কের তরফে কোনও সাড়া মেলেনি।

ছবির উৎস, Prabhat Kumar/BBC
'জমি বন্ধক রেখেছি'
পুলিশ জানিয়েছে, এই বিমা চক্রগুলো গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের খোঁজ করে বেড়াত। ওই পরিবারগুলোকে সরকারি সহায়তার আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ করা হতো। গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার নামে থাকা বিমার অর্থ তুলে নিত ওই চক্র।
তেমনটাই চটেছে প্রিয়াঙ্কা শর্মার সঙ্গে। সম্ভলের একটা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তার স্বামী দীনেশ শর্মা যখন ক্যান্সারে ভুগছিলেন, তখন ওই বিমা চক্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করে।
প্রিয়াঙ্কা শর্মার কথায়, "একদিন আমি আমার স্বামীর সঙ্গে হাসপাতালে যাচ্ছিলাম। সেই সময় ওরা আমার সঙ্গে দেখা করে। আমাকে জানিয়েছিল ওরা সরকারের তরফে যারা গুরুতর অসুস্থ, তাদের সাহায্য করে।"
"ওরা বলেছিল স্বামীর চিকিৎসার জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা পাবে। তার কিছু হলে ২০ লক্ষ টাকা পাবে।"
প্রিয়াঙ্কা শর্মার দাবি, সাহায্যের নাম করে ওই ব্যক্তিরা তার কাছ থেকে এক লক্ষ ৪০ হাজার টাকা এবং কাগজপত্র নিয়ে গিয়েছে।
প্রিয়াঙ্কার স্বামী দীনেশ শর্মা ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
সম্ভলে বিমা জালিয়াতির তদন্ত শুরু হওয়ার পর পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা শর্মা। তবে তিনজন অভিযুক্তের মধ্যে দু'জন এখনও পলাতক।
স্বামীর মৃত্যু এবং তারপর বিমার নামে এই প্রতারণা, সবকিছু মিলিয়ে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন তিনি।
আর্থিক অসংগতির কারণে নিজের জমি বন্ধক রাখতে হয়েছে। দুধ বিক্রি করে কোনো মতে তার তিন সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন।

ছবির উৎস, Prabhat Kumar/BBC
মৃত ব্যক্তিদের নামে বিমা
জালিয়াতির তদন্তের সময়, এমন ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছে যেখানে নথিতে মৃত ব্যক্তিদের 'জীবিত' জানিয়ে এনে বিমা করা হয়েছিল।
এমনই একটি ঘটনা দিল্লির বাসিন্দা ত্রিলোকের। ২০২৪ সালের জুন মাসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়।
দিল্লির নিগম বোধ শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছিল।
ত্রিলোকের মৃত্যুর পর এই জালিয়াত চক্র দিল্লিরই এক ব্যাঙ্কে তার নামে অ্যাকাউন্ট খোলে, বিমা পলিসি জোগাড় করে এবং তারপর দিল্লির জিবি পন্থ হাসপাতাল থেকে তার ডেথ সার্টিফিকেটও জোগাড় করে।
তবে বিমার টাকা তোলার আগেই, ওই চক্রকে ধরে ফেলে সম্ভল পুলিশ।
দিল্লির শালিমার বাগ এলাকায় বাস করেন প্রয়াত ত্রিলোকের স্ত্রী স্বপ্না। বিমার নামে এই জালিয়াতির ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরে তিনি ভেঙ্গে পরেছেন।
স্বপ্না একটা বুটিক চালান। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বপ্না বলেন, "আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু ওই কাগজপত্রে তাকে জীবিত দেখিয়ে বাঁচিয়ে তোলার পর আবার মেরে ফেলা হয়েছে।"
স্বামীর কথা মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন স্বপ্না।
তার কথায়, "আমরা সব জায়গায় চিকিৎসা পেয়েছি, কিন্তু ক্যান্সার বাড়তে থাকে। ওর মৃত্যুতে আমি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলাম।"
ত্রিলোকের মৃত্যুর তিন মাস পর বিমা চক্রের তরফে স্বপ্নার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে সরকারি সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়।

