অদ্বৈতের তিতাসে স্থান নেই মালোপাড়ার জেলেদের

- Author, আহরার হোসেন
- Role, বিবিসি বাংলা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাতটি উপজেলার বুক চিরে প্রবাহিত তিতাস নদীতে এখন চোখে পড়বে হাজার হাজার মৎস ঘের।
অবৈধ দখলদারেরা বাঁশ পুঁতে আর জাল দিয়ে ঘিরে আটকে ফেলেছে নদীর জল।
আর তার মধ্যে নদীর মাছ আটকে সেগুলো শিকার করছে তারা।
এসব ঘেরে সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার কোন অধিকার নেই।
* <bold><link type="page"><caption> দেখুন: ইন্টারঅ্যাকটিভ ম্যাপে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ নদী</caption><url href="http://www.bbc.com/bengali/news/2016/04/160406_amar_nodi_interactive_map" platform="highweb"/></link> </bold>
হাজার হাজার ঘেরের ফলে নদীর মাছের চলাচল বিঘ্নিত হয়ে যেমন হুমকির মুখে পড়েছে প্রাণীবৈচিত্র্য, তেমনি পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নদীতে পলি জমে দিনকে দিন কমছে নাব্যতা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণ ঘাট থেকে নবীনগর পর্যন্ত প্রায় কুড়ি কিলোমিটার নদীপথ ভ্রমণ করে এ ধরনের চার শতাধিক ঘেরের অস্তিত্বের কথা জানা যাচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে একটু দূরে গোকর্ণ ঘাট একটা নৌ বন্দর।
তিতাস নদীর এই ঘাটটি থেকে প্রতিদিন অসংখ্য লঞ্চ, ট্রলার, ইঞ্জিন নৌকা ও স্পিডবোট ছেড়ে যায় দূরবর্তী নবীনগরসহ অন্যান্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
* <bold><link type="page"><caption> ক্লিক করুন: আমার নদী, বিবিসি বাংলার ফেসুবক পাতা</caption><url href="https://www.facebook.com/events/175701469475522/?active_tab=posts" platform="highweb"/></link> </bold>
এই গোকর্ণ ঘাটের লাগোয়া বসতিটি স্থানীয় মালোপাড়া বা জেলেপল্লী।
এই পল্লীর বাসিন্দাদের জীবনযুদ্ধের চিত্র নিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণ লিখেছিলেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’।
মালোপাড়ায় ঢুকতে গিয়েই চোখে পড়ল অদ্বৈত মল্লবর্মণের একটি আবক্ষ মূর্তি।
ভেতরে তাদের পৈত্রিক বসতভিটাটি এখনো আছে। যদিও দুই তিন হাত ঘুরে সেই ভিটেতে নতুন টিনের ঘর তুলেছেন আরেকটি মল্লবর্মণ পরিবার।
পাড়ার সমর্থ পুরুষদের অলস দুপুর কাটছে আড্ডা মেরে।
এখন শুষ্ক মৌসুমে তিতাসে মাছ কম।
যা-ও পাওয়া যায় তাতে মালোপাড়ার জেলেদের অধিকার নেই, জানা গেল যদুলাল বর্মণের কথায়।
“মাছ মারতে গেলে খেউ-অলারা বাধা দেয়”, বলছিলেন যদুলাল।

যদুলাল বর্মণ যে খেউয়ের কথা বলছেন, সেটা আসলে কি?
খেউ হলো স্থানীয়ভাবে তৈরি একধরনের মাছের ঘের।
ঠিক প্রচলিত ঘের না, নদীর জল আটকে মাছ আহরণের এক ধরনের পদ্ধতি এটা।
একটি ইঞ্জিন নৌকায় চড়ে তিতাসের জল কেটে এগোতে চোখে পড়ে দু’পাশে গ্রামবাংলার অতি পরিচিত দৃশ্য।
অসংখ্য জেলে-নৌকো নদীর পাশে উল্টো করে রাখা।
মাছ ধরার জালের পরিচর্যা করছে কেউ কেউ।
জেলে-বউরা দল বেঁধে নাইতে নেমেছে নদীতে।

