ইতিহাসের সাক্ষী: কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বদলে দিয়েছিল গর্বাচফের 'পেরেস্ত্রইকা'

ছবির উৎস, Getty Images
উনিশশ' পঁচাশি সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন মিখাইল গর্বাচফ। সোভিয়েত অর্থনীতি যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সেই অবস্থায় গর্বাচফ শুরু করেছিলেন বৈপ্লবিক এক সংস্কার কর্মসূচি - যার নাম ছিল পেরেস্ত্রইকা। এই পেরেস্ত্রইকার সূচনার সেই উত্তেজনাপূর্ণ সময়টাতে মস্কোতে ছিলেন এমন তিন ব্যক্তির সাথে কথা বলেছেন বিবিসির লুইস হিদালগো - যা নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্ব:
সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য সে ছিল এক বৈপ্লবিক সময় । তখন মিখাইল গর্বাচফের ক্ষমতায় আসার দু'বছর পার হয়েছে।
তিনি ছিলেন এক নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্ট নেতা - যিনি নতুন ভাষায় কথা বলছেন। গর্বাচফের সংস্কার কর্মসূচির দুটি মূল স্তম্ভ ছিল গ্লাসনস্ত বা 'খোলা দুয়ার' আর পেরেস্ত্রইকা বা 'পুনর্গঠন' - যা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে ।
তিনি বলেছিলেন, "গণতন্ত্রায়ন আর খোলা দুয়ার নীতি এ সংস্কারের সাফল্যের পূর্বশর্ত। আমাদের যে অনেক দূর যেতে হবে তারই গ্যারান্টি আছে এ দুটির মধ্যে। আমরা এই যে পথ বেছে নিয়েছি তা আর উল্টো দিকে ঘুরিযে দেয়া যাবে না, এবং এটাই আমাদের জনগণের ইচ্ছা ।"

ছবির উৎস, Getty Images
মিখাইল গর্বাচফ তার এই সংস্কার কর্মসূচি প্রথম উত্থাপন করেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির এক বৈঠকে।
"মনে হয়েছিল শুধুই বাগাড়ম্বর"
ইয়েলেনা ভলকোভা তখন ছিলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন অধ্যাপক। তার মনে আছে যে তিনি গর্বাচফের মুখে যা শুনছিলেন - তা শুরুতে তাকে খুব একটা মুগ্ধ করতে পারেনি।
"আমার কাছে এগুলো খানিকটা বাগাড়ম্বর বলেই মনে হয়েছিল" - বলছিলেন ইয়েলেনা।
"কারণ এতে কমিউনিস্ট পার্টির সেইসব বস্তাপচা একঘেঁয়ে কথাই ছিল, যেমন সমাজতান্ত্রিক স্বশাসন, সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র, মানবিক চেহারার সমাজতন্ত্র, রাষ্ট্র ও পার্টি আমাদের জন্য কাজ করছে, দেশে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে- ইত্যাদি।"
আরো পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
ইয়েলেনা বলছিলেন, "এগুলো ছিল এমন একটি শাসকগোষ্ঠীর প্রাণহীন কথাবার্তা যাদের দিন শেষ হয়ে আসছে। আমাদের প্রভাবিত করতে তারা এসব লক্ষ লক্ষ বার বলেছে ।"
"কিন্তু আমরা চাইছিলাম প্রকৃত পরিবর্তন। কাজেই আমরা এগুলো বিশ্বাস করিনি। তবে আমাদের এটা ভালো লেগেছিল যে গর্বাচফের বয়স ছিল ৫৬ এবং তিনি অন্তত মৃত্যুপথযাত্রী একজন বৃদ্ধ ছিলেন না।"
গর্বাচফের তিনজন পূর্বসূরী ক্ষমতায় থাকতে থাকতেই মারা গিয়েছিলেন।
'কিছু পরিবর্তন হতেই হবে'
গর্বাচফ শুধু যে বয়সেই তরুণতর ছিলেন তাই নয়, তিনি এমন এক সময় দেশটির নেতা হয়েছিলেন যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের সবাই অন্তত ব্যক্তিগত আলাপের সময় স্বীকার করতেন যে এভাবে আর চলতে পারে না। অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে, দোকানপাটগুলো ফাঁকা, পরিবর্তন তখন ছিল অবশ্যম্ভাবী।
সেই সময় পাভেল পালাশেংকো ছিলেন মিখাইল গর্বাচফের অনুবাদক।
পালাশেংকো বলছিলেন, রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে প্রথম দিকে পরিবর্তনের ব্যাপারে অত্যন্ত জোরালো ঐকমত্য ছিল।

