বিডিআর বিদ্রোহের ক্ষত এখনও তাজা

- Author, ওয়ালিউর রহমান মিরাজ
- Role, প্রযোজক, ঢাকা
বাংলাদেশে তিন বছর আগে সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিডিআর-এ বিদ্রোহের ফলে সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার সম্পর্কে যে সংকট দেখা দিয়েছিল, বিশ্লেষকরা বলছেন, তা অনেকটা প্রশমিত হলেও ঘটনা থেকে তৈরি হওয়া ক্ষত এখনো মুছে যায়নি।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে বিদ্রোহের সময়ে সংঘটিত হত্যাকান্ডগুলোর বিচার দ্রুত করার মাধ্যমে এর একটি সমাপ্তি টানতে হবে, একই সাথে ঘটনার রহস্যের পুরোটা উন্মোচন করাও প্রয়োজন।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যে সরকারের উচিত সংকট মোকাবেলায় একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা।
বিডিআর বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তার মধ্যকার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা গিয়েছিল অতি দ্রুতই।
বিদ্রোহের সময় সেনাবাহিনীর ৫৭ জন কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

ঘটনার পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেনাকুঞ্জে গিয়ে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। আর সেখানেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন সেনা কর্মকর্তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন যে সেটি ছিল তরুন কর্মকর্তাদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। তবে তাঁর মতে, এখনো ক্ষোভ আছে হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে।
তিনি বলেন, এই ক্ষোভ থাকাটা হয়তো স্বাভাবিক। এটি যে শুধু সামরিক বাহিনীর মধ্যে আছে, তা নয়। সামরিক বাহিনীর বাইরেও অনেকে সমালোচনা করছেন যে কেন এত দিন লাগছে, কেন এত দেরি হচ্ছে।
তবে অধ্যাপক আহমেদ মনে করেন যে সরকার বিচার কাজটি দ্রুত শেষ করতে চেষ্টা করছে।
সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এএনএম মুনিরুজ্জামান অবশ্য মনে করেন, কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেনাবাহিনীতে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা বহুলাংশে প্রশমিত হয়েছে। কিন্তু যে দুঃখবোধ বা ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা সম্পূর্ণভাবে মুছে যায়নি।
তিনি বলেন যে পুরো ঘটনার একটি সমাপ্তি টানা প্রয়োজন, তা না হলে আবারো দুঃখবোধ থেকে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু বিদ্রোহ এবং এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারটি সরকার যেভাবে সামাল দিয়েছে, কিংবা বিচারের ব্যাপারটি সামাল দিচ্ছে, তাতে কি কোন অসম্পূর্ণতা রয়েছে?
জবাবে জেনারেল মুনিরুজ্জামান বলেন, যে অনুসন্ধান করা হয়েছিল, বলা হয়েছিল তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। তা করা হয়নি বলে অনেকের মতে অনেক প্রশ্ন ও সন্দেহ দেখা দিয়েছিল।
তিনি বলেন, অনেকে মনে করেছিলেন - এবং অনেকে মনে করছেন - যে অনুসন্ধানে যতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখা দরকার ছিল এবং যতটা গভীরে যাওয়া প্রযোজন ছিল, তা করা হয়নি। এর থেকে বিভিন্ন রকম সন্দেহ তৈরি হতে পারে, যা কেসটিকে সমাপ্ত করতে বাধাগ্রস্থ করতে পারে।
জেনারেল মুনিরুজ্জামান বলেন, বিডিআরের ঘটনা ছাড়াও সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কে আরো টানাপোড়েন দেখা গেছে এবং সেদিকেও দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

ছবির উৎস, focus bangla
তিনি বলেন, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ করে যেদিকে বেশি নজর দিতে হবে, তাহলো সেনাবাহিনীর ওপর গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলোকে ঠিকমত ব্যবহার করা।
তাঁর মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রে সেনাবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেসব উপায় থাকে, সেগুলো যাতে সম্পূর্ণভাবে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকতে হবে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিকে ক্ষমতায়ন করতে হবে এবং সেনাবাহিনী সংক্রান্ত অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে দিতে হবে।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ অবশ্য মনে করেন না যে বিডিআর বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে পুরো সেনাবাহিনীর সঙ্গে নির্বাচিত সরকারের সম্পর্কে কোন সংকট তৈরি হয়েছিল কিংবা চেইন অব কমান্ডে কোন সমস্যা তৈরি হয়েছিল।
তবে তাঁর মতে, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট ইউনিট বা সংকট ব্যবস্থাপনা ইউনিট নেই, ফলে বিডিআর বিদ্রোহের মতো ঘটনা ঘটলে তা কীভাবে সামাল দেয়া যায়, তা আমরা বুঝে উঠতে পারি না।
এক্ষেত্রে তিনি উদাহরণ হিসেবে ভারতের মুম্বাই, যুক্তরাষ্ট্র ও লন্ডনে সন্ত্রাসী হামলার উল্লেখ করে বলেন যে এই সবগুলো ক্ষেত্রেই আগে থেকে তৈরি একটি কাঠামোর আওতায় সংকট সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
“বিডিআরের ঘটনা থেকে একটি বড় শিক্ষা হলো, যে নামেই ডাকি না কেন, এরকম একটি কাঠামো আমাদেরও দরকার।“
বিদ্রোহের ঘটনার পর অনেকেই একে একটি বড় ষড়যন্ত্রের অংশ বলেও দাবি করেছিলেন।
সেনাবাহিনীর ভেতরেও একই রকম সন্দেহ থেকে যেতে পারে কি না, এমন এক প্রশ্নে জেনারেল মুনিরুজ্জামান বলেন, শুধু সেনাবাহিনী নয় বরং অনেকেই মনে করেন যে এত বড় একটি ঘটনা সৈনিকদের পরিকল্পনায় হওয়াটা খুব স্বাভাবিক নয়।
“কাজেই এর সাথে অন্য কেউ জড়িত আছে কিনা, অন্য কোন হাত আছে কিনা, সেগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।“
সেটা কতটুকু করা হয়েছে, তা নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ আছে। কাজেই এ ব্যাপারে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন জেনারেল মুনিরুজ্জামান।
তিনি বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জানার যদি কোন অবকাশ থাকে, তবে তা জানা প্রয়োজন, কেননা এর সাথে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থও জড়িত।