মিনিট দশেক চলার পর এই দৃশ্য হারিয়ে যায়।
এবার নদীর দু’ধারে বড় বড় এলাকা বাঁশ পুঁতে চারপাশে জাল দিয়ে ঘিরে রাখা, মাঝখানে কচুরীপানা।
দূর থেকে দেখে মনে হয় এক একটি সবুজ রঙা দ্বীপ। এগুলোই ঘের।
একটা ঘেরের কাছে গিয়ে দেখা গেল কয়েকজন কর্মী নিয়ে পরিচর্যা করছেন সিরাজ মিয়া।
তিনিই এই ঘেরটির কথিত মালিক। ঘেরটির আকার ৫ একরের মতো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ভেতরে অনেক মাছ।
ভেতর থেকে মাঝারি আকারের একটি বোয়াল মাছ লাফিয়ে উঠে আটকে পড়লো জালে।
সিরাজ মিয়া বলছিলেন, গত বছর তিনি এই একটা ঘের থেকে আড়াই লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন।
এই ঘেরে সিরাজ মিয়া ছাড়া আর কারো মাছ ধরবার অধিকার নেই। কেন?
“এইডা তো মনে করেন নিজে দখল কইরা, ডাল-ডোল বাঁশ-মাশ দিয়া ঘিরছি। আমার ৫০-৬০ হাজারের মতো খরচ হইছে। এখানে অন্য কেউ করতে পারেনা”। বলছিলেন সিরাজ মিয়া।
কিভাবে উন্মুক্ত এই জলাশয়ের মালিক হলেন তিনি? জানতে চাইলে সরল স্বীকারোক্তি দিলেন, “দখল করছি”।
“নেওন যায় না। কিন্তু দশে যহন নেয়, তহন আমগোও নিতে অইবো। বাচ্চা-কাচ্চা আছে, প্যাট আছে, নেওন লাগবো না?”
তার একজন সহকারী পাশ থেকে বলছিলেন, আশপাশে দুই কুড়ির মতো ঘেরে তারা মাছ ধরার কাজ করেন এবং এসব ঘের থেকে গত বছর এক কোটিরও বেশি টাকার মাছ পাওয়া গেছে।

অসমর্থিত এক হিসেব বলছে, গোকর্ণ ঘাট থেকে নবীনগর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার নদীপথে এমন প্রায় ৪০০ ঘের আছে, যেখানে সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার কোনও অধিকার নেই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক বলছেন এধরনের ঘের অবৈধ।
নদীর বুকে এমনভাবে ঘেরগুলো গড়ে উঠেছে যে মাঝখানে নদীর প্রবাহ অত্যন্ত সরু হয়ে গেছে, যেখানে কোনমতে চলছে নৌযানগুলো।
নদীতে দখলের এই উৎসব নিয়ে আমি কথা বলছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক ড. মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে।
তিনি বলছিলেন, তারা বারবার এগুলো উচ্ছেদ করেছেন, কিন্তু এত বিশাল এলাকাজুড়ে সার্বক্ষণিক নজর রাখা যায়না বলে আবারো এসে দখল করছে প্রভাবশালীরা।
আর এভাবে নদীকে আটকে মাছ আহরণের ফলে মাছের চলাচলের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে যাচ্ছে, অবাধ গতিবিধি নষ্ট হওয়ায় হুমকির মুখে পড়ছে নদীর জীববৈচিত্র্য।
অন্যদিকে বাঁশ পুঁতে, ডালপালা ফেলে, কচুরীপানা আটকে ঘের তৈরির ফলে নদীপ্রবাহে যে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে,তাতে পলি জমে প্রতিনিয়তই নাব্যতা হারাচ্ছে নদীটি, যেটা এমনকি এই ঘেরের সাথে সংশ্লিষ্টরাও স্বীকার করে নিচ্ছেন।

একদিকে সিরাজ মিয়ারা নদী দখল করে এই শুকনো মৌসুমেও লাখ লাখ টাকা রোজগার করছে।
অন্যদিকে, নদীর যেটুকু উন্মুক্ত রয়েছে সাধারণের জন্য সেখানে মাছ না মেলায় মালোপাড়ার বেশীরভাগ জেলেরাই এখন নৌকা তুলে উল্টো করে রেখেছেন নদীর পাড়ে।
কেউ কেউ বদলে ফেলছেন বাপদাদার পুরনো পেশাটিও।
রবীন্দ্র মল্লবর্মণ এখন দর্জির কাজ করছেন। তার ছেলেরাও এই পেশায় নেই। তারা চলে গেছেন নাপিতের পেশায়।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মভূমি গোকর্ণ ঘাটের মালোপাড়া এখন ক্ষয়িষ্ণু।
মেরে-কেটে শ’খানেক পরিবার এখন এখানে আছে।
আর তাদের অর্ধেকই এখন আর মাছ ধরার পেশায় নেই, চলে গেছেন অন্য পেশায়।
বাকিরাও মাছ ধরার পেশা ছেড়ে দেব দেব করছেন।