ছবির উৎস, Getty Images
"পলিটব্যুরোর রক্ষণশীল সদস্যরা - যারা হয়তো প্রকৃত অর্থে পরিবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন না - তারাও উপলব্ধি করেছিলেন যে অন্তত কিছুটা পরিবর্তন আনতেই হবে। অন্যদিকে যারা তরুণতর এবং গর্বাচফ যাদেরকে বিশ্বাস করতেন - তারা ছিল বড় ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সমর্থক । তারা চাইছিল পুরোনো পদ্ধতিকে আমূল পাল্টে তার জায়গায় এক নতুন পদ্ধতি।"
'পোস্টার-বিলবোর্ডে একটা নতুন শব্দ'
সেই সময় দিনা আকিবাভা ছিলেন একজন ছাত্রী।
"আমি প্রথম পেরেস্ত্রইকার কথা শুনেছিলাম পূর্ব জার্মানি থেকে ফেরার সময়। সেটাই ছিল আমার প্রথম বিদেশে যাওয়া।"
১৯৮৭ সালে মস্কো বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে করে ফেরার সময় দিনা আকিবাভার চোখে পড়লো শহরের সবখানে পোস্টার। আর তাতে লেখা একটা নতুন কথা - "পেরেস্ত্রইকা।"

ছবির উৎস, Getty Images
"এর আগে আমরা যেসব পোস্টার দেখতাম -তা কয়েক দশক ধরে চলছিল। 'লেনিন সবসময় আমাদের সাথে আছেন। আমাদের পার্টি আমাদের নেতা' - এই সব থাকতো তাতে । এরই মাঝে হঠাৎ করেই পোস্টার-বিলবোর্ডে দেখা গেল একটা নতুন শব্দ" - বলছিলেন দিনা।
"আমার মনে আছে আমি মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম - এসব কি হচ্ছে, এর মানে কি? মা বললেন, হ্যাঁ পার্টির কংগ্রেসে দেশের একটা নতুন গতিপথের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।"
টেলিভিশনে 'নিষিদ্ধ' প্রসঙ্গ
এটা ছিল ১৯৮৭ সালের গ্রীষ্মকাল। টেলিভিশনে একটা নতুন অনুষ্ঠান প্রচার হতে লাগলো।
এর নাম ছিল প্রজেক্টি পেরেস্ত্রইকি -বা পেরেস্ত্রইকার ওপর আলোকপাত। এতে এমন সব বিষয় ছিল যা নিয়ে সোভিয়েত টিভিতে কখনো হয়নি।
এতে কথা হতো এতকাল নিষিদ্ধ থাকা বিষয় নিয়ে - যেমন মাদকাসক্তি, অতিরিক্ত মদ্যপান, বাজারে পচতে থাকা শাকসব্জি , বা অমুক মন্ত্রীকে দিয়ে কোন কাজ হচ্ছে না - এমনি সব প্রসঙ্গ।

ছবির উৎস, MICHAEL EVSTAFIEV/AFP/Getty Images
পাভেল বালাশেংকো বলছিলেন, "পেরেস্ত্রইকা মানে হচ্ছে সংস্কার বা পুনর্গঠন। পেরে মানে 'আবার' স্ত্রয়কা মানে 'গঠন।'
তবে তার মতে গর্বাচফ প্রকৃতপক্ষেই যে বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন তা হচ্ছে গ্লাসনস্ত অর্থাৎ খোলা দুয়ার নীতি - যার ফলে লোকে খোলাখুলি তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারতো।
"আমার মনে হয় অন্য আর কোন নেতা এটা করতে পারতেন না। গ্লাসনস্তের অর্থ ছিল সরকারের কাজে স্বচ্ছতা, যার ফলে সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হতো, জনগণের সাথে কথা বলতে হতো, মানুষের কথা শুনতে হতো। আমার মতে সেটাই চির আসল বৈপ্লবিক পরিবর্তন।"
বেরুতে লাগলো 'নিষিদ্ধ' লেখকদের বই
ইয়েলেনা ভলকোভা ছিলেন সাহিত্যের অধ্যাপক। তার কাছে আসল পরিবর্তন এলো তখন, যখন সেইসব কবি ও লেখকদের কাজ হঠাৎ করে ছাপার অক্ষরে বেরুতে লাগলো - যারা এতদিন নিষিদ্ধ ছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
"আনা আখমাতোভার স্বামী গুমিলিয়ভ - যাকে বলশেভিকরা গুলি করে হত্যা করেছিল - তার কবিতা বেরুলো ওগোনিয়ক সাময়িকীতে।"
"এর পর বেরুলো সলঝেনিৎসিন, তার পর বুলগাকভ, পাস্তেরনাকের ড. জিভাগো, রিবাকভের চিল্ড্রেন অব দি আরবাট, ভাসিলি গ্রসম্যানের লাইফ এন্ড ফেইট - এগুলো লোকে সাময়িকী থেকে পড়তে লাগলো।"
"আমার মনে আছে, এগুলোর কয়েকটা আমাকে একজন দিয়েছিল এক রাতের মধ্যে পড়ে শেষ করতে হবে এই শর্তে। "
"ওগোনিয়ক সাময়িকী তখন পাঠকদের চিঠি ছাপাতো। কোন ভুয়া চিঠি নয় - যেগুলো কমিউনিস্ট পত্রিকা বা ম্যাগাজিনগুলোয় ছাপা হতো। এগুলো ছিল আসল পাঠকদের চিঠি। সেটা ছিল এক দারুণ ব্যাপার। "
ইয়েলেনা বলছিলেন, "সবকিছুই বদলে যাচ্ছিল , কারণ সমাজের পরিবেশ বদলে যাচ্ছিল। ওগোনিয়কের প্রধান সম্পাদক ছিলেন ভিটালি করোচিচ। তিনি ছিলেন পেরেস্ত্রইকার একজন প্রথান ব্যক্তিত্ব। সেখানে লক্ষ লক্ষ চিঠি ছাপা হয়েছিল। লোকে পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছিল।"

ছবির উৎস, YURI KADOBNOV/AFP/Getty Images
"এখন আমরা বুঝতে পারি গর্বাচফ কত বিরাট কাজ করেছিলেন। কিন্তু তখন আমরা তাকে মনে করতাম একটা অলস, অত্যন্ত ধীরগতির লোক, মনে হতো তাকে পেছন থেকে ঠেলে নিয়ে যাই।"
উচ্ছাসের পাশাপাশি ভয়-উৎকণ্ঠা
সেই সব সাহিত্য পত্রিকা হাতে নিয়ে ইয়েলেনা আনন্দ আর উচ্ছাস অনুভব করতেন।
"এটা ছিল এক মহাবিস্ময়, কারণ পরিবর্তন হচ্ছিল। কিন্তু আশার পাশাপাশি আবার অনেক ভয়ও ছিল। ভয়টা ছিল, ওরা হয়তো একে থামিয়ে দেবে। হয়তো একদিন সকালে উঠে শুনবো আমরা আবার সেই ব্রেজনেভের আমলের পুরোনো স্থবির দিনগুলোয় ফিরে গেছি। মনে হতো নতুন এই স্বাধীনতা হয়তো হবে খুবই ভঙ্গুর।"
তবে ইয়েলেনার মত কেউ কেউ যখন কবিতা, নতুন সিনেমা আর বই নিয়ে মেতে আছে, দোকানের তাকগুলো কিন্তু তখনো ছিল ফাঁকা।

ছবির উৎস, TV GRAB/AFP/Getty Images
কিন্তু ইয়েলেনার সৌভাগ্য ছিল, তার কিছু বন্ধু বিদেশে থাকতেন। তারা নানা জিনিস পাঠাতেন।
"তারা পার্সেলে ভরে সাবান, চাল বা কাপড়চোপড় পাঠাতো। কিন্তু দোকানগুলোতে তখন তাকগুলো ছিল খালি। বাইরে দীর্ঘ লাইন। দেশে যে খাবার ছিল না তা নয়। কিন্তু তা পেতে হলে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাড়াতে হতো।"
ঝকঝকে পাবলিক টয়লেট
অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়নে এক সময় ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক উদ্যোগ চালু হলো। সেটা পরের বছরের কথা।
দিনা আকিবাভার অবশ্য ব্যক্তিগত দোকানের কথা মনে নেই। তার বরং মনে আছে পাবলিক টয়লেটের কথা।
"সোভিয়েত যুগে টয়লেটগুলো ছিল জঘন্য। একান্ত বাধ্য না হলে পাবলিক টয়লেটে কেউ যেতে চাইতো না।"
"ফলে যখন বেসরকারি টয়লেট খুললো, সেগুলো একটু ব্যয়বহুল ছিল - এতে প্রায় এক মার্কিন ডলারের মত লাগতো। বেশ বড় অংক। কিন্তু ভেতরে ঢুকে আপনি দেখতেন চকচকে দেয়াল, সবকিছু নতুন আর ঝকঝকে। একজন মহিলা হাসিমুখে আপনাকে স্বাগত জানাতেন। তার সাথে আবার নিচু পর্দায় মিউজিক বাজছে।"
"মানুষ শুধু এই অভিজ্ঞতাটার জন্যই ওই টয়লেটগুলোয় যেতো, আর তা নিয়ে একে অপরের সাথে গল্প করতো , জানতে চাইতো - আপনি কি ওগুলোতে গেছেন? - এই রকম আর কি। প্রথমে মস্কোর কেন্দ্রস্থলে এরকম দু-তিনটি টয়লেট খুলেছিল - তার পরে আরো অনেকগুলো।"
দিনা বলছিলেন,এসময় বাজারে নানারকম রকম জিনিস পাওয়া যেতে লাগলো।

ছবির উৎস, ANDREAS ALTWEIN
"লিপস্টিক, অন্তর্বাস, পাইপ। বানের জলের মত এসব আসতে লাগলো। লোকজনকে অর্থ আয়ের সুযোগ দেবার পর লোকে দেখলো এতে তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করার চেয়ে বেশি অর্থ আয় করতে পারছে । সবাই বুঝলো, এটা আর কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
তবে সে চেষ্টা যে করা হয়নি তা নয়। কয়েক বছর পর ১৯৯১ সালে কমিউনিস্ট কট্টরপন্থীরা গর্বাচফের বিরুদ্ধে একটা অভ্যুত্থান ঘটালো। কিন্তু সেটা ব্যর্থ হলো।
কয়েক মাস পর গর্বাচফ পদত্যাগ করলেন। ১৯৯১ সাল শেষ হতে না হতেই সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়ে গেল।
ইতিহাসের সাক্ষীর এ পর্বটি পরিবেশন করেছেন পুলক গুপ্ত।








