'দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলায়' কেন জামিন পেলেন না উমর খালিদ ও শারজিল ইমাম

উত্তর পূর্ব দিল্লির দাঙ্গায় ৫৪ জন নিহত হয়েছিলেন - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Javed Sultan/Anadolu Agency via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, উত্তর পূর্ব দিল্লির দাঙ্গায় ৫৪ জন নিহত হয়েছিলেন - ফাইল ছবি
    • Author, উমঙ্গ পোদ্দার
    • Role, বিবিসি নিউজ হিন্দি, দিল্লি

প্রায় পাঁচ বছর আগে দিল্লিতে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, সেই ঘটনায় দুই অভিযুক্ত – উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের জামিনের আবেদন সুপ্রিম কোর্ট নাকচ করে দেওয়ায় ভারতের পত্রপত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।

সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ সোমবার দুই অভিযুক্তের জামিনের আবেদন খারিজ করার যুক্তি হিসেবে জানিয়েছে, দাঙ্গায় যে এই দুজনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তা তথ্য প্রমাণের দিকে প্রাথমিক নজর দিলেই বোঝা যাচ্ছে।

আদালত এও বলেছে যে তারা পাঁচ বছর ধরে কারাগারে আছেন এবং তাদের বিচার এখনো শুরু হয়নি – শুধু এই কারণে জামিন দেওয়া যায় না।

দিল্লি দাঙ্গা মামলায় অন্য পাঁচজন অভিযুক্তকে অবশ্য জামিন দেয় আদালত। তাদের ব্যাপারে আদালত বলেছে যে দাঙ্গায় ওই পাঁচজনের ভূমিকা ছিল সীমিত পর্যায়ে ছিল।

তবে ওই রায়ের পরের দিনই ভিন্ন একটি মামলায়, সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির অন্য একটি বেঞ্চ আর্থিক কেলেঙ্কারির একটি মামলায় অভিযুক্তকে জামিন মঞ্জুর করে। সেই বেঞ্চটি জানায় যে যদি কোনো তদন্তকারী সংস্থা বা আদালত সময়মতো কারও বিরুদ্ধে বিচার শেষ করতে না পারে তবে তাদের জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করা উচিত নয়।

দিল্লি দাঙ্গা মামলায় বিচারপতিরা তাদের নির্দেশে জানান যে বিচারে বিলম্বের পাশাপাশি জামিনের আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি মাপকাঠি দেখতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কতটা গুরুতর, অপরাধে তাদের কথিত ভূমিকা কী এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রমাণ কতটা জোরালো।

ওই রায়ের পরের দিন, মঙ্গলবার আবার অন্য বিচারপতিদের বেঞ্চ জানায় যে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে যে তার বিরুদ্ধে চলা মামলা যেন দ্রুত শেষ হয়। সংবিধানের ওই ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ 'জীবনের অধিকার' হিসেবে নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার।

এই দুটি মামলার বিষয় কী ছিল আর কেনই বা উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের জামিনের আবেদন খারিজ করা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে?

উমর খালিদ (বাঁয়ে), শারজিল ইমাম (ডানে) - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, উমর খালিদ (বাঁয়ে), শারজিল ইমাম (ডানে) - ফাইল ছবি

দিল্লি দাঙ্গা মামলা

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

রাজধানী দিল্লিতে ২০২০ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ওই দাঙ্গায় ৫৪ জন নিহত হয়েছিলেন। নিহতদের বেশিরভাগই মুসলমান।

দিল্লি পুলিশের কথায়, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ -বিরোধী যে বিক্ষোভ চলছিল ২০১৯ সালে, সেই সময়ে কয়েকজন ব্যক্তি দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল। এই মামলার নাম 'দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলা'

এই মামলায় ২০ জন অভিযুক্ত রয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং দুজন পলাতক রয়েছেন। গ্রেফতার হওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১১ জন ইতোমধ্যেই জামিন পেয়েছেন।

