'সমুদ্রসীমা রায়ে বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত'

ছবির উৎস, focus bangla
- Author, রাকিব হাসনাত সুমন
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ মীমাংসায় আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতের এক রায়ে বাংলাদেশ নতুন প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা পেয়েছে ।
এর মধ্য দিয়ে নিজস্ব সমুদ্রসীমার বাইরে মহীসোপানে এক বিরাট এলাকার ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই এলাকায় মৎস আহরণ ও সমুদ্রের তলদেশে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলেছেন।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে মঙ্গলবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে রায়ের বিষয়বস্তু প্রকাশের সময় জানানো হয়েছে যে আলোচিত দক্ষিণ তালপট্টির স্থানটি ভারতীয় সীমায় পড়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল বিরোধপূর্ণ আনুমানিক ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশকে দিয়েছে।
অর্থাৎ প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা বাংলাদেশ দাবি করেও পায়নি।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, এই রায় উভয় রাষ্ট্রের জন্যই বিজয় নিশ্চিত করেছে। তিনি এটিকে বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের বিজয় বলেও আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, ''এখন থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপানে বাংলাদেশের অবাধ প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত। "
"এ রায়ের ফলে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অঞ্চল এবং চট্রগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশ অবস্থিত সব ধরণের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের উপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।”
মি. আরী বলেন, ভারতের সাথে তিন দশকের বেশি সময় ধরে বিদ্যমান সমস্যা আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে এটিকেই তিনি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। রায়ের কার্যকারিতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন এর কার্যকারিতা এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে।
তবে সংবাদ সম্মেলনে রায়ের খুটিনাটি বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সমুদ্রসীমা বিষয়ক সচিব মো: খুরশেদ আলম।
তিনি জানান, গভীর সমুদ্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের যেসব ব্লক নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধ চলছিল তার সামান্য কিছু অংশ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ভারতের পক্ষে যাওয়া ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে পড়েছে।
তিনি বলেন, ''যে ২৮টি ব্লক ঘোষণা করেছিলাম তার ১৭টি মিয়ানমার দাবি করেছিলো। আর ১০টি দাবি করে ভারত। সে ১০ই আমাদের রয়েছে। খুবই অল্প অংশ পশ্চিমে। হয়তো আমাদের সামান্য পুনর্বিন্যাস করতে হবে।''
যদিও মি. আলম দাবি করেন এ রায়ের ফলে বাংলাদেশের সামগ্রিক সমুদ্র এলাকার ব্যাপ্তি অনেক বেড়েছে।
তার কাছে প্রশ্ন ছিল একসময়ের বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ তালপট্রি দ্বীপটি যে স্থানে ছিল এ রায়ের মাধ্যেমে সে স্থানটি কোন্ দেশ পেয়েছে? জবাবে মি. আলম বলেন, ১৯৮০ সালের দিকে এ স্থানটি বাংলাদেশ দাবি করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এ পর্যন্ত প্রণীত কোন ম্যাপেই বাংলাদেশ তা দেখায়নি।
তিনি বলেন, ''যেহেতু ১৯৪৭ সালের র্যাডক্লিপের ম্যাপ অনুযায়ী সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়েছে। সেহেতু ওই অংশটা ভারতের দিকে পড়েছে বলতে হয়। আমরা খেয়াল করে ম্যাপে এ কাজ করিনি। কোন ম্যাপেই প্রমাণ করতে পারিনি যে জায়গাটা আমাদের।''
তবে সচিব খুরশেদ আলম জানিয়েছেন সালিশী ট্রাইব্যুনালের পাঁচজন বিচারকের মধ্যে থাকা ভারতীয় বিচারক এ রায়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন।
তাতে একটি বিষয়ে তিনি ভারতের ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন।
দীর্ঘ কয়েক দশকেও আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় ২০০৯ সালে সালিশি আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ।
এর অংশ হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ জার্মানির হামবুর্গভিত্তিক সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে (ইটলস) মামলা করে।
২০১২ সালের ১ই৫ মার্চ ইটলস রায় ঘোষনা করলে সেটিকে সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বিজয় আখ্যায়িত করে উৎসব করা হয়েছিলো।
এদিকে ভারতেরও সাথেও আলোচনায় কোন অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডসের দ্যা হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সালিশি আদালতে আবেদনের পর গত বছর ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে।
এরপর সোমবার দুপুরে রায়ের কপি বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তবে এবার আর সরাসরি বাংলাদেশের বিজয় না বললেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন বাংলাদেশ যা চেয়েছে তা পেয়েছে। উভয় দেশেই বিজয়ী হয়েছে।