ছবির উৎস, Prabhat Kumar/BBC
সরকারের কাছে সাহায্যের অপেক্ষায় ছিলেন স্বপ্না। কিন্তু তা হয়নি। এক সময় বিমা চক্রের সঙ্গে যুক্ত যে ব্যক্তিরা তার কাছ থেকে জরুরি নথি নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা তার ফোন ধরা বন্ধ করে দেয়।
বিমা কেলেঙ্কারির তদন্ত চলাকালীন সম্ভল পুলিশ যখন স্বপ্নার কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি জানতেন না যে তার স্বামীর মৃত্যুর পর তার নামে বিমা করা হয়েছিল।
তার কথায়, "পুলিশ আসায় আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি একজন বিধবা নারী। যখন পুলিশ এসেছিল তখন সবাই ভেবেছিল আমি কিছু একটা ভুল করেছি।"
"সেই সময় অনুকৃতি শর্মা আমাকে ফোন করে বলেন, আপনার সঙ্গে একটা ক্রাইম হয়েছে। আপনার ফাইল আমাদের নজরে আসার কারণ সেখানকার নথিতে আপনার স্বামীকে জীবিত দেখিয়ে তারপর তাকে আবার মৃত দেখানো হয়েছে।"
"এই চক্ররা আমার মতো মানুষকে টার্গেট করছে যারা ইতিমধ্যে বিধ্বস্ত। পুলিশ যদি আমার অবস্থা বুঝতে না পারত, তাহলে আমিও এই জালিয়াতির অংশ হতাম। কারণ যে সমস্ত নথি ব্যবহার হয়েছে, সেগুলি তো আমারই।"
অনুকৃতি শর্মা বলেন, "বিমার টাকা তুলতে ডেথ সার্টিফিকেট আবশ্যক। ত্রিলোকের ক্ষেত্রে দিল্লির জিবি পন্থ হাসপাতাল থেকে দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেট দেখানো হয়েছে।"
সম্ভল পুলিশকে দেওয়া জবাবে জিবি পন্থ হাসপাতাল জানিয়েছে, ওই ডেথ সার্টিফিকেট ভুয়ো।
গত পাঁচই জুলাই সম্ভল পুলিশ জিবি পন্থ হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত এক নিরাপত্তারক্ষী ও একজন ওয়ার্ড বয়কে গ্রেফতার করে। পুলিশের দাবি, হাসপাতালের নথি ব্যবহার করেই এই ডেথ সার্টিফিকেট তৈরি করা হয়েছিল।
এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বিবিসি জিবি পন্থ হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, কিন্তু তাদের তরফে কোনো সাড়া মেলেনি।
ত্রিলোকের বিমা পলিসি থেকে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ২০ লক্ষ টাকা এসেছিল। তবে বিমা জালিয়াতি চক্রের সদস্যরা সেই টাকা তুলে নেওয়ার আগেই সম্ভল পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে।

বিমার জন্য খুন
গুরুতর অসুস্থদের নিশানা করা বা মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখানোর মধ্যেই এই অপরাধ থেমে থাকেনি। পুলিশের দাবি, বিমার টাকা হাতিয়ে নিতে খুনও করা হয়েছে।
এএসপি অনুকৃতি শর্মা জানিয়েছেন, বিমা জালিয়াতির তদন্তের সময় সম্ভল থানার কাছে অন্তত চারটে এমন খুনের ঘটনা এসেছে, যেগুলোকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বলে বর্ণনা করা হয়েছিল।
এই চারজনের মধ্যে একজন ২০ বছর বয়সী অমন। জানা গেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে মাসে পশ্চিম উত্তর প্রদেশের আমরোহা ও সম্ভল জেলার সীমান্ত দিয়ে যাওয়ার রাস্তায় রাহলা পুলিশ স্টেশন থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে একটা নির্জন জায়গায় দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে বিমা নথিতে দাবি করা হয়েছিল।
পরে পুলিশি তদন্তে দাবি করা হয়, বিমা জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত চক্র অমনকে খুন করেছে।
অনুকৃতি শর্মা বলেন, "অভিযুক্তদের কাছ থেকে অমনের অনেক পলিসি ডকুমেন্টও আমরা পেয়েছি। আমি যখন তার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেখি, তখন তার সারা শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না, কিন্তু মাথায় চারটে আঘাতের চিহ্ন ছিল।"
অনুকৃতি শর্মা বলেন, "ওই চক্রের সাতজনকে ধরার পর তাদের একজনের মুখ ফস্কে বেরিয়ে আসে- আমরা রাহারার কাছে নিয়ে গিয়ে খুন করতাম। তাদের উপর আরও চাপ প্রয়োগ করায় সেলিম নামে এক যুবককে হত্যার কথা স্বীকারও করে। এতে তাদের হাতে ৭৮ লক্ষ টাকার বিমা চলে আসে।"
অমনের আধার কার্ডটি দিল্লির ছত্তরপুর এলাকার ভাটি খুর্দ গ্রাম থেকে তৈরি করা হয়েছিল। অথচ স্থানীয়রা জানিয়েছেন, তিনি কখনও সেখানে থাকেননি।
সম্ভল পুলিশ এই তদন্তের সময় পৃথক পৃথক মামলা দায়ের করেছে এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ জনকে গ্রেফতারও করেছে।

