কুমির হঠাৎ ফরিদপুরে এলো কোথা থেকে?

কুমির

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০০০ সালে বাংলাদেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মিঠা পানির কুমির বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার সদর উপজেলায় এক নারী কুমিরের আক্রমণের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার। পারুলী বেগম নামে ওই নারী এখন পায়ে ও হাতে আঘাত নিয়ে হাসপাতালে রয়েছেন।

ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার ভোরে সদর উপজেলার নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের মনসুরাবাদ গ্রামে।

যা ঘটেছিল শনিবার ভোরে

পারুলী বেগমের স্বামী রাজ্জাক শেখ জানিয়েছেন, ফজরের আজান যখন দিয়েছে ওই সময় তার স্ত্রী ঘর থেকে বের হয়েছিলেন টয়লেটে যাবেন বলে। হঠাৎ স্ত্রীর চিৎকার শুনতে পেয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বের হন তিনি।

"আমার স্ত্রী যেটা বলেছে, সে মুরগির দাপাদাপি আর ডাক শুনে প্রথমে হাঁস-মুরগির খোপের দিকে এগিয়ে যায়। শিয়াল ঠেকাতে সেখানে জাল দেয়া ছিল। সে প্রথমে মনে করেছে জালে হয়ত গরুর বাছুর বা কিছু আটকে গেছে। জাল তুলতেই পায়ে কামড় দিয়ে তাকে ফেলে দিয়েছে। তারপর পা কামড়ে ধরে টান দিয়েছে।

"আমি চিৎকার শুনে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে দেখি সে মাটিতে পড়ে আছে। টর্চলাইট মেরে দেখি পায়ের কাছে কুমির। আমি হাতে বাঁশ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরপরই ভিটা থেকে পঞ্চাশ হাত দুরে সেটা পানিতে নেমে গেল। কুমিরটাকে সবমিলিয়ে ছয় হাতের মতো হবে বলে মনে হয়েছে,", বলছিলেন রাজ্জাক শেখ।

জলাধার

ছবির উৎস, MD RUBEL

ছবির ক্যাপশান, মনসুরাবাদ গ্রামের এই জলাধারে কুমির দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা বলছেন।

তার বাড়ির পাশেই একটি জলাধার বা খাঁড়ি যা আধা কিলোমিটার দুরে পদ্মা নদীর সাথে সংযুক্ত। গত বছর অগাস্ট মাসে একই ইউনিয়নে পদ্মা নদীর সাথে সংযুক্ত একটি খাঁড়ি বা খালে মিঠা পানির একটি কুমির পাওয়া গিয়েছিল।

সেসময় কুমিরটি সাত দিন ধরে ওই জলাধারে অবস্থান করেছিল। পরে সেটিকে ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে পাঠায় প্রাণী সম্প্রসারণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ।

যদিও ২০০০ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অব নেচার বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে মিঠা পানির কুমির বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে।

স্থানীয়ভাবে সতর্কতা অবলম্বন

নর্থ চ্যানেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: মোস্তাকুজ্জামান জানিয়েছেন এখন ওই অঞ্চলে মানুষজনের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। স্থানীয় জেলেদের মধ্যে অন্তত তিনজন কুমির দেখতে পেয়েছে বলে জানিয়েছে।

তিনি বলছিলেন, "স্থানীয় জেলেদের মধ্যে তিনজন বাজারে আলাপ করেছে যে তারা কুমির দেখতে পেয়েছে। কিন্তু লোকজন ওদের কথা বিশ্বাস করেনি। জলাধারের কাছে থাকে এমন লোকজন বলছে বড় মাছ পানির নিচে জোরে ঝাপটা দিলে যেমন হয় পানিতে তারা সেরকম দেখতে পেয়েছে। জলাধারটি কচুরি পানায় ভরা। কুমির যদি সেখানে আশ্রয় নেয়, তাহলে দম নিতে তাকে পানির উপরে উঠতেই হবে।"

কুমির

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে শুধুমাত্র লোনা পানির কুমির পাওয়া যায় সুন্দরবন অঞ্চলে।

তিনি জানিয়েছেন জলাধারটির কাছে লাল পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। স্থানীয়দের সেদিকে না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাঁশ দিয়ে দূর থেকে টেনে জলাধারের কচুরি পানা পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে।

কুমিরটি কারো চোখে পড়লে কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে। প্রাণী সম্প্রসারণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগে খবর দেয়া হয়েছে তবে সেখান থেকে কেউ এখনো নর্থ চ্যানেল যায়নি।

কোথা থেকে এলো কুমির

খুলনা অঞ্চলে সংস্থাটির প্রাণী বিশেষজ্ঞ মফিদুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশে এখন শুধুমাত্র লোনা পানির কুমির পাওয়া যায় সুন্দরবন অঞ্চলে।

এছাড়া এই একই প্রজাতির কুমির কয়েকটি খামারে চাষ হয়ে থাকে। কিন্তু সেগুলো মিঠা পানিতেই চাষ হয়। এর বাইরে বাংলাদেশে চিড়িয়াখানা ছাড়া আর কোথাও মিঠা পানির কুমির নেই।

যদিও বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে প্রাণীটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে, তবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৫ সালে মাগুরায় মধুমতী নদীতে ৫৩ বছর পর মিঠা পানির কুমির দেখা গিয়েছিল। এরপর ২০১৮ ও ২০১৯ সালে পাবনায় ও রাজশাহীতে দুইবার এই ধরনের কুমির দেখা যায়।

কুমির ছানা

ছবির উৎস, ABU HOSSAIN SUMON

ছবির ক্যাপশান, কিছু খামারে লোনা পানির কুমির চাষ হয়।

গত বছর যে কুমিরটি ধরা হয়েছে বা এখন আবারও যে কুমিরটি দেখা গেছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেই বিলুপ্ত প্রজাতির কুমির কীভাবে বাংলাদেশের ফরিদপুরের জলাধারে এলো?

কুমির নিয়ে কাজ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদুল আহসান। তিনি বলছেন, "ভারতের অংশে এখনো মিঠা পানির কুমির টিকে আছে। এর আগে বেশ কয়েকবার দেখা গেছে যে বন্যার সময় ভারত থেকে মিঠা পানির কুমির ভেসে বাংলাদেশে চলে এসেছে। সেরকম হতে পারে। বন্যা হয়ে গেল। এখন বৃষ্টি হচ্ছে, নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

"তবে এই কুমিরটি মিঠা পানির কি না সেটাও চিন্তা করতে হবে। কারণ সুন্দরবনের করমজল, যেখানে নোনা পানির কুমির লালন পালন করা হয়, পানি বেড়ে গিয়ে সেখান থেকেও কয়েকবার কুমির নদীতে ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে," বলছিলেন মি. আহসান।

ফরিদপুরের কাছাকাছি রাজবাড়িতে কুমিরের সাথে কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে এমন প্রাণী ঘড়িয়াল দেখা যায় বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে ঘড়িয়াল আক্রমণাত্মক নয়। মানুষের সাথে ঘড়িয়ালের সংঘর্ষের কথা শোনা যায় না। আকৃতিতে ঘড়িয়াল অত বড় নয়। তাদের মুখের সামনের দিকটা সরু বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আহসান।

ভিডিওর ক্যাপশান, কুমিরের সাথে বসবাস। কুমির রক্ষার জন্য তিনি এ উদ্যোগ নিয়েছেন।