বাকি সাত জনের জামিনের আবেদনের ওপরে রায় দেওয়া হয় সোমবার। তারা সকলেই আবেদনে জানিয়েছিলেন যে পাঁচ বছর কারাগারে থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়নি।

তারা সুপ্রিম কোর্টেরই পুরোনো কিছু রায়ের কথা উল্লেখ করে আবেদনে জানিয়েছিলেন যে বিচারে যদি খুব বেশি বিলম্ব হয়, তাহলে অভিযুক্তদের জামিন পাওয়া উচিত।

অন্যদিকে দিল্লি পুলিশের পক্ষে উপস্থিত আইনজীবীরা জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেন। পুলিশের যুক্তি ছিল দিল্লি দাঙ্গা একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফসল, যাতে অভিযুক্তরা সকলেই জড়িত ছিলেন। তাই বিচার শুরু না হলেও এদের জামিন দেওয়া উচিত নয়।

পুলিশ আরও বলে যে বিচারে বিলম্বের জন্য অভিযুক্তরা নিজেরাই দায়ী।

এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএ অনুযায়ী সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত নানা ধারা দেওয়া হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী জামিন পাওয়া খুবই কঠিন।

ইউএপিএ অনুসারে, এই ধরনের মামলায় আদালতকে দেখতে হবে যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে হাজির করা প্রমাণগুলো প্রাথমিকভাবে সঠিক বলে মনে হয় কি না। আদালত যদি মনে করে যে প্রমাণগুলো সঠিক, তাহলে জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে যেতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টেরই ২০১৯ সালের অন্য একটি মামলার রায়ের পরে এ ধরনের মামলায় জামিন পাওয়া আরও কঠিন হয়ে গেছে। সেই রায়ে শীর্ষ আদালত বলেছিল যে জামিনের আবেদন বিচার করার সময়ে অভিযোগগুলো আদালত শুধুই ওপরে ওপরে দেখবে, গভীরে যাওয়ার দরকার নেই।

তবে, সুপ্রিম কোর্ট তার অন্যান্য কয়েকটি রায়ে বলেছিল যে যদি কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকেন এবং তার বিরুদ্ধে বিচার ষিগগিরই শেষ হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তবে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার জামিন দেওয়া উচিত।

বর্তমানে দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলাটি চার্জ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে।

আদালত চার্জ গঠন করার পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়। এই মামলার চার্জ গঠন নিয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে সওয়াল জবাব চলছে।

আদালত রায়ে কী বলেছে?

শীর্ষ আদালত বলেছে যে তারা পুলিশ পক্ষের যুক্তির সঙ্গে একমত যে বিচারে বিলম্বের জন্য অভিযুক্তরাও দায়ী। একইসঙ্গে আদালত এও জানিয়েছে যে দিল্লি দাঙ্গায় সাতজন অভিযুক্তের ভূমিকা একপ্রকার ছিল না।

দিল্লি পুলিশের চার্জশিটের কথা উল্লেখ করে আদালত বলেছে যে প্রাথমিকভাবে উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের ভূমিকা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে হচ্ছে। পুলিশের দাবি যে দাঙ্গার পরিকল্পনা, মানুষ জড়ো করা এবং দাঙ্গার দিশা নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দুজনের ভূমিকা ছিল।

আদালত বলেছে যে প্রাথমিকভাবে তারা এই যুক্তির সঙ্গে একমত। আদালত জানিয়েছে যে দুই অভিযুক্তই এক বছর পরে নতুন করে জামিনে আবেদন করতে পারবেন।

বাকি পাঁচজন অভিযুক্তের ব্যাপারে আদালত বলে যে তাদের সীমিত ভূমিকা ছিল এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তারা জড়িত ছিলেন না।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুই জন সদস্য দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, দিল্লি দাঙ্গা সংক্রান্ত একাধিক মামলার তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে

পরের দিনই ভিন্ন রায় সুপ্রিম কোর্টের

সোমবার দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলায় দুই অভিযুক্তকে জামিন না দিলেও সুপ্রিম কোর্টের অন্য একটি বেঞ্চ ঠিক পরের দিন, ছয়-ই জানুয়ারি আর্থিক অপরাধের একটি মামলায় ১৭ মাস ধরে কারাগারে বন্দি অরবিন্দ ধাম নামে এক অভিযুক্তকে জামিন দিয়েছে।

তার বিরুদ্ধে প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং, অর্থাৎ অর্থ পাচার রোধ আইনে মামলা চলছে।

এই ক্ষেত্রেও বিচারে বিলম্বের জন্য অভিযুক্তকেই দায়ী করে সরকার পক্ষ যুক্তি দিয়েছিল।

আদালত এই জামিনের আবেদনের নির্দেশ দিতে গিয়ে বলে, প্রত্যেকেরই মৌলিক অধিকার আছে যাতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা চললে তা যাতে দ্রুত শেষ হয়। আদালত আরও বলেছে যে এই মামলাটির সঙ্গে দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলার প্রেক্ষিত আলাদা এবং দুটি মামলার ক্ষেত্র পৃথক আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে সুপ্রিম কোর্টেরই ২০২৪ সালে দেওয়া দুটি পুরোনো রায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এই নির্দেশে।

বেআইনি কার্যকলাপ রোধ আইন বা ইউএপিএ-র অধীন একটি মামলায় অভিযুক্ত চার বছর কারাগারে আটক ছিলেন। তার জামিনের আবেদনের রায়ে ২০২৪ সালে শীর্ষ আদালত বলেছিল যে, অপরাধ যাই হোক না কেন এবং আইন যতই কঠোর হোক না কেন, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জামিন দেওয়া উচিত।

একইভাবে আম আদমি পার্টির নেতা মনীশ সিসোদিয়াকে জামিন দেওয়ার সময় সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালে জানিয়েছিল যে মামলার চূড়ান্ত রায় না হলেও কাউকে দীর্ঘসময় ধরে কারাগারে আটক রেখে শাস্তি দেওয়া যায় না।

তবে সোমবার দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলায় জামিনের আবেদন খারিজ করার সময়ে সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালের ওই দুটি রায়ের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেনি।

যা বলছেন আইন বিশেষজ্ঞরা

উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিন আবেদন খারিজ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ের ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।

আইন বিশেষজ্ঞ গৌতম ভাটিয়া লিখেছেন, সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ আগেই রায় দিয়েছে যে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যে কোনও অপরাধের ক্ষেত্রেই জামিন দেওয়া উচিত। উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের জামিন আবেদনের শুনানি হল যে বেঞ্চে, তাদের উচিত ছিল আগের ওই রায়টি দেখে নেওয়া।

তিনি আরও বলেন, মামলার সময়মতো বিচার নিশ্চিত করা আদালতের দায়িত্ব, সরকার পক্ষের সাক্ষ্য প্রমাণ অস্পষ্ট আর এটাও স্পষ্ট না যে উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের ধারা কীভাবে ন্যায়সঙ্গত হতে পারে।

গৌতম ভাটিয়া লিখেছেন, আদালত 'অন্ধভাবে' সরকার পক্ষের যুক্তি মেনে নিয়েছে।

প্রবীণ আইনজীবী সঞ্চয় হেগড়ে একটি বিশ্লেষণে লিখেছেন যে এই রায় কেবল উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের ভবিষ্যতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার মতে, এই রায় দেখিয়ে দিল যে ভারতে কতটা ভিন্নমত প্রকাশ করা যায়।

তিনি লিখেছেন যে বিনা বিচারে পাঁচ বছর কারাগারে থাকাটাই জামিন পাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি হওয়া উচিত।

আদালতের এই রায়ের ব্যাপক সমালোচনা হলেও সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন কয়েকজন আইনজীবী।

প্রবীণ আইনজীবী হরিশ সালভে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।

তিনি বলেন যে ইউএপিএ-র মতো আইনের ক্ষেত্রে 'জামিনই নিয়ম' নীতিটি প্রযোজ্য হয় না।