'আমাদের হাসপাতালে নেবেন না', গ্রেফতার এড়াতে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন ইরানের বিক্ষোভকারীরা

এক্সরেতে পায়ে ক্ষতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, ইরানে নিরাপত্তা বাহিনী আহত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য মেডিকেল রেকর্ড ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে
    • Author, সরৌশ পাকজাদ
    • Role, বিবিসি পারসিয়ান

"মানুষ আমাদের সাহায্য করেছিলো এবং আমরা একটি গাড়িতে উঠেছিলাম... আমি বলেছিলাম, আমাদের হাসপাতালে নিও না"।

তারা (ছদ্মনাম) নামের একজন বিক্ষোভকারী এবং তার বন্ধু ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে একটি বিক্ষোভে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন।

ঠিক তখনই মোটরসাইকেলে করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আসে এবং জনগণের উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে শুরু করে।

"আমার বন্ধু নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সশস্ত্র সদস্যকে বললো, 'আমাদের গুলি করো না' এবং সে তখনই আমাদেরকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি গুলি চালায়। আমরা মাটিতে পড়ে যাই। আমাদের সব পোশাক রক্তে ভেজা ছিল," বলেন তিনি।

এই লেখায় বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

তারা ও তার বন্ধুদের একজন অপরিচিত ব্যক্তির গাড়িতে তোলা হয়েছিলো। কিন্তু তারা বলছিলো যে, গ্রেফতারের ঝুঁকির কারণে হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন তারা।

"সব গলিপথে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ছিল, তাই আমি সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এক দম্পতিকে আমাদের ভেতরে ঢুকতে দিতে অনুরোধ করেছিলাম"।

তারা জানান, প্রায় ভোর না হওয়া পর্যন্ত তারা ওই দম্পতির বাড়িতেই ছিলেন। এরপর তাদের পরিচিত একজন চিকিৎসককে খুঁজে পান, যিনি তাদের পায়ের ক্ষত পরিষ্কার করে দেন।

তিনি বলেন, বাড়িতেই কিছু ক্ষত অপসারণ করতে সক্ষম হন একজন সার্জন। কিন্তু তিনি তাদের সতর্ক করেছিলেন যে, "এগুলো পরে অপসারণ করা যাবে না এবং আপনার শরীরে থেকে যাবে"।

এ মাসে ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের ফলে কী পরিমাণ হতাহত হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো জানা যায়নি।

কারণ ইন্টারনেট বন্ধ এবং বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্টিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বিক্ষোভকারী একজনের পায়ের ক্ষত
ছবির ক্যাপশান, ইরানের বিক্ষোভকারীদের অনেকেই গ্রেফতারের ঝুঁকি এড়াতে বাড়িতে আঘাতের চিকিৎসা করাচ্ছেন

যদিও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি বা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা ইরানে চলমান আন্দোলনে ছয় হাজার ৩০১ জনের মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে।

যাদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯২৫ জন বিক্ষোভকারী, ১১২ জন শিশু, ৫০ জন পথচারী এবং ২১৪ জন সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।

এই মানবাধিকার সংগঠনটি আরও ১৭ হাজার ৯১ জনের মৃত্যুর প্রতিবেদন অনুসন্ধান করছে।

কমপক্ষে আরো ১১ হাজার আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে এই সংগঠনটি ধারণা করছে।

তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিবিসিকে বলেছেন, গ্রেফতারের ভয়ে হাসপাতালে গিয়ে আঘাতের চিকিৎসা নেওয়া এড়িয়ে গেছেন তারা।

বাড়িতে গোপনে চিকিৎসা করে নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা এ কারণে চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা বিবিসিকে আরো জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত রয়েছে।

আহত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য মেডিকেল রেকর্ড তারা অনবরত পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন।

তেহরানের একটি হাসপাতালের মেঝেতে আহতদের রক্ত দেখা যাচ্ছে
ছবির ক্যাপশান, তেহরানের একটি হাসপাতালের মেঝে আহতদের রক্তে রাঙা হয়ে আছে
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তেহরানের একজন সার্জন নিমা বলেন, আটই জানুয়ারি যখন কর্তৃপক্ষ চলমান আন্দোলনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে, তখন তিনি কাজে যাওয়ার পথে রাস্তায় অনেক তরুণকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছেন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, "আহতদের একজনকে আমার গাড়ির বুটে ঢুকিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাই আমি। কারণ আমি চিন্তিত ছিলাম যে পুলিশ যদি আমাদের থামায় তাহলে সমস্যায় পড়বো আমরা"।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা তাকে থামিয়ে হাসপাতালের পরিচয়পত্র দেখে যেতে দেয় বলে জানান নিমা।

"প্রায় ৯৬ ঘণ্টা ধরে, কোনো বাধা ছাড়াই, ঘুম ছাড়াই, এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ না করে আমরা অস্ত্রোপচার করেছিলাম। কেউ অভিযোগ করেনি"।

তিনি বলেন, "আমাদের সব পোশাক এবং হাসপাতালের গাউন রক্তে ভেজা ছিল। আমাদের বাইরে পড়ার পোশাক, অন্তর্বাস, সবকিছুই এই তরুণদের রক্তে ভেজা ছিল"।

বিক্ষোভের সময় পায়ে এবং মুখে গুলি লেগেছিলো এমন একজনের অস্ত্রোপচারের বর্ণনা দিয়েছেন নিমা।

"তার থুতনি ভেদ করে একটা গুলি উপরের চোয়াল দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো," বলেন তিনি।

নিমা আরো জানান, তার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেক তরুণের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গুলি লেগেছে, যার কারণে সেসব অংশ কেটে ফেলার প্রয়োজন হয়েছে এবং স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে তারা।