ছবির উৎস, SAMBHAL POLICE
আধার কার্ডের তথ্যে বদল
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে যে আধার কার্ডের তথ্যে কারসাজি করে জাল বয়স এবং ঠিকানা যোগ করা হয়েছে।
এএসপি অনুকৃতি শর্মা বলেন, "ইউআইডিএআই অনেক রক্ষাকবচ তৈরি করেছে, যা এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়। কিন্তু বিমা জালিয়াতি চক্রের নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তারা সেই সমস্ত রক্ষাকবচকে পাশ কাটিয়ে ফেলত।"
বিবিসি ইউআইডিএআই (ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া) এর কাছে আধার কার্ডের তথ্যে এই পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চেয়েছিল, কিন্তু কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এই তদন্ত শুরু হয়েছিল বিমা ক্লেম-এর যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মী ওমকারেশ্বর মিশ্রকে গ্রেফতারের মাধ্যমে। তিনি এখন কারাগারে আছেন। ওমকারেশ্বরের আইনজীবী নীরজ তিওয়ারি বিবিসিকে বলেছেন, তিনি নির্দোষ এবং শীঘ্রই জামিন পাবেন।
বিমা কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্তদের অধিকাংশই সম্ভল জেলার ছোট্ট শহর বাবরলার বাসিন্দা।
বাবরলার বাসিন্দা অভিযুক্ত শচীন শর্মা এবং গৌরব শর্মার বাড়িতে তালা লাগানো আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিবেশীদের অনেকেই জানিয়েছেন, প্রায় এক দশক আগে শচীন ও গৌরব শর্মার বাবা সাইকেলের টায়ার রিপেয়ার করার একটা দোকান চালাতেন।
শচীন শর্মা এবং গৌরব শর্মার পরিবারেরও গ্রেটার নয়ডায় বেশ কয়েকটা বাড়ি রয়েছে। আমরা গ্রেটার নয়ডায় বসবাসকারী তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম এই বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য, কিন্তু কোনও প্রতিক্রিয়া পাইনি।
সম্ভল থেকে প্রকাশ্যে আসা এই বিমা কেলেঙ্কারির তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন বিষয় প্রকাশ্যে আসছে। পুলিশ জানিয়েছে, এর নেটওয়ার্ক অনেক রাজ্যে ছড়িয়ে থাকতে পারে।
এএসপি অনুকৃতি শর্মা বলেন, "আমাদের কাছে অনেক রাজ্য থেকে অভিযোগ এবং তথ্য দুই-ই এসেছে। এটা একটা অত্যন্ত জটিল কেলেঙ্কারি, যার সাথে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত ব্যক্তিরা জড়িত।"
"আমরা আশা কর্মী, গ্রাম প্রধান, ব্যাঙ্ক, বিমা সংস্থার এজেন্ট, আধার পিওসি কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত লোকজন, হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত লোকজন এবং অন্যান্য অনেক সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করেছি। অর্থনীতিতে যত ধরনের খেলোয়াড় থাকেন একটা ফ্রড ইকনমিতেও সেই সংখ্যক খেলোয়াড়রাই জড়িত।"
বিমার টাকা পাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হল ডেথ সার্টিফিকেট।
আইনজীবী প্রবীণ পাঠক ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যুতে স্বচ্ছতা চেয়ে দিল্লি হাইকোর্টে একটা জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন।
তার কথায়, "এমন এক ব্যবস্থা থাকা উচিত যা স্বয়ংক্রিয় এবং ডিজিটালাইজড। যেখান থেকে আমরা জানতে পারব কার কবে মৃত্যু হয়েছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টা যাচাই করতে পারব। এই ব্যবস্থাকে উন্নত করা গেলে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব।"

কেওয়াইসি নথির অপব্যবহার
বড় মাপের এই বিমা জালিয়াতি প্রকাশ্যে আসার পর উদ্বিগ্ন হয়ে পরেছে বিভিন্ন বিমা কোম্পানিগুলো।
এসবিআই লাইফের সিওও রজনীশ মধুকর জানিয়েছেন, যে বিমাকারীর যাতে অসুবিধায় না পড়তে হয় এমনভাবেই সংস্থাগুলি দাবি প্রক্রিয়া করে। কিন্তু এর সুযোগ জালিয়াতরা নেয়।
রজনীশ মধুকর বলেন, "বিমার ক্লেম প্রসেস করার সময়, খেয়াল রাখা হয় যে বিমাকারীরা খুব বেশি সমস্যার মুখোমুখি না হন কারণ কারোও মৃত্যুর পরে পরিবারগুলো এমনিতেই খুবই বিপর্যস্ত অবস্থায় থাকে। এর মধ্যে এই লোকগুলো (প্রতারকরা) ঢুকে পড়ছে, যারা প্রতারণা করে।"
এই জালিয়াতির মূলে রয়েছে কেওয়াইসি (নো ইয়োর কাস্টোমার) অর্থাৎ পরিচয়পত্রের অপব্যবহার।
এএসপি অনুকৃতি শর্মা বলেন, "সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই জালিয়াতির জন্য মানুষের ব্যক্তিগত নথির অপব্যবহার করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যারা প্রকৃত ভুক্তভোগী, তারাও প্রতারণার তদন্তের আওতায় আসেন। এই ধরনের মানুষদের রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।"
ইনসিওরেন্স রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত ড. রমেশ খারে বলছেন, "যখন প্রতারকরা ধরা পড়ে, তখন তারা যাদের আধার কার্ড, প্যান কার্ড ব্যবহার করেছে সেই ব্যক্তিরাই সমস্যায় পড়েন। কেওয়াইসির যেন অপব্যবহার না হয় তা নিশ্চিত করা দরকার।"

End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
বাড়ছে বিমা জালিয়াতি: আইআরডিএআই
ইনসিওরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (আইআরডিএ) বিমার ক্ষেত্রে জালিয়াতি রোধ করার জন্য ২০২৪ সালে নির্দেশিকা জারি করেছিল, যার অধীনে কোনও জালিয়াতি ধরা পড়লে তা তদন্ত করা বাধ্যতামূলক।
তবে এই জালিয়াতির পরিধি কতটা সে সম্পর্কে কোনো সরকারি তথ্য নেই। তবে হিসেব অনুযায়ী এই জালিয়াতি হাজার হাজার কোটি টাকার হতে পারে।
সম্ভলের বিমা কনক্লেভে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আইআরডিএআই-এর এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর মীনা কুমারী স্বীকার করেছেন যে বিমা জালিয়াতি বাড়ছে।
মীনা কুমারী বলেন, "অনেক সময় লোকে বলে জালিয়াতির ক্ষেত্রে খুব বেশি হলে বিমার ক্লেম বেড়ে যাবে। এই পরিস্থিতিতে পরের বছর পলিসি হোল্ডারদের এর মূল্য দিতে হয়। কারণ ক্লেম বাড়ার কারণে বিমার প্রিমিয়াম বেড়ে যায়।"
মীনা কুমারী বলেন, এই অবস্থায় এর প্রভাব সেই সমস্ত গ্রাহকদের উপরে গিয়ে পড়ে যারা বিমা সংস্থায় পলিসি কিনতে এসেছেন।
এই বিমা জালিয়াতির আকার কতটা বড়, এই প্রশ্নের উত্তরে অনুকৃতি শর্মা বলেন, "আমরা পাঁচ মাস ধরে তদন্ত করছি। প্রায় ৬০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, হাজার হাজার ভুয়ো পলিসি প্রকাশ্যে এসেছে। আমি মনে করি আমরা সম্ভবত এখন পর্যন্ত মাত্র ১০ শতাংশ কাজ করতে পেরেছি। এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে এখনো অনেক কাজ বাকি।"








