গোলাম আযমের রায়ে সোমবার হরতালের ডাক

_bangla_golam_azam_ghulam
ছবির ক্যাপশান, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর গঠনে নেতৃত্ব দেয়ারও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
    • Author, শায়লা রুখসানা
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা

বাংলাদেশের বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত দলের সাবেক আমির গোলাম আযমের রায়ের বিরুদ্ধে সোমবার সারা দেশে হরতাল আহ্বান করেছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সোমবার গোলাম আযমের মামলার রায়ের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর জামায়াতের তরফে সকাল-সন্ধ্যা এই হরতালের ডাক দেয়া হয়।

এর আগে জামায়াতে ইসলামীর তিনজন শীর্ষস্থানীয় নেতা কাদের মোল্লা, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের রায়ের দিনও জামায়াত হরতাল পালন করে।

বিচারে আদালত মি. সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়ার পর এই রায়ের বিরুদ্ধে সারা দেশে ব্যাপক সহিংসতা ঘটে।

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলার রায়ও অপেক্ষমাণ রয়েছে ট্রাইব্যুনাল -২ এ।

এদিকে সোমবারের হরতালের সমর্থনে এবং নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভাংচুর ও গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে হরতালকে ঘিরে নাশকতা ঠেকাতে ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকে শুরু করে রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা হচ্ছে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ৬০টি অভিযোগ

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আনা হেয়ছে সেগুলো হচ্ছে: হত্যা, ধর্ষণ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনা ও নির্দেশসহ ৬০টিরও বেশি অভিযোগ।

ট্রাইব্যুনালের একজন কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ জানান, মি. আযমের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ততার পাশাপাশি নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, “গোলাম আযমের বিরুদ্ধে চারটি ভাগে ভাগ করে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে পরিকল্পনা, অপরাধ সংঘটনের জন্য প্ররোচণা, সহযোগিতা। এছাড়া একটি হত্যার মামলাতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। সরাসরি তার সম্পৃক্ততার যেমন কথা রয়েছে। একই সাথে উর্ধ্বতন নেতৃত্বের যে দায়বদ্ধতা সেটি এই অভিযোগে প্রতীয়মান হবে।”

তুরিন আফরোজ জানান, ট্রাইুব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়ায় মোট ১৭জন সাক্ষির সাক্ষ্য নেয়া হয়। এর মধ্যে ১৬ জন স্বশরীরে এবং একজনের জবাবনবন্দী উপস্থাপন করা হয়।

১৯৭১ সালে বহু বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান
ছবির ক্যাপশান, ১৯৭১ সালে বহু বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ গত ১৭ই এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষের তরফে আসামি পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি-তর্কের জবাব দেওয়ার পর মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর রায় অপেক্ষমান রাখা হয় এবং তার প্রায় তিন মাস পর এই রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে সোমবার।

তুরিন আইফরোজ বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ মনে করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যেসব মানবতাবিরোধী সংঘটিত হয় নির্দেশদাতা হিসেবে তার সকল কর্মকান্ডের দায়দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে তার স্বপক্ষে প্রসিকিউশন প্রানেল আদালতে তাদের যুক্তি তুলে ধরেছে।

''১৯৭১ সালের যে অপরাধগুলোর সাথে তাকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে সেখানে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, লুণ্ঠন যা কিছু সে সময়টাতে হয়েছে যেগুলো জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বে তার দায়দায়িত্ব তার ওপরই বর্তায়। সে সময় যে নারী-ধর্ষণ হয়েছে সেগুলো জামায়াতে ইসলামের ছাত্র সংগঠন যেটি ইসলামী ছাত্র সংঘ হিসেবে পরিচিত তাদের ইউনিট হিসেবে আল্‌-বদর, রাজাকার, আল্‌-শামস তারা কিন্তু নারীদের ধর্ষণ নির্যাতন করেছে। সেই ধর্ষণের দায়দায়িত্ব যে প্রকৃত অপরাধী তা ওপর যেমন বর্তাবে তেমনি, নেতৃত্বে জায়গায় থাকার জন্য জামায়াতের আমির হিসেবে গোলাম আযমের ওপরও বর্তাবে। ওনার দিক-নির্দেশনায় সমস্ত অপরাধ সম্পন্ন হয়েছে।”

তবে এই অভিযোগের বিষয়ে গোলাম আযমের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তারা মনে করেন প্রসিকিউশন যেসব অভিযোগ উপস্থাপন করেছে তার পক্ষে তারা যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ বা তথ্যাদি হাজির করতে পারেন নি।

মি. রাজ্জাক বলেন, একটিমাত্র অপরাধ, সেটি হচ্ছে সিরু মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার সাথে তাকে জড়িত করা হয়েছে। তাতেও বলা হয়েছে তিনি চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু সেই দুটো চিঠির একটিও কোর্টে উপস্থাপন করা হয়নি। যিনি চিঠি বহন করে নিয়ে গিয়েছিরেন তাকেও কোর্টে সাক্ষি হিসেবে মানা হয়নি। সেই চিঠি যিনি পড়েছিলেন তাকেও কোর্টে সাক্ষি হিসেবে মানা হয়নি। এই অপরাধ ছাড়া বাকি সবগুলোতে বলা হয়েছে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন যার ফলে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। সিরু মিয়া ছাড়া গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনও অপরাধের অভিযোগ নেই। রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী কোনও অভিযোগ তুলে ধরতে।

১৯৯৯ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমিরের পদ থেকে অবসরে গেলেও দলটির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। তার আইনজীবী ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, গোলাম আযম পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছেন। তবে এই বিষয়টিকে যুদ্ধাপরাধের সাথে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

মি. রাজ্জাক বলেন, “রাজাকার গঠিত হয়েছিল একাত্তর সালে রাজাকার অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে তারা ছিল সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তান আর্মির অধীনে। গোলাম আযম সাহেবের হাতে যে রাজাকারের কমান্ড ছিল এটি তো কল্পনার কাহিনী মাত্র। নি:সন্দেহে গোলাম আযম পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছেন, পাকিস্তানের সংহতির জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু তার বিচার হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধে তিনি জড়িত ছিলেন কি-না। এই দুটো বিষয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।”

গোলাম আযম মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হলে, বিচারকরা জামিনের আবেদন নাকচ করে দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তখন থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেলে রয়েছেন।

এর আগে ট্রাইব্যুনাল-১ এর রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড এবং ট্রাইবুনাল ২-এ আরেক জামায়াত নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং সাবেক সদস্য আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারকে ফাঁসির রায় এবং আরেক জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড রায় দেয়া হয়।

এদিকে গোলাম আযমের রায় ঘোষণা করা হবে রোববার দুপুরে এই খবর প্রচারের পর থেকেই পল্টন, বিজয়নগর, কাকরাইল, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের করে জামায়াত-শিবিরের সমর্থকরা। পল্টনে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনাও ঘটে।