তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে বিভ্রান্তি

তিস্তা বাঁধ
ছবির ক্যাপশান, তিস্তা বাঁধ

বাংলাদেশ এবং ভারত, দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের বিশেষজ্ঞ কমিটি তিস্তা নদীর পানি বন্টনের ব্যাপারে পনেরো বছর মেয়াদের অন্তর্বর্তীকালীন একটি চুক্তির খসড়া চুড়ান্ত করেছে।

দুই দেশের পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ের সচিবদের নেতৃত্বে যৌথ নদী কমিশনের বিশেষজ্ঞ কমিটি সোমবার ঢাকায় সারাদিন ধরে বৈঠক করেছে।

তবে সমঝোতার বিষয়গুলোতে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।

অন্যদিকে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সেচমন্ত্রী সুভাষ নস্কর বলেছেন তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না৻

‘‘এখন পর্যন্ত কি চুক্তি হচ্ছে বাংলাদেশে আর ভারত সরকারের মধ্যে, আমরা রাজ্য সরকার এ‘ব্যাপারে ওয়াকিবহাল নই‘‘, মি নস্কর বিবিসিকে বলেন৻

পশ্চিমবঙ্গের সেচ মন্ত্রী সুভাষ নস্কর দিল্লীতে অনুষ্ঠিত শেষ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন৻

“এরকম চুক্তির কথা হয়ে থাকলে পশ্চিমবঙ্গের তা জানা উচিত ছিলো৻ কারণ সংবিধান মতে, জল মূলত একটা স্টেট সাবজেক্ট৻ আর তিস্তার জলটা পশ্চিমবঙ্গকেই দিতে হবে যখন, তখন ব্যাপারটা আমাদের জানা উচিত ছিলো,” বললেন সুভাষ নস্কর৻

শেখ হাসিনা আর মনমহন সিং
ছবির ক্যাপশান, তিস্তার পানি নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী আলোচনা করেছেন

তবে তিনি এই আশা প্রকাশ করেন যে, ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করেই চুক্তিটি করবে৻

ঢাকা থেকে বিবিসির কাদির কল্লোল আরো জানাচ্ছেন :

বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ের সচিব শেখ মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান বলেছেন, একদিনের এই বৈঠকে তিস্তা নদীর পানি বন্টনের ব্যাপারে সমস্যাগুলোতে সমাধানে পৌছানো সম্ভব হয়েছে।

যার ভিত্তিতে ১৫ বছর মেয়াদের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তবে পানি বন্টন কি ভাবে হচ্ছে, সে সব বিষয়ে পানি সম্পদ সচিব এ মুহুর্তে বিস্তারিত বলেন নি।

তিনি উল্লেখ করেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির এই খসড়া এখন অনুমোদন বা স্বাক্ষরের ব্যাপারে রাজনৈতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে।

এ বছরই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় সফরে আসার কথা রয়েছে। সে সময়ই চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

মি ওয়াহিদুজ্জামান জানিয়েছেন, এতদিন দুইদেশ কে কতটা পানি পেয়েছে এবং নদীর পানি প্রবাহ, এসব বিশ্লেষণ করেই তারা অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির খসড়া তৈরি করেছেন।

এই চুক্তি হওয়ার পরে জরিপ চালানো হবে, সেই জরিপের ভিত্তিতে স্থায়ী চুক্তির প্রশ্ন আসবে।

অন্যদিকে দিল্লী থেকে বিবিসির সংবাদদাতা শুভজীত বাগচী জানাচ্ছেন :

তিস্তার জলবন্টনের বিষয়টিকে বাস্তবায়িত করতে ভারতের যে একটা ইচ্ছা রয়েছে তার প্রমাণ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এত বছর আগে দিল্লীতে করা যৌথ বিবৃতির ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ৻

সেখানে বলা হয়েছে, ‘তিস্তার জলবন্টনের বিষয়ে আলাপ-অলোচনা দ্রুত শেষ করতে হবে৻ এই মর্মে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের মন্ত্রীদের ২০১০-র প্রথম অর্ধে মন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক করানোর জন্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৻’

মাসকয়েক আগের সেই আলাপ-অলোচনায় বিশেষ কোনও ফল পাওয়া যায়নি৻

তার মধ্যেই কি করে অর্ন্তবর্তী চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়ে গেলো তা কেউই বুঝে উঠতে পারছেন না৻

তিস্তার পানি বন্টন যে একটা অত্যন্ত জটীল বিষয় ভারতের কূটনীতিবিদ ও জল সম্পদ বিশেষজ্ঞরা তা স্বীকার করেন৻

এর কারণ, দীর্ঘ সময়ে ধরে তিস্তার প্রবাহ সম্পর্কে দু-দেশ একমত হতে পারেনি ৻

দু-দেশ আলাদা আলাদা ভাবে নিজেদের মতো করে পৃথক সমীক্ষা করেছে,কিন্তু মতের কোনও মিল তাদের কখনও হয়নি৻

কিছুদিন আগে বিবিসি কে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ভীণা সিক্রি বলেছিলেন, দু দেশের জলপ্রবাহ সমীক্ষার ফলাফলে ব্যাপক ফারাক থাকার কারণেই তাদের মতের মিল কখনও হয়নি৻

“আমি অসংখ্য বৈঠকে উপস্থিত থেকে দেখেছি, দুটি বিষয়ে দু দেশের বক্তব্যে বিরাট ফারাক রয়েছে৻

‘‘বারো-তেরো বছরের তিস্তার জলপ্রবাহ সমীক্ষার গড় দু-দেশ মিলিয়ে দেখেছে৻ তা করে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিসংখ্যানে দু-দেশ উপনীত হয়েছে৻‘‘

ভীণা সিক্রির মতে এই ফারাক দূর করতে, পৃথক নয়, যৌথ জলপ্রবাহ সমীক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে৻

দিল্লীতে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এই সমীক্ষা করার কথাও হয়েছিলো৻ স্থির হয়েছিলো তা করা হবে মালদার গাজলডোবায়৻

যে কারণে পশ্চিমবঙ্গের সেচ মন্ত্রী কিছুটা হতাশ গলায় বললেন, “এই যৌথ সমীক্ষা না করেই কি করে বিষয়টা মিটে গেলো আমার জানা নেই৻ খবর নিয়ে দেখছি৻‘‘