পূর্ব তেহরানের একটি রাস্তার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিক্ষোভে গুলির শব্দে আহতরা পালিয়ে যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Imanemunmusic/X

ছবির ক্যাপশান, পূর্ব তেহরানের একটি রাস্তার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিক্ষোভে গুলির শব্দে আহতরা পালিয়ে যাচ্ছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলমান এই পরিস্থিতিতে তিন হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, তবে তাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা পথচারী যারা "দাঙ্গাবাজদের" হামলায় নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে তারা।

আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন শোকরিকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, বিক্ষোভ চলার এই সময়ে ১৩ হাজার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, "সৌভাগ্যবশত মানুষ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং হাসপাতালগুলোর ওপর আস্থা রাখে। চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে সকল আহত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এই আস্থার কারণে গত ছয়দিন ধরে বাড়িতে চিকিৎসা করা প্রায় তিন হাজার মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছে"।

তেহরানের ফারাবি চক্ষু হাসপাতালের প্রধান ডা. কাসেম ফাখরাই আরেকটি আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ইসনাকে জানিয়েছেন যে, ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত চোখে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ৭০০ রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে। প্রায় দুইশো জনকে অন্যান্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।

আটই জানুয়ারির পরেই প্রায় সব রোগীকে ভর্তি করা হয়েছিলো বলে জানান তিনি।

জানুয়ারির প্রথম দিকের ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনী ইলামের একটি হাসপাতালে অভিযান চালাচ্ছে। যেখানে আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ছবির উৎস, Vahid Online

ছবির ক্যাপশান, বিবিসির প্রাপ্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী হাসপাতাল থেকে রোগীদের অপহরণ করেছে এবং তাদের আর দেখা যায়নি

সাইদ বিবিসিকে বলেন যে, সেন্ট্রাল শহর আরাকে বিক্ষোভ চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোঁড়া গুলিতে তার এক বন্ধুর চোখ বিকৃত হয়ে যায়।

স্থানীয় চিকিৎসকরা তাকে তেহরানে একটি বিশেষজ্ঞ চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছিলেন বলে জানান মি. সাইদ।

সেখানে পৌঁছানোর পর নার্সরা চোখে আঘাত পেয়েছেন এমন বিক্ষোভকারীদের হাসপাতালের পেছন দিক দিয়ে স্টাফ লিফট ব্যবহার করে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান।

সাইদের বন্ধু জানান, বিভিন্ন শহর থেকে আসা চোখে আঘাত পাওয়া এমন প্রায় দুইশো জন ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সাইদ বলেন, "তার দুটি অপারেশন হয়েছিলো। কিন্তু সার্জন তার কাছ থেকে কোনো খরচ নেননি"।

তেহরানের একজন স্বাস্থ্যসেবা কর্মী আরো জানিয়েছেন, চিকিৎসকরা মেডিকেল রেকর্ডে গুলির ক্ষত উল্লেখ করা এড়াতে চেষ্টা করছেন। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ওপর ক্রমাগত নজর রাখছিলো।

তেহরানে বিক্ষোভ চলার সময়ে পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সিনা তার ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

সিনা বিবিসিকে বলেন, "এটা ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের হাসপাতালের মতো, এতো বেশি আহত ব্যক্তি ছিল যে কোনো কম্বল বা চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিল না"।

"যখন আমি একজন নার্সের কাছে আমার ভাইয়ের জন্য একটি কম্বল চাইলাম, তখন তিনি আমাকে বাড়ি থেকে একটি কম্বল আনতে বললেন। কারণ আহতদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল না"।

স্বাস্থ্য বীমা ব্যবহারের জন্য আসল পরিচয়পত্রের নম্বর দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না বলে জানান সিনা।

"যে কোনো মুহূর্তে নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের বাড়িতে অভিযান চালাতে পারে" বলেন সিনা।

ছোট শহরগুলোতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিবিসি যেসব রিপোর্ট পেয়েছে সেগুলোতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী হাসপাতাল থেকে রোগীদের অপহরণ করেছে এবং তাদের আর দেখা যায়নি।

সার্জন ডা. আলিরেজা গোলচিনি

ছবির উৎস, HRANA

ছবির ক্যাপশান, আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা করার জন্য কাজভিনের সার্জন ডা. আলিরেজা গোলচিনিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গেছে

মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে যে, আহত বিক্ষোভকারীদের যেসব চিকিৎসকরা চিকিৎসা করেছেন এবং অন্যান্যরা এখন নিজেরাই নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন।

ইরান হিউম্যান রাইটস বা আইএইচআর গত সপ্তাহে জানিয়েছে যে, ইরানে তাদের সূত্রগুলো কমপক্ষে পাঁচজন চিকিৎসক এবং একজন স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেফতারের খবর দিয়েছে।

নরওয়েভিত্তিক এই সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, "নিরাপত্তা সংস্থাগুলো চিকিৎসকদের গ্রেফতার এবং অস্থায়ী চিকিৎসা আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে অভিযান চালিয়ে জনসাধারণকে ভয় দেখানো এবং আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে"।

উত্তরাঞ্চলীয় শহর কাজভিনের একজন সার্জন ডা. আলীরেজা গোলচিনির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এই সপ্তাহে জানিয়েছে, আহত বিক্ষোভাকারীদের চিকিৎসার জন্য যখন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো, তখন নিরাপত্তা বাহিনী তার বাড়িতেই তাকে মারধর করেছে।

তারা আরো জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে 'মোহারেবেহ', যার অর্থ 'আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা' এই অভিযোগ আনা হয়েছে।

ইরানি আইন অনুযায়ী, এই অপরাধে মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে।