কেন নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিচ্ছে ইরানীরা?

হঠাৎ করেই ইরান থেকে এত লোক ব্রিটেনে আসার চেষ্টা করছে কেন? সাম্প্রতিক কিছু প্রবণতার আলোকেই প্রশ্নটা উঠছে।
গত তিন সপ্তাহে নৌকায় করে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ব্রিটেনে আসার চেষ্টার সময় ১০০-রও বেশি অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এরা সবাই আসছে বাতাস-ভরে-ফোলানো ছোট ছোট প্লাস্টিকের নৌকায় করে।
এক একটা নৌকায় তিনজন থেকে আট-দশজন করে লোক - যার মধ্যে শিশুও আছে। অনেকে বলেছে, তারা ১২ ঘন্টা ধরে সাগরে ভাসছিল।
তারা সবাই দাবি করছে, তারা বেলগ্রেড হয়ে ইরান থেকে এসেছে।
কিন্তু ইউরোপের এত জায়গা থাকতে বেলগ্রেড থেকেই ইরানীরা আসছে কেন?
এর উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে ১,২০০ মাইল দূরে - সার্বিয়া এবং তার রাজধানী বেলগ্রেডের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলীতে।
গত বছর আগস্ট মাসে সার্বিয়া ইরানীদেরকে বিনা-ভিসায় সেদেশে আসার অনুমতি দেয়। উদ্দেশ্য ছিল সার্বিয়ায় পর্যটন এবং বাণিজ্য বৃদ্ধি। মনে রাখতে হবে ইরান হচ্ছে পৃথিবীর ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি, এবং সার্বিয়া হচ্ছে ৬০তম।
এর পর থেকেই হাজারে হাজারে ইরানী সার্বিয়ার আসতে থাকে, যখন এই ভিসামুক্ত ভ্রমণকে অভিবাসীরা পশ্চিম ইউরোপে ঢোকার একটা সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

ছবির উৎস, PREMAR MANCHE
সার্বিয়ার একটি অভিবাসন পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রদান মিওদ্রাগ কাকিচ বলছেন, তার ধারণা - এই ভিসামুক্ত সুবিধা নিয়ে সার্বিয়ায় আসা হাজার হাজার ইরানীদের মধ্যে থেকেই অনেকে নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসার চেষ্টা করছে।
কিন্তু ভিসা ছাড়া এভাবে সার্বিয়া আসার সুযোগকে অভিবাসীরা ব্যবহার করছে - এ অভিযোগ ওঠার পর গত ১৭ই অক্টোবর ওই স্কিমাটি বন্ধ করে দেয়া হয়।
কিন্তু ততদিনে প্রায় ৪০ হাজার ইরানী সার্বিয়ায় ঢুকে পড়েছে।
তাদের কতজন দেশে ফিরে গেছে তা জানা যায় না।
কিন্তু এসোসিয়েটেড প্রেস বলছে, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে তেহরান থেকে বেলগ্রেডে আসার বিমানগুলোতে সব সময় যাত্রী ভরা থাকতো, কিন্তু তেহরান ফিরে যাবার সময় ওই বিমানগুলোই থাকতো প্রায় খালি।
বেলগ্রেডের একটি শরণার্থী সহায়তা কেন্দ্র বলছে, বেলগ্রেডের পুলিশের হিসাব মতে দেশে ফিরে যায় নি এমন ইরানীর সংখ্যা ১২ হাজার।

ছবির উৎস, Getty Images
মি. কাকিচ বলছেন, ইরানীরা সার্বিয়া হয়ে ইউরোপে ঢোকার জন্য ভুয়া পাসপোর্ট সহ বিভিন্ন জটিল পন্থা ব্যবহার করছিল। তারা সার্বিয়া ছেড়ে অন্য কোন গন্তব্যে যাবার জন্য তৈরি হয়েই আসতো। থাকতো এখানকার হোটেল বা হোস্টেলগুলোয়।
বেলগ্রেড এমন একটি শহর যেখানে ভাঙাচোরা বা পরিত্যক্ত বাড়িগুলোতে ইতিমধ্যেই সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে আসা অভিবাসীরা বাস করছে। এরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে এসেছে।
"তাদের তুলনায় ইরানীদের দেখায় অনেকটা টুরিস্টদের মতো। তাদের বাচ্চারা হুডি, জিনস এবং ব্যকপ্যাক নিয়ে ঘোরে। এরা রাস্তায় বা রিফিউজি সেন্টারে ঘুমায় না, এখানে মাসখানেক হোটেলে থাকে, তার পর কোন একজ মানব পাচারকারীকে ধরে অন্য ব্যবস্থা করে নেয়" - বলছিলেন ইনফো পার্কের গোরদান পাউনোভিচ।

ছবির উৎস, Image copyrightMIODRAG ĆAKIĆ/REFUGEE AID SERBIA
তিনি বলছেন, এই ইরানীরা অনেকেই জাল পাসপোর্টধারী - যা ইস্তাম্বুলে ৩ থেকে ৬ হাজার ইউরো খরচ করলে পাওয়া যায়।
ইরানীরা যদিও তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অন্য অভিবাসীদের চেয়ে আলাদা - কিন্তু তারা যে সরকারি নিপীড়নের মধ্যে জীবন কাটিয়েছে তা মোটেও সহজ জীবন ছিল না।
ব্রিটেনের ইরানী সমিতির কর্তা কাভেহ কালান্ত্রি বলছেন, অনেক ইরানীই স্বাধীনতা আর মানবাধিকারের জন্যই দেশ ছাড়ছেন।
"অনেক লোকই তাদের বামপন্থী বা উদারনৈতিক মতামতের জন্য, বা সংখ্যালঘু কোন ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোক হবার জন্য গ্রেফতার হয়। অনেকে প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হচ্ছে।"
এক হিসাবে বলা হয় যে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব হবার পর থেকে প্রতি বছর দেড় থেকে দুই লক্ষ ইরানী দেশ ত্যাগ করছে।

শুধু ব্রিটেনেই ২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে ২৬ হাজার ৩৫০টি এসাইলামের আবেদন পড়েছে তার ৯ শতাংশই ইরানী।
একটা তত্ব হলো যেহেতু ইরানীরা অপেক্ষাকৃত ধনী, তাই তাদের হাতে চোরাচালানী চক্রগুলোকে দেবার মতো টাকাপয়সা আছে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইরানীদের ইউরোপে আসার সম্ভাবনা বেশি।
মি. কাকিচ বলছেন, এই ইরানীদের অনেকেই গত এক বছরে সার্বিয়া হয়ে ইউরোপে ঢুকেছে। এ ছাড়া আর কোন ব্যাখ্যা আছে বলে তিনি মনে করেন না।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, অভিবাসীদের ব্রিটেনে ঢোকার প্রবণতা বেড়ে যাবার পেছনে সংগঠিত অপরাধী ও মাফিয়া চক্রগুলো আছে - যারা অনেকেই ফ্রান্সের ভেতর থেকে কাজ করে